গান্ধীকে নিয়ে ইতিহাস বিকৃতি!

চলছে ইতিহাস বিকৃতি বিষয়ক আলাপ-আলোচনা। ইতিহাসের বিকৃতি ঘটে বই, দলিল, ছবি সিনেমা ও ফুটেজের ভুল ব্যাখ্যা বা এসবের মধ্যে ভুল তথ্যকে সত্য বলে ঢুকিয়ে দেয়ার মাধ্যমেই। তাই একটি ইতিহাসভিত্তিক চলচ্চিত্র নিয়ে আলাপ জরুরী মনে করছি। এখন চলচ্চিত্রশিল্প সম্পূর্ণরূপে মুনাফানির্ভর। মুনাফার জন্যই তাই ইতিহাস বিকৃতির গতিটা ইদানীং বেশি বেড়ে গেছে। আমার আলাপের বিষয় বিখ্যাত ‘গান্ধী’ চলচ্চিত্রটি। বিশ্বজুড়ে এটি প্রশংসিত এবং পুরস্কৃত হয়েছে। ইতিহাসভিত্তিক চলচ্চিত্র হিসেবে চলচ্চিত্রটি বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছে। কিন্তু এটি ইতিহাস বিকৃতি থেকে মুক্ত হতে পারেনি।

এই চলচ্চিত্রে খুব গুরুত্বের সঙ্গে গান্ধীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দেখানো হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দে গান্ধী স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। বন্দরে গান্ধীকে স্বাগত জানাতে ভারতীয় রাজনীতিকেরা উপস্থিত হন। যাদের মধ্যে নেহরু, সর্দার প্যাটেল, মাওলানা আজাদ, জিন্নাহ প্রমুখের উপস্থিতি দেখানো হয়েছে। এখানে জিন্নাহ‘র উপস্থিতি ইতিহাসের চরম অসঙ্গতি। কেননা জিন্নাহ তখন ভারতে ছিলেন না। তখন তিনি ছিলেন লন্ডনে।

জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ড বারতের ইতিহাসে অন্যতম এক ঘটনা। ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দের ১০ এপ্রিল পাঞ্জাবের অমৃতসরের জননন্দিত দুই নেতা সৈফুদ্দিন কিচলু এবং সত্যপালকে বহিষ্কারে পাঞ্জাবজুড়ে তীব্র প্রতিবাদ, বিক্ষোভ এবং হরতাল পালিত হয়। ১৩ এপ্রিল বিক্ষোভরত নিরস্ত্র নর-নারীর ওপর ব্রিটিশ জেনারেল ডায়ারের নেতৃত্বে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর নির্বিচারে গুলি বর্ষণে জালিয়ানওয়ালাবাগ ময়দানে এক হাজার মানুষ প্রাণ হারায় এবং দুই হাজার মানুষ আহত হয়। ইতিহাসে এই নিষ্ঠুর জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসকদের চরম বর্বরতা এবং নৃশংসতার দৃষ্টান্তরূপে খ্যাত। এ রকম একটি ঘটনা নিয়েও মিথ্যা তথ্য পরিবেশন করা হয়েছে গান্ধী সিনেমায়।

গান্ধী চলচ্চিত্রে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের একটি দৃশ্য পরিচালক খুব গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। তাতে দেখানো হয়েছে জালিয়ানওয়ালাবাগ পরিদর্শন করছেন গান্ধী। যা ইতিহাসের বিরাট এক অসঙ্গতি। সত্যটা উইকি কিংবা যে কোনো মামুলি সংগ্রহশালাতেই পাওয়া যাবে। গান্ধী পাঞ্জাব যাবার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন ঠিকই। কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে তিনি পাঞ্জাব যেতে পারেননি। অর্থাৎ ঐতিহাসিক গান্ধী চলচ্চিত্রটি ইতিহাস বিকৃতির দোষে দুষ্ট। এবার যদি গান্ধী সম্পর্কিত ইতিহাস খুঁজতে বসেন তাহলে দেখবেন, এরকম তাংফাং সিনেমার বাইরে যা কিছু ইতিহাস বলে প্রতিষ্ঠিত, তার অনেক কিছুও আবার প্রশ্নবিদ্ধ।

বিখ্যাত ভারতীয় সাহিত্যিক ও গবেষক অরুন্ধতী রায় জাতপাত তথা বর্ণপ্রথার বিরুদ্ধে কাজ করতে গিয়ে গান্ধী সম্পর্কে এমন কিছু সত্য আবিষ্কার করেছেন, তার ভাষায় যা সাধারণ ধারার ইতিহাস চর্চ্চা থেকে মুছে দেয়া হয়েছে। তিনি তথ্য প্রমাণসহ বৈষম্যের অভিযোগ তুলেছেন গান্ধীর বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, মানুষ সাধারণভাবে মহাত্মা গান্ধীকে যেমনটি জানে, সেটি মিথ্যা। তার সম্পর্কে কিছু সত্য প্রকাশ করার সময় এসেছে। তার অহিংস মতবাদ ছিল সমাজের একটি পূর্বপ্রতিষ্ঠিত নির্মম প্রথার ওপরে দাঁড়িয়ে। সেটি হলো জাত-পাত তথা বর্ণপ্রথা।

এ নিয়ে অরুন্ধতী রায় সম্প্রতি একটি বই লিখেছেন ‘দ্য ডক্টর অ্যান্ড দ্য সেইন্ট’ নামে। বইটি প্রকাশের পর এক সাক্ষাৎকারে অরুন্ধতী বলেন, ”আমি দেখতে পেয়েছি যে ১৯১৫ সালে তাকে প্রথম প্রকাশ্যে মহাত্মা হিসেবে অভিহিত করা হয়। সেটা ছিল দক্ষিণ আফ্রিকায় ২০ বছর কাটিয়ে ভারতে ফিরে আসার ঠিক পরের ঘটনা। দক্ষিণ আফ্রিকায় তিনি এমন কী করেছিলেন, যাতে তিনি এমন সম্মান পেতে পারেন? আর সেটা আমাকে ১৮৯৩ সালে ফিরিয়ে নিল, যে বছর তিনি ২৪ বছর বয়স্ক আইনজীবী হিসেবে প্রথমবারের মতো দক্ষিণ আফ্রিকা গিয়েছিলেন।”

অরুন্ধতী আরও বলেছেন, ”সত্যিকার অর্থে, আমি গান্ধীকে ভণ্ড মনে করি না। বরং এর বিপরীতে তিনি আশ্চর্য রকম খোলামেলা। আমি আরো অভিভূত হয়েছি যে তিনি তার সব লেখা, যেগুলোর কিছু কিছু অন্তত আমার দৃষ্টিতে অত্যন্ত সমালোচিত, সেগুলোও তার ‘কালেকটেড ওয়ার্কস’-এ ঠাঁই দেওয়া হয়েছে। এটা আসলেই উৎসাহজনক ব্যাপার। গান্ধী যে কয়েক বছর দক্ষিণ আফ্রিকায় ছিলেন আমি তখনকার বিষয়ও আমার বইতে লিখেছি। ওই সময়ের অল্প কিছু কথা এখানে বলছি।

প্রথমত, গান্ধীকে পিটারমাটিজবার্গে ‘শ্বেতাঙ্গ সর্বস্ব’ রেলওয়ে কম্পার্টমেন্ট থেকে ছুঁড়ে ফেলার মাধ্যমে বর্ণবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে তার রাজনৈতিক সচেতনা সৃষ্টি হয়েছিল বলে যে বিখ্যাত কাহিনীটি বলা হয়, তা কেবল অর্ধেক সত্য। অপর অর্ধেক হলো, গান্ধী বর্ণবাদী বিভাজনের বিরোধিতা করেননি। দক্ষিণ আফ্রিকায় তার অনেক আন্দোলন ছিল ভারতীয়দের সাথে আলাদা আচরণ করার দাবিতে। তিনি কেবল ভারতীয়দের প্রতি ‘নিগ্রোদের’ (যাদের কাফির হিসেবে বলা হয়েছে) মতো আচরণ করার বিরোধী ছিলেন। তার প্রথম দিককার রাজনৈতিক বিজয়ের একটি ছিল ডারবান ডাকঘরের ‘সমস্যা দূরীকরণ’। তার সফল আন্দোলনের ফলে তৃতীয় একটি দরজা খোলা হয়। ফলে ভারতীয়দের আর ‘নিগ্রোদের’ মতো একই দরজা ব্যবহার করতে হতো না।

অ্যাংলো-বুয়র যুদ্ধে এবং বোমবাথা বিদ্রোহ দমনে তিনি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সাথে কাজ করেছেন। তিনি তার বক্তৃতায় বলেছেন, তিনি ‘একটি রাজকীয় ভ্রাতৃত্ববোধ’-এর অপেক্ষা করছেন। এভাবেই কাহিনী এগিয়েছে। ১৯১৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার সামরিক নেতা জ্যাঁ স্মাটসের সাথে সমঝোতায় পৌঁছার পর দক্ষিণ আফ্রিকা ত্যাগ করেন গান্ধী। ভারতে ফেরার পথে তিনি লন্ডনে যাত্রাবিরতি করেন। সেখানে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতি তার খেদমতের জন্য তাকে ‘কায়সার-ই-হিন্দ’ পুরস্কার দেওয়া হয়। এটা কিভাবে বর্ণবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই হয়?”

অরুন্ধতীর ‘দ্য ডক্টর অ্যান্ড দ্য সেইন্ট’ বইটি ছিল একটি বোমা। সেখানে প্রশ্ন তোলার মতো কোনো তথ্য ছিল না। হয় গান্ধীর রচনা কিংবা তার দ্বারা চালিত পত্রিকার খবর, এরকম সোর্স ব্যবহার করে তিনি দেখিয়েছেন, গান্ধী সম্পর্কিত ইতিহাসকে উল্টে দিয়ে গান্ধীর ওপর মহত্ব আরোপ করা হচ্ছে। আর এটা করে ভারতীয়দের শোষণ-শাসনে ক্ষমতাসীনদের কিছু সুবিধা হচ্ছে। কিন্তু তার লেখা বইটিও বুদ্ধিবৃত্তিক এলাকার বাইরে খুব বেশি একতা যেতে পারেনি। গান্ধী চলচ্চিত্রটি দেখলে যে কেউ বুঝবেন, ভারতীয় পুঁজিপতিদের কাছে সত্য ইতিহাসের চেয়ে ব্যবসা মূল্যটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য তারা প্রতিদিন গান্ধীর ইমেজের ওপর কয়েক টন করে তেল ঢালেন। যাতে করে গান্ধীকে নিয়ে তাদের ব্যবসাটা আরও জমজমাট হয়।

” width=”20″ height=”20″>

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১০ thoughts on “গান্ধীকে নিয়ে ইতিহাস বিকৃতি!

  1. চলচ্চিত্রে ইতিহাস তুলে ধরতে
    চলচ্চিত্রে ইতিহাস তুলে ধরতে গেলে স্ক্রিপ্ট রাইটারকে সাবধানতা অবলম্বন করা অত্যন্ত জরুরী। বিশেষ করে একটি দেশের বা জাতির ইতিহাস হলে তো আরও বেশী।

    গান্ধী চলচ্চিত্রটি দেখেছিলাম ২০০০ সালে। সবকিছু মনেও নাই। আপনার লেখা পড়ে আবার দেখার ইচ্ছা জাগ্রত হোল ভুলগুলো ধরিয়ে দেবার পর। চমৎকার লিখেছেন।

  2. বইটা পড়ার আগ্রহ পাচ্ছি।
    এই

    বইটা পড়ার আগ্রহ পাচ্ছি।
    এই ইতিহাস বিকৃতি নিয়ে ভারতে কি কোন আন্দোলন হচ্ছে? কিংবা তার বিরুদ্ধে লেখা অরুন্ধতির বইটা কি নিষিদ্ধ হয়েছিল?
    আমাদের দেশে হলে কি অবস্থা হতো?

  3. তিনি কেবল ভারতীয়দের প্রতি

    তিনি কেবল ভারতীয়দের প্রতি ‘নিগ্রোদের’ (যাদের কাফির হিসেবে বলা হয়েছে) মতো আচরণ করার বিরোধী ছিলেন।

    এটা কাফির না কাফ্রি হবে?

    1. ভারতীয় উপমহাদেশেও বিশ্বের
      ভারতীয় উপমহাদেশেও বিশ্বের বিভিন্ন এলাকার মতো নিগ্রো বংশোদ্ভূত দাসদেরকে বিভিন্ন নামে ডাকা হত- সিদ্দি, হাবশি, কাফ্রি ইত্যাদি। একেক এলাকা থেকে আগত নিগ্রোদের একেক ধরনের নামে ডাকা হয়। অনুবাদক এই টার্মসটা ধরতে পারেননি হয়তো।

  4. এই উপমহাদেশের রাজনীতির ভিত
    এই উপমহাদেশের রাজনীতির ভিত হচ্ছে ইতিহাস বিকৃতি। চলচ্চিত্রকারের দোষ দিয়ে লাভ নাই। এখানে রাজনীতিটাোও মুখ্য। ইতিহাসভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মানে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকে এই উপমহাদেশে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 63 = 67