বঙ্গবন্ধু একজন পাকিস্তানী ছিলেন

এক
বঙ্গবন্ধু একজন পাকিস্তানী ছিলেন। তারও আগে তিনি ছিলেন একজন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান। ছাত্র জীবনে তিনি মুসলিম লীগের ছাত্র নেতা ছিলেন এবং পাকিস্তানের পক্ষে আন্দোলন করেছেন। পরিণত জীবনে তিনি আওয়ামী লীগের নেতা ছিলেন এবং বাংলাদেশের জন্যে আন্দোলন করেছেন। তিনি পাকিস্তানী জাতীয়তাবাদী থেকে এক লাফে বাঙালি জাতীয়তাবাদী হয়ে যান নাই। একলা একলাও হন নাই। একটা গোটা জাতি তার সঙ্গে ছিল। বাঙলার কোটি কোটি মুক্তিকামী জনতা যদি বাঙলার স্বাধীনতা না চাইতো, বঙ্গবন্ধু কোনদিনই বাংলাদেশ আন্দোলনের নেতা হইতে পারতেন না। পাকিস্তান আমলে বাঙলার জনগণের মাঝে নতুন জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের যে আকাঙ্খা দিনে দিনে পত্র পল্লবে বিকোষিত হয়েছিলা বঙ্গবন্ধু সেই আকাঙ্খা বুঝতে পেরেছিলেন, জাতির ডাকে সারা দিয়ে নেতার ভুমিকায় আবির্ভুত হয়েছিলেন। তার নেতৃত্বেই পূর্ব পাকিস্তানের সায়ত্বশাসনের আন্দোলন হয়েছে, তার নেতৃত্বেই বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী জনগণের অধিকাংশ নতুন দেশের স্বপ্ন দেখেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি উপস্থিত থাকতে পারেন নাই, তারপরও মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকাংশ তাকেই নেতা মেনে যুদ্ধ করেছে। বঙ্গবন্ধু একজন পাকিস্তানী ছিলেন। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতিও বটে। এই হইল ইতিহাস। বাঙলার রাজনৈতিক ইতিহাস। এই ইতিহাসে যে বা যারা অস্বস্তি বোধ করেন, তারা ইতিহাস অথবা রাজনীতি কোন বিষয়েই পরিস্কার ধারণা রাখেন না। বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম ও বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের ঘটনাবলি হাজার বছরের পুরাতন কোন রূপকথা, কিংবদন্তী অথবা মিথোলজি নয়। গত শতাব্দির বাস্তব ইতিহাস মাত্র। এসব আমাদের পূর্ব প্রজন্মের ইতিহাস, যারা পাকিস্তানী ছিলেন, এবং যুদ্ধ করে বাংলাদেশী হয়েছেন। এই প্রজন্মের অনেকে আবার বাংলাদেশ চান নাই। তারা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের নামে পাকিস্তানী থাকতে চেয়েছেন। স্বাধীন বাংলাদেশে তারা নাই হয়ে যান নাই, বরং নতুন চেহারায় নতুন শক্তিতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাদের প্রত্যাবর্তন হয়েছিল। আজ থেকে এক দশক আগেও, এমন মানুষের অভাব ছিল না, যারা নির্দিধায় বাংলাদেশের প্রতি নিজেদের আনুগত্ব অস্বিকার করে ‘পাকিস্তান থাকলেই ভালো ছিল’ ঘোষনা করতেন। নতুন জাতীয়তাবাদী প্রজন্মের উত্থানে এখন তারা বিলুপ্ত না হয়ে গেলেও, আগের সেই বড় গলা আর নাই। বাংলাদেশের বর্তমান প্রজন্ম, যাদের জন্ম হয়েছে একটি স্বাধীন বাংলাদেশে, তাদের মধ্যে নিজেদের আত্মপরিচয় নিয়া এই ধরণের দোলচাল কম। তাদের অধিকাংশই নির্দিধায় নিজেকে বাংলাদেশী দাবি করতে পারে। কিন্তু ইতিহাসের মিথকরণ, দলীয়করণ এবং সেই মিথ ও দলীয় স্বার্থ টিকায়া রাখতে আওয়ামী লীগ যেই ফ্যাসিবাদী তৎপরতার জন্ম দিয়েছে সেই ফ্যাসিবাদে ভেসে গিয়ে এই প্রজন্মের অনেকেই বাংলাদেশকেই ভাসিয়ে দেয়ার উপক্রম করছে। তারা জানে না অথবা ভুলে গেছে যে, মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে দলীয়করণ করে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে পাকিস্তানপন্থীদের উত্থানের রাস্তা তৈরি করে শুধু নিজেদের পতনের রাস্তাই তৈরি করে নাই, বাংলাদেশকেও পেছনদিকে হাটতে বাধ্য করেছে।

দুই
বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষনে জয় বাঙলার পরে জিয়ে পাকিস্তান বলেছেন এই কথা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারবো না, তিনি বলেন নাই তাও নিশ্চিত করে বলার উপায় নাই। এ কে খোন্দকার যা লিখেছেন তা কোন নতুন কথা নয়। তার আগেও ৭ মার্চে রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত অনেকে একি রকম দাবি করেছেন। এর বিপরীত দাবিদারও অনেক। জিয়ে পাকিস্তানের উল্লেখ যারা করেছেন তাদের মধ্যে বিচারপতি হাবিবুর রহমান, নির্মল সেন, আহমদ ছফা, হুমায়ুন আহমেদ, বদরুদ্দীন উমর প্রমুখ ব্যক্তিরা আছেন। তাদের তথ্যসূত্র ভুল হতে পারে, তাদের স্মৃতি তাদের সাথে প্রতারণা করতে পারে। কিন্তু তাদেরকে স্বাধীনতা বিরোধী ঘোষনা করা কিংবা তাদের বইপত্র পুড়িয়ে দেয়া মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অথবা ইতিহাস রক্ষার নমুনা না। এসব নিখাদ দলীয় চামচামির নমুনা। চামচামি খুব বেশি ক্ষতিকারক না। কিন্তু এইরকম দলবদ্ধ চামচামি ও ভিন্ন মতের বিরুদ্ধে অসহনশিলতা সর্বগ্রাসি ফ্যাসিবাদের জন্ম দেয়। আওয়ামী সমর্থকদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চা এখন এই সর্বগ্রাসি ফ্যাসিবাদের রূপ ধারণ করেছে। আওয়ামী লীগের নেতারা সংসদে দাঁড়িয়ে এ কে খোন্দকারকে তুলাধুনা করতে গিয়ে যখন দাবি করেন যে একাত্তর না সাতচল্লিশ সাল থেকেই স্বাধীনতার জন্যে যুদ্ধের প্রস্তুতি তারা শুরু করেছেন কিংবা ৭ মার্চের ভাষনের মধ্যে দিয়ে বঙ্গবন্ধু নিরস্ত্র জাতিকে সশস্ত্র জাতিতে পরিণত করেছেন, তখন তারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শুধু বিকৃতই করেন না, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে রিতিমত তামাশায় লিপ্ত হন। ৭ মার্চ কেনো, ২৫ মার্চ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ অথবা বাংলাদেশের মুক্তিকামী জনতার কোন প্রস্তুতি ছিল না পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন করার। মানুষ স্বাধীনতা চেয়েছে, মানুষ বাংলাদেশ চেয়েছে, কিন্তু যুদ্ধ করার প্রস্তুতি তাদের ছিল না। ২৫ মার্চ রাতে সশস্ত্র নয়, নিরস্ত্র জনতার উপর ঝাপিয়ে পড়েছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী। স্বাধীকার সংগ্রামের নেতৃত্বস্থানীয় দল হিসাবে আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের জন্যে জাতিকে প্রস্তুত করতে ব্যর্থ হয়েছিল। পাকিস্তান যেখানে হাজারে হাজারে সৈন্য ও অস্ত্র বাংলাদেশে মজুদ করছিল, সেখানে আসন্ন গণহত্যা ঠেকাতে আওয়ামী লীগ চুরান্ত ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। জনগণকে প্রস্তুত করা দূরে থাক, সতর্ক করতেও তারা ব্যর্থ হয়েছে। আজকে তোফায়েল আহমেদ প্রশ্ন করেন, মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি যদি আওয়ামী লীগের নাই থাকতো তাহলে বাংলাদেশ কি হাওয়ায় ভেসে স্বাধীন হয়েছে কিনা। এই বর্ষিয়ান নেতা ভুলে যান, তিরিশ লক্ষ জনতার জীবনের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। তিনি বলতে চান, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ‘আওয়ামী লীগ’ এবং ‘হাওয়া’র মাঝে আটকে আছে। বাংলাদশের মুক্তিযুদ্ধে জনগণের কেন্দ্রীয় ভুমিকাকে তারা অস্বিকার করেন। তারা বলতে চান, বঙ্গবন্ধুর একক আঙুলি হেলনে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। দলীয় চামচামি করতে গিয়ে যারা নিজেরাই এই ধরণের ইতিহাস বিকৃতিতে নামেন, তাদের হাতে আর যাই হউক মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের শুদ্ধতা রক্ষা হবে না। ৭ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষনা হয় নাই। এমন দাবি বঙ্গবন্ধুও কোনদিন করেন নাই। সারা দুনিয়ার দৃষ্টি ছিল ৭ মার্চের জনসমাবেশের দিকে। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষনা করতে পারেন, সেই দাবি, প্রত্যাশা, আশংকা ছিল বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের মাঝে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীরও প্রস্তুতি ছিল, স্বাধীনতার ঘোষনা দেয়া মাত্রই তারা ঝাপিয়ে পরতো নিরস্ত্র জনতার উপর। বঙ্গবন্ধু তা জানতেন। তাই তিনি ৭ মার্চ প্রবল দাবি উপেক্ষা করেও স্বাধীনতার ঘোষনা দেন নাই। যারা ছাত্র ইউনিয়ন করতেন, যারা ছাত্র লীগ করতেন, যারা কাঠের বন্দুক কাধে মহরা দিয়েছেন, যারা স্বাধীন বাঙলার পতাকা উড়িয়েছেন কিংবা মাওবাদী যারা একাত্তরের দুই বছর আগে থেকে স্বাধীনতার জন্যে যুদ্ধ শুরু করেছেন, আহমদ ছফার মতো যারা ৭ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পত্রিকা বের করেছেন, তাদের মতো হুটহাট বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষনা অথবা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা বঙ্গবন্ধুর অবস্থানের একজন নেতার পক্ষে সম্ভব ছিল না। ৭ মার্চ তাই তিনি স্বাধীনতার ঘোষনা দেন নাই। কিন্তু তিনি মুক্তি ও স্বাধীনতার সংগ্রামের জন্যে জনগণকে উজ্জিবিত করতে ঠিকই সক্ষম হয়েছেন। রেসকোর্সের ময়দানে উপস্থিত থেকে অথবা দূরে থেকে যারা এই ভাষন শুনেছেন, পড়েছেন, তারা স্বাধীনতার কোন অফিশিয়াল ঘোষনা পান নাই ঠিকই, কিন্তু তাদের মধ্যে সন্দেহের কোন অবকাশ ছিল না যে এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম। কিন্তু এই বাস্তবতাও কারো পক্ষে অস্বিকার করা সম্ভব হবে না যে, ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তুলেই বাংলাদেশকে স্বাধীন করা যায় নাই, স্বাধীনতার জন্যে ভারতের অস্ত্র লেগেছে, সোভিয়েত ইউনিয়নের আন্তর্জাতিক সমর্থন দরকার হয়েছে। ২৫ মার্চ যখন পাকিস্তান বাহিনী হামলা করেছে, তখন নিজের মাটিতে বসে যুদ্ধ করবে সেই শক্তি আওয়ামী লীগের ছিল না।

তিন
৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু যদি জিয়ে পাকিস্তান বলেও থাকেন, তা রাজনৈতিক ভাবে সঠিক ছিল। নির্মল সেন কিংবা বিচারপতী হাবিবুর রহমানরা যারা জিয়ে পাকিস্তানের কথা লিখেছেন, তাদের বক্তব্যও এমনি। বঙ্গবন্ধুকে খাটো করার উদ্দেশ্যে কিংবা তার নামে মিথ্যাচার করার উদ্দেশ্যে তারা লিখেন নাই। ৭ মার্চের ভাষন বাংলাদেশে হয় নাই, হয়েছে পাকিস্তানে। বঙ্গবন্ধু যেহেতু ৭ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষনা দেন নাই, তাই জয় বাঙলার পরে জিয়ে পাকিস্তান বলাটাই সবদিক থেকে নিরাপদ ছিল, যেমন তিনি ৭ মার্চের আগের ভাষন গুলো শেষ করার সময় বলতেন। ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধু জিয়ে পাকিস্তান বলেন নাই, এই দাবি যারা করেন তারাও এটা মানেন যে ৭ মার্চের আগে বঙ্গবন্ধু জয় বাঙলার পাশাপাশি জিয়ে পাকিস্তানও বলতেন। সুতরাং, তিনি যদি ৭ মার্চও জিয়ে পাকিস্তান বলে থাকেন, তাতে কোন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায় না। যদি না বলে থাকেন, এবং নির্মল সেন কিংবা আহমদ ছফাদের স্মৃতি যদি ভুল হয়ে থাকে, এমনকি নির্জলা মিথ্যা হয়েও থাকে, তাতেও আওয়ামী লীগের নেতা, কর্মী, সমর্থকদের এতো উত্তেজিত হওয়ার কারণ বোঝাটা মুশকিল। একমাত্র কারণ যা বোঝা যায়, তারা ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষনা করেছেন এই ডিসকোর্সটি প্রতিষ্ঠা করতে চান। ৭ মার্চের ভাষনে যদি জিয়ে পাকিস্তান থাকে, তাহলে তাকে আর স্বাধীনতার ঘোষনা বলা যায় না। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষনা করেছেন, সেই হিসাবে তিনিই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক, জিয়াউর রহমান নয়, এই ডিসকোর্সটি আওয়ামী লীগ কি প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে? ব্যর্থ না হইলে, ৭ মার্চই কেনো বঙ্গবন্ধুকে দিয়ে স্বাধীনতা ঘোষনা করানো লাগবে? অবশ্য, তোফায়েল আহমেদেরা ৭ মার্চের ভাষনের মাধ্যমে নিরস্ত্র জাতিকে সশস্ত্র করণের ইতিহাস বানাইতে চান, বঙ্গবন্ধুকে দিয়া দুইবার স্বাধীনতা ঘোষনা করানোটা সেই হিসাবে খুব বেশি কিছু নয়। ফ্যাসিবাদ জিনিসটাই এমন। বাস্তবতা হলো যে, বাংলাদেশের অফিশিয়াল স্বাধীনতা ঘোষনাটি মার্চ মাসে হয় নাই, হয়েছে এপ্রিল মাসে। সম্প্রতি তারেক জিয়া তার পিতা জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষনাটিকে অফিশিয়াল দাবি করে জিয়াউর রহামনকে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান দাবি করেছিলেন। বাস্তবতা হলো, বাংলাদশের অফিশিয়াল স্বাধীনতার ঘোষনা হয়েছে ১৭ এপ্রিল, মুজিবনগরে। জনগণের নির্বাচিত সরকার বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষনা পত্র সেইদিন পাঠ করেছে। এই ঘোষনাপত্রেই পরিস্কার ভাষায় উল্লেখ আছে, আলোচনার নামে পাকিস্তানীরা বিশ্বাসঘাতকতা করে পচিশে মার্চ রাতে নিরস্ত্র জনগণের উপরে ঝাপায়া পরেছে বলেই বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ স্বাধীনতার বার্তা পাঠিয়েছেন, এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশের মানুষের উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে বলেই বাঙালি বাধ্য হয়ে যুদ্ধ করছে। স্বাধীনতার ঘোষনা পত্রে এইসব কথা পরিস্কার ভাষায় লেখা আছে। অফিশিয়াল স্বাধীনতা ঘোষনার পূর্বে যদি অন্যকিছুকে স্বাধীনতার ঘোষনা হিসাবে ধরতে হয় তাইলে, স্বাধীনতার ঘোষনা করেছে ২৫ মার্চ রাতে সশস্ত্র সেনাবাহিনীর বুলেট, এবং নিরস্ত্র জনতার লাশ।

চার
‘স্বাধীনতার ঘোষক’ ধারণাটি বিএনপির আবিস্কার। জিয়াউর রহমান একাত্তরে কোন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না। প্রধান সামরিক ব্যক্তিও ছিলেন না। ২৫ মার্চের গণহত্যার পর বেতার থেকে যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষনা পাঠ করেছেন, তাদের মধ্যে জিয়াউর রহমানের ভাষনটি সবচেয়ে বিখ্যাত ছিল। সেই ভাষনটিকেই বাংলাদেশের অফিশিয়াল স্বাধীনতার ঘোষনা হিসাবে প্রচার করে বিএনপি ‘স্বাধীনতার ঘোষক জিয়া’ ডিসকোর্সটি দীর্ঘদিন যাবৎ প্রতিষ্ঠিত করে রেখেছিল। ইতিহাস কতোটা জঘন্যভাবে বিকৃত করা যায়, বিএনপি তাদের বিভিন্ন শাসনামলে তা দেখিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থেকে আওয়ামী লীগ এবং বঙ্গবন্ধুর নাম তারা প্রায় মুছে দিয়েছিল বলা যায়। স্কুলের পাঠ্য বই পড়লে মনে হতো, জিয়াউর রহমানের ভাষনের আগে পর্যন্ত বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের কোন ইতিহাস নাই। কিন্তু ঐতিহাসিক ডিসকোর্স নির্মানের এমন এক খেলায় বিএনপি নেমেছিল, যাতে জেতার ক্ষমতা তাদের নাই। বাংলাদেশের স্বাধীনতার কোন একক ঘোষক থাকতে পারেন, এই ধারণাটা আবিস্কার করে বিএনপি আওয়ামী লীগের হাতে ইতিহাসের দলীয় করণের আরেকটি অস্ত্র তুলে দিয়েছিল মাত্র। স্বাধীনতার ঘোষক টাইটেলটি বিএনপি এতোটাই শক্তিশালী বানিয়েছে যে এই টাইটেলটি বঙ্গবন্ধুর জন্যে দখল করে নেয়ার আগে পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ক্ষান্ত হয় নাই। তবে আওয়ামী লীগ এখন আর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস দলীয়করণেই ক্ষান্ত থাকছে না, তাদের দলীয় ইতিহাসের বাইরে অন্য যে কোন ইতিহাসকেই স্বাধীনতা বিরোধী দাবি করে তা খতম করা না পর্যন্ত তাদের নেতা, কর্মি ও সমর্থকদের ঘুম হারাম হয়ে যাচ্ছে।

পাঁচ
১৭ এপ্রিলের আগের কোন স্বাধীনতার ঘোষনাকে যদি অফিশিয়াল ঘোষনা বলে চালানোর চেষ্টা করা হয়, তাইলে জিয়াউর রহমান অথবা শেখ মুজিবুর রহমানেই কেনো থেমে থাকতে হবে? যারা তাদেরো আগে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়াইছেন, অস্ত্র হাতে মহরা দিয়েছেন, স্বাধীন বাঙলার পত্রিকা প্রকাশ করেছেন তাদের কি হবে? যারা বজ্রকন্ঠে স্লোগান দিয়েছেন, পুলিশের গুলিতে লাশ হয়েছেন তাদের কি হবে? সিরাজ শিকদারের পার্টি যে ৬৯ সাল থেকে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা সংগ্রাম ঘোষনা করেছিল তার কি হবে?

ছয়
জয় বাঙলার পরে জিয়ে পাকিস্তান না লাগানো যদি স্বাধীনতা ঘোষনার মানদন্ড হয়, তাইলে স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়েছেন আমার বাপ। তিনি ছাত্র লীগ করতেন। বঙ্গবন্ধু যখনো জিয়ে পাকিস্তান বলা বন্ধ করেন নাই, তখনো তিনি শুধু জয় বাঙলাই বলতেন। তিনি একলা একলা স্বাধীনতা ঘোষনা করেন নাই, তার মতো কোটি বাঙালি সেইসময় শুধু জয় বাঙলা বলেই স্লোগান তুলতেন, জিয়ে পাকিস্তান বলতেন না। আমার বাপের মতো কোটি জনতার জোরেই বঙ্গবন্ধু জয় বাঙলা বলতেন, আমার বাপের মতো কোটি জনতার জোরেই তিনি এক পর্যায়ে জিয়ে পাকিস্তান বলা বন্ধ করেছেন। শেখ হাসিনা আর তারেক জিয়ার বাপই খালি স্বাধীনতার ঘোষনা দিসে কিন্তু আমার বাপে দেয় নাই, এই কথা যারা প্রচার করে, তারাই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বিকৃতিকারী।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১১ thoughts on “বঙ্গবন্ধু একজন পাকিস্তানী ছিলেন

  1. তিনি যদি ৭ মার্চও জিয়ে
    তিনি যদি ৭ মার্চও জিয়ে পাকিস্তান
    বলে থাকেন, তাতে কোন মহাভারত অশুদ্ধ
    হয়ে যায় না বলে আমিও বিশ্বাস করি তবে আওয়ামীলীগ এর ইতিহাস দলীয়করণ করার জন্য প্রকান্তরে আপনারাও দায়ি।
    আপনারা বলতে আমি বাংলার বামদের বোঝাইছি।দেশ স্বাধীন হওয়ার ৪৩ বছরেও বাংলার বামরা দাঁড়াইতে পারেনাই বিধায় এদেশে মুক্তিযুদ্ধ এর সপক্ষের শক্তি বলে আওয়ামীলীগ এর প্রচার হালে পানি পায়।দেশের বামরা এক ব্যক্তি একদল এর মত অনেকটা।দেশের অনেক বাম মেন্টালিটির মানুষও আওয়ামীলীগ এ অনেকটা বাধ্য হয়েই ভোট দেয়,যা পুরাই আপনাদের ব্যারথতা।

  2. জয় বাঙলার পরে জিয়ে পাকিস্তান
    জয় বাঙলার পরে জিয়ে পাকিস্তান না লাগানো যদি স্বাধীনতা ঘোষনার মানদন্ড হয়, তাইলে স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়েছেন আমার বাপ। তিনি ছাত্র লীগ করতেন। বঙ্গবন্ধু যখনো জিয়ে পাকিস্তান বলা বন্ধ করেন নাই, তখনো তিনি শুধু জয় বাঙলাই বলতেন। তিনি একলা একলা স্বাধীনতা ঘোষনা করেন নাই, তার মতো কোটি বাঙালি সেইসময় শুধু জয় বাঙলা বলেই স্লোগান তুলতেন, জিয়ে পাকিস্তান বলতেন না। আমার বাপের মতো কোটি জনতার জোরেই বঙ্গবন্ধু জয় বাঙলা বলতেন, আমার বাপের মতো কোটি জনতার জোরেই তিনি এক পর্যায়ে জিয়ে পাকিস্তান বলা বন্ধ করেছেন। শেখ হাসিনা আর তারেক জিয়ার বাপই খালি স্বাধীনতার ঘোষনা দিসে কিন্তু আমার বাপে দেয় নাই, এই কথা যারা প্রচার করে, তারাই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বিকৃতিকারী।

  3. জয় বাঙলার পরে জিয়ে পাকিস্তান

    জয় বাঙলার পরে জিয়ে পাকিস্তান না লাগানো যদি স্বাধীনতা ঘোষনার মানদন্ড হয়, তাইলে স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়েছেন আমার বাপ। তিনি ছাত্র লীগ করতেন। বঙ্গবন্ধু যখনো জিয়ে পাকিস্তান বলা বন্ধ করেন নাই, তখনো তিনি শুধু জয় বাঙলাই বলতেন। তিনি একলা একলা স্বাধীনতা ঘোষনা করেন নাই, তার মতো কোটি বাঙালি সেইসময় শুধু জয় বাঙলা বলেই স্লোগান তুলতেন, জিয়ে পাকিস্তান বলতেন না। আমার বাপের মতো কোটি জনতার জোরেই বঙ্গবন্ধু জয় বাঙলা বলতেন, আমার বাপের মতো কোটি জনতার জোরেই তিনি এক পর্যায়ে জিয়ে পাকিস্তান বলা বন্ধ করেছেন। শেখ হাসিনা আর তারেক জিয়ার বাপই খালি স্বাধীনতার ঘোষনা দিসে কিন্তু আমার বাপে দেয় নাই, এই কথা যারা প্রচার করে, তারাই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বিকৃতিকারী।

    শেষের এই কথাগুলো লেখাটার মুল বক্তব্য। আপনার মত আমিও বলব- মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির দায় আওয়ামীলীগ-বিএনপি উভয় দলেরই।

  4. ১৭ এপ্রিলের আগের কোন

    ১৭ এপ্রিলের আগের কোন স্বাধীনতার ঘোষনাকে যদি অফিশিয়াল ঘোষনা বলে চালানোর চেষ্টা করা হয়, তাইলে জিয়াউর রহমান অথবা শেখ মুজিবুর রহমানেই কেনো থেমে থাকতে হবে? যারা তাদেরো আগে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়াইছেন, অস্ত্র হাতে মহরা দিয়েছেন, স্বাধীন বাঙলার পত্রিকা প্রকাশ করেছেন তাদের কি হবে? যারা বজ্রকন্ঠে স্লোগান দিয়েছেন, পুলিশের গুলিতে লাশ হয়েছেন তাদের কি হবে? সিরাজ শিকদারের পার্টি যে ৬৯ সাল থেকে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা সংগ্রাম ঘোষনা করেছিল তার কি হবে?

  5. “জয় বাঙলার পরে জিয়ে পাকিস্তান

    “জয় বাঙলার পরে জিয়ে পাকিস্তান না লাগানো যদি স্বাধীনতা ঘোষনার মানদন্ড হয়, তাইলে স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়েছেন আমার বাপ। তিনি ছাত্র লীগ করতেন। বঙ্গবন্ধু যখনো জিয়ে পাকিস্তান বলা বন্ধ করেন নাই, তখনো তিনি শুধু জয় বাঙলাই বলতেন। তিনি একলা একলা স্বাধীনতা ঘোষনা করেন নাই, তার মতো কোটি বাঙালি সেইসময় শুধু জয় বাঙলা বলেই স্লোগান তুলতেন, জিয়ে পাকিস্তান বলতেন না। আমার বাপের মতো কোটি জনতার জোরেই বঙ্গবন্ধু জয় বাঙলা বলতেন, আমার বাপের মতো কোটি জনতার জোরেই তিনি এক পর্যায়ে জিয়ে পাকিস্তান বলা বন্ধ করেছেন। শেখ হাসিনা আর তারেক জিয়ার বাপই খালি স্বাধীনতার ঘোষনা দিসে কিন্তু আমার বাপে দেয় নাই, এই কথা যারা প্রচার করে, তারাই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বিকৃতিকারী।”

  6. “জয় বাঙলার পরে জিয়ে

    “জয় বাঙলার পরে জিয়ে পাকিস্তান
    না লাগানো যদি স্বাধীনতা ঘোষনার মানদন্ড
    হয়, তাইলে স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়েছেন আমার
    বাপ। তিনি ছাত্র লীগ করতেন। বঙ্গবন্ধু
    যখনো জিয়ে পাকিস্তান বলা বন্ধ করেন নাই,
    তখনো তিনি শুধু জয় বাঙলাই বলতেন।
    তিনি একলা একলা স্বাধীনতা ঘোষনা করেন নাই,
    তার মতো কোটি বাঙালি সেইসময় শুধু জয়
    বাঙলা বলেই স্লোগান তুলতেন,
    জিয়ে পাকিস্তান বলতেন না। আমার বাপের
    মতো কোটি জনতার জোরেই বঙ্গবন্ধু জয়
    বাঙলা বলতেন, আমার বাপের মতো কোটি জনতার
    জোরেই তিনি এক পর্যায়ে জিয়ে পাকিস্তান
    বলা বন্ধ করেছেন। শেখ হাসিনা আর তারেক
    জিয়ার বাপই খালি স্বাধীনতার
    ঘোষনা দিসে কিন্তু আমার বাপে দেয় নাই, এই
    কথা যারা প্রচার করে, তারাই মুক্তিযুদ্ধের
    ইতিহাসের বিকৃতিকারী।

    আজকাল পিচ্চি পুলাপইন মুক্তিযুদ্ধ নামে নানা কটু কথা বলে।ওগো বাপে মুক্তিযুদ্ধ দেহে নাই,আর ওরা কয়ে দেশে তো যুদ্ব হয় নাই,আবার মুজিব পাকিস্তানী।,,,,
    খালেদার জন্ম নাকি ঠিক নাই,হাসিনা হিন্দু।
    আসলে এরকম ব্যক্তিরা দেশের আসল ক্ষতি কর বস্তু।

  7. এই নিয়ে ফালতু কথা ভালা চালি
    এই নিয়ে ফালতু কথা ভালা চালি হচ্ছে। আর তা কিন্তু করছে লিগ। আর তার চালারা। তারায় ঘটনা কে ফুলিয়ে ফাপিয়ে প্রচার চালাচ্ছে।

  8. ৭১ এর ২৬ মার্চের আগে সবাই ছিল
    ৭১ এর ২৬ মার্চের আগে সবাই ছিল পাকিস্তানি। তখন শেখ মুজিব জিও পাকিস্তান বলতেই পারে। এটা নিয়ে এত পানি ঘোলা করার কোন মানে নাই। আপনার লেখাটা ভাল লাগল।

  9. শেখ মজিব কখনোও বাংলার
    শেখ মজিব কখনোও বাংলার স্বাধীনতা চান নি এটাই সত্য।কিংবা আওয়ামীলিগের কখনও যুদ্ধ প্রস্তুতিও ছিল না।২৫শে মার্চ যদি পাকিস্থান সেনাবাহীনি বাংলার জনগনের উপর আর্তকিত হামলা না করত বা পাকিস্থান যদি মুজিবের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করত।হয়ত এখনও আমাদের পরাধীণ থাকতে হতো।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

9 + 1 =