তাজউদ্দীন আহমদ ও প্রথম বাংলাদেশ সরকারের ইতিহাস!

[নোট : ২৮ আগস্ট ২০১৪ বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ‘তাজউদ্দীন আহমদ ও প্রথম বাংলাদেশ সরকার’ শীর্ষক এক স্মারক বক্তৃতা অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তাজউদ্দীন আহমদ মেমোরিয়াল ট্রাস্টের উদ্যোগে তাঁর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এই স্মারক বক্তৃতার আয়োজন করা হয়। তাজউদ্দীন আহমদ স্মারক বক্তৃতা দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সুপার নিউমারারি প্রফেসর, আবুল কাসেম ফজলুল হক। সুদীর্ঘ লিখিত এই বক্তৃতাটির ঐতিহাসিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব অনুধাবন করে তা এখানে প্রকাশ করলাম।]
——————

সম্মানিত সভাপতি, সমাগত সুধীবৃন্দ, প্রিয় সহকর্মীবৃন্দ এবং সন্ধিৎসু ছাত্রছাত্রীরা! আমার শ্রদ্ধা, প্রীতি ও শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন। ‘তাজউদ্দীন আহমদ স্মারক বক্তৃতা’ প্রদানের আমন্ত্রণ লাভ করে আমি আনন্দিত হয়েছি এবং সম্মানিত বোধ করছি। এজন্য আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত তাজউদ্দীন আহমদ মেমোরিয়াল ট্রাস্টের এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের সম্মানিত সদস্যদের নিকট কৃতজ্ঞ।
এই বক্তৃতার বিষয় আমি ঠিক করেছি ‘তাজউদ্দীন আহমদ ও প্রথম বাংলাদেশ সরকার’। ক্ষুদ্র পরিসরে সার্বিক আলোচনা নয়, কেবল কয়েকটি প্রসঙ্গে কিছু মন্তব্য করব। সকলেই স্বীকার করবেন, পরিবেশ এ বিষয়ে গভীর অনুসন্ধানের ও তথ্যনিষ্ঠ বক্তব্য উপস্থাপনের অনুকূল নয়। সমকালীন ইতিহাস নিয়ে প্রত্যেক জাতির মধ্যেই উত্তপ্ত বিতর্ক দেখা যায়। বিতর্ক হয় ঐতিহাসিক ঘটনার গুরুত্ব ও তাৎপর্য নিয়ে। তথ্যকে বিকৃত করার কিংবা সত্যকে মিথ্যা দিয়ে আড়াল করার চেষ্টা দেখা যায় না। কিন্তু আমাদের এখানে অবস্থা অন্য রকম। এখানে গুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয়ে মিথ্যা সত্যকে স্থানচ্যুত করেছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, সত্য ও মিথ্যা একাকার হয়ে গেছে। মুক্তিযুদ্ধের মতো বিশাল মহান ঘটনার ইতিহাস দলীয় সঙ্কীর্ণতা, অপরাজনীতি ও হীন-স্বার্থান্বেষীদের কবলে পড়ে বিকারপ্রাপ্ত হয়েছে। মিথ্যা প্রচারের প্রতিক্রিয়ায় সামনে আসছে নতুন মিথ্যা। মিথ্যাকে সত্য রূপে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য মিথ্যাচারীদের মধ্যে চলছে তীব্র প্রতিযোগিতা ও চরম অসহিষ্ণুতা। অতীত নিয়ে যাঁরা মিথ্যাচারী, ভবিষ্যতের জন্য তাঁরা কী রেখে যাবেন?

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখালেখির অন্ত নেই। নানা জন নানা উদ্দেশ্যে লেখেন। এর মধ্যে কেউ কেউ খুব আন্তরিকতার সঙ্গে নিজেদের অভিজ্ঞতার ও অনুসন্ধানের বিবরণ লিখে প্রকাশ করেছেন। প্রথম বাংলাদেশ সরকার বিষয়েও প্রকাশিত হয়েছে দু-একটি মূল্যবান গ্রন্থ। মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু বিষয়ে রচিত অন্তত কিছু বইতে তাজউদ্দীন আহমদ আছেন। বাংলাদেশ সরকার পনেরো খণ্ডে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র নামে যে গ্রন্থ প্রকাশ করেছে, তাতে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রশ্নে বিতর্ক থাকলেও, অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও অসাধারণ মূল্যবান সব তথ্য সংকলিত আছে। লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে গেলে বোঝা যায়, মিথ্যার প্রাচীর ভেদ করে জনসাধারণের চেতনাপ্রবাহে প্রকৃত ঘটনাবলির উপলব্ধি ফল্গুধারার মতো বহমান আছে। লোকে মিথ্যা নয়, সত্য অবলম্বন করে চলতে চায়। যেসব গ্রন্থ আন্তরিকতা ও তথ্যনিষ্ঠার সঙ্গে লিখিত, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাকালীন অসাধারণ সব মানবীয় অভিজ্ঞতার দলিল হিসেবে সেগুলো অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক। কিছু গ্রন্থ যুগান্তকারী ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু সেগুলোর প্রচার নেই এবং সেগুলো নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা নেই। ঢাকাকেন্দ্রিক সংস্কৃতিতে ভালো অর্থে সমালোচনার কোনো পরম্পরা আমরা গড়ে তুলতে পারিনি। মিথ্যার পক্ষে বিপুল প্রচার আছে এবং মিথ্যার অনুকূলে তরুণ প্রজন্মের মগজ ধোলাই করার বিপুল প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়। প্রচারমাধ্যমসমূহের ‘বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা’র মর্মে ‘সর্বজনীন কল্যাণবুদ্ধি’ সুলভ নয়। প্রচারমাধ্যম কি কল্যাণকর কোনো নতুন সম্ভাবনাকে উঠতে দিচ্ছে? যাঁরা গোঁড়া, স্বার্থান্ধ, অসহিষ্ণু, তাঁদের কাছে মূল্যবোধসম্পৃক্ত যুক্তি সমাদর পায় না। যে কোনো বিষয় নিয়েই তাঁরা কেবল নিজেদের স্বার্থে পাল্টা যুুক্তি দেখাতে থাকেন এবং অসহিষ্ণুতা প্রদর্শন করেন। সময়ের ব্যবধানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও আজ বিস্মৃত। বাঙালিকে গভীরভাবে ভালোবেসে যাঁরা বাঙালির উন্নতির উপায় সন্ধান করেছেন, তাঁদের কেউ কেউ কোনো কোনো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বাঙালিকে বলেছেন ‘আত্মবিস্মৃত, আত্মভ্রষ্ট, আত্মঘাতী’। কোনো জাতির ইতিহাসকে বিকৃত করা হলে সেই জাতির প্রাণশক্তিই বিকৃত হয়ে যায়। সত্য ও মিথ্যায় পূর্ণ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক তথ্যের ভাণ্ডার এত বিশাল যে, তা থেকে নির্দিষ্ট বিষয়ে প্রয়োজনীয় সত্য খুঁজে বের করা দুষ্কর।

তবু মনে হয়, সত্যের কেমন যেন একটা অদ্ভুত শক্তি আছে। সেই শক্তির বলে কোনো না কোনো সময় সে মিথ্যার আস্তর ভেদ করে বেরিয়ে আসে। তখন তাকে আর রোধ করা যায় না। কোনো কোনো গ্রন্থ সামনে আসলে আমার মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথের একটি উক্তি- “এখানে ভাষা চুপ করিয়া আছে, প্রবাহ স্থির হইয়া আছে, মানবাত্মার অমর আলোক কালো অক্ষরের শৃঙ্খলে কাগজের কারাগারে বাঁধা পড়িয়া আছে। ইহারা সহসা যদি বিদ্রোহী হইয়া উঠে, নিস্তব্ধতা ভাঙ্গিয়া ফেলে, অক্ষরের বেড়া দগ্ধ করিয়া একেবারে বাহির হইয়া আসে।”

‘সত্য’ কথাটির নানা অর্থ আছে। Truth-এরও আছে নানা অর্থ। Fact ও truth এক নয়। Absolute truth, relative truth, whole truth, partial truth ইত্যাদি কথা চালু আছে। বাংলায়ও আছে পরম সত্য, আপেক্ষিক সত্য, পূর্ণ সত্য, আংশিক সত্য ইত্যাদি কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মনোগ্রামে লেখা ছিল, TRUTH SHALL PREVAIL. বাংলায় বলা হতো ‘সত্যের জয় অবশ্যম্ভাবী।’ ‘সত্য’ বলে বোঝানো হতো তথ্যের ওপর ভিত্তি করে উদ্ভাবিত সর্বজনীন পরম ন্যায়, পরম কল্যাণ ও পরম সুন্দরের সমন্বিত পরম সত্তা। Truth-এরও এই রকম অর্থই করা হতো। ‘ধর্মের জয় অবশ্যম্ভাবী’- এই কথাটিও চালু ছিল। ধর্ম বলেও বোঝানো হতো সর্বজনীন পরম ন্যায়, পরম কল্যাণ ও পরম সুন্দরের সমন্বয়ে সৃষ্ট পরম সত্তা। এক্ষেত্রে ‘ধর্ম’ ও ‘অধর্ম’ ছিল মানুষের আন্তরিক বোধের ব্যাপার, শাস্ত্রীয় কিংবা পার্বণিক ব্যাপার নয়। ‘সত্য’ ও ‘ধর্ম’ কথা দুটো ছিল সমার্থক। মানুষের নৈতিক চেতনাকে কার্যকর ও অপরাজেয় রাখার জন্য ‘সত্য’ ও ‘ধর্ম’ কথা দুটোতে সমাজ সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিত। মহাত্মা গান্ধী তখন প্রচার করছিলেন সত্যাগ্রহ, সেই সঙ্গে অহিংসা, সর্বোদয় ও অসহযোগ (অসত্যানুসারীদের সঙ্গে)। সত্যাগ্রহের সত্যও সর্বজনীন পরম ন্যায়, পরম কল্যাণ ও পরম সুন্দরের সমন্বয়ে উদ্ভাবিত পরম সত্তা। সত্যকে গান্ধী ঈশ্বরও বলেছেন। সত্য, ধর্ম, ঈশ্বর গান্ধীর কাছে এক ও অভিন্ন। গান্ধী তাঁর জীবনব্যাপী কর্মধারাকে বলেছেন my experiment with Truth. সত্য নির্ণয়ের জন্য দরকার গণতান্ত্রিক পদ্ধতি। আর গণতন্ত্রের জন্য দরকার সর্বোদয় অর্থাৎ সকলের উত্থান ও উন্নতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার মনোগ্রাম থেকে TRUTH SHALL PREVAIL. বাতিল করে যখন একের পর এক ভিন্ন কথা গ্রহণ করতে লাগল, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য ও প্রকৃতিও বদলে যেতে লাগল। বাইরে জনজীবনেও ঘটে চলল পরিবর্তন। আজকের বাস্তবতায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে আমরা কি বলতে পারি, ‘সত্য অবশ্যই প্রতিষ্ঠা পাবে’? আমরা যদি সত্যসন্ধ ও সত্যনিষ্ঠ হই- গান্ধীর ভাষায় সত্যাগ্রহী- কেবল তাহলেই সত্যের জয় অবশ্যম্ভাবী হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার প্রতিষ্ঠাকালীন মটো ত্যাগ করেছে সত্যকে ত্যাগ করেছিল বলেই সত্যকে পরম লক্ষ্য জ্ঞান করে সে চলতে পারেনি, চলতে চাইছে না। মানুষ সুন্দরের প্রতি যে আকর্ষণ বোধ করে, সত্যের প্রতিও কি তা করে? কীটসের উক্তি : Beauty is truth, truth is beauty. সত্য ও সুন্দরকে এক করে দেখার কথা কে ভাবে? ন্যায়, কল্যাণ ও সুন্দরকে এক করে দেখার সামর্থ্য কি একালের মানুষের আছে?

১৯৭২ সালের প্রায় শুরু থেকেই তাজউদ্দীন আহমদের প্রতি তাঁর দলের একটি অংশে অসহিষ্ণুতা দেখে আসছি। প্রথম বাংলাদেশ সরকারকেও তাঁরা গুরুত্ব দেন না। তাঁদের স্লোগান ছিল : ‘একনেতা একদেশ – বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ।’ তাঁদের ধারণা ছিল তাজউদ্দীন আহমদের কিংবা অন্য কোনো নেতার নাম সামনে আসলে দলীয় ঐক্য বজায় থাকবে না। কিন্তু দলীয় ঐক্য কি রক্ষা পেয়েছিল? দলীয় ঐক্য লঙ্ঘন করেই তো জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) আত্মপ্রকাশ করেছিল (৩১ অক্টোবর ১৯৭২), এবং নবগঠিত এই দল মূল দলের প্রতি সরাসরি শত্র“তার মনোভাব নিয়ে প্রবলভাবে, প্রচুরভাবে, ভীষণভাবে এগিয়েছিল। এর পরেও মূল দলে ফাটলের সম্ভাবনা ছিল বলেই দলের একাংশ থেকে স্লোগান দেয়া হতো : ‘বঙ্গবন্ধু যেইখানে- আমরা আছি সেইখানে।’ যে জাসদ রাতারাতি এত জনপ্রিয় ও সম্ভাবনাময় হয়ে উঠেছিল, অচিরেই তা ভেঙে খান খান হয়ে যায় গণতান্ত্রিক উপায়ে ভেতর থেকে সংগঠিত হয়নি বলে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলের ধারায় ভাঙনের দৃষ্টান্তের অভাব নেই। প্রবাদ আছে, ‘এক দরগায় দুই পীরের জায়গা হয় না।’ গণতান্ত্রিক দলে তো দরগার মতো অবস্থা হওয়ার কথা নয়! প্রথম বাংলাদেশ সরকারকে গুরুত্ব ও মর্যাদা দিতে গেলে বঙ্গবন্ধুর ভাবমূর্তি খর্ব হবে- একথা কতখানি ঠিক? কোনো ভাবমূর্তির জন্য ইতিহাসের কোনো অধ্যায়কে লুকিয়ে ফেলা কিংবা মিথ্যার আশ্রয় নেয়া কি সমীচীন? ‘ভাবমূর্তির পূজা’, ‘ব্যক্তিপূজা’ -এসবের দ্বারা প্রগতি ব্যাহত হয়, মানবতা অপমানিত ও লাঞ্ছিত হয়।

রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে নেতৃত্বের সমস্যা জটিল, তবে তার গণতান্ত্রিক সমাধান সম্ভব। একনায়কতান্ত্রিক (a system in which the leader is invested with absolute authority; dictatorship; autocracy; authoritarianism; despotism) সমাধান বিপর্যয় ডেকে আনে। কোনো রাষ্ট্রের রাজনীতিতে আন্তর্দলীয় বিরোধের (inter-party struggle) পাশাপাশি অন্তর্দলীয় বিরোধও (inner-party struggle) থাকে, এবং দুই বিরোধের মধ্যে কোনোটিই কোনোটির চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। রাজনৈতিক দল আদর্শ, আদর্শ-অভিমুখী বাস্তবসম্মত কর্মসূচি ও সুষ্ঠু কর্মনীতি অবলম্বন না করে- সুষ্ঠু দলীয় সংবিধান অবলম্বন না করে- সুস্থ ধারায় থাকতে পারে না। গণতন্ত্র কেবল ভোটাভুটি নয়, আরো অনেক কিছু। গণতন্ত্র যতটা রাজনৈতিক, ততটাই আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ব্যাপারও। গণতন্ত্রের মর্মে থাকে সরকারি দল, বিরোধী দল নির্বিশেষে সকলের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সম্প্রীতি। গণতন্ত্র এক বিকাশশীল ব্যাপার। নেতৃত্বের বেলায় যেখানেই গণতন্ত্রের ব্যত্যয় ঘটে, সেখানেই দেখা দেয় চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র, অন্তর্ঘাত, গুপ্তহত্যা, হত্যাকাণ্ড ইত্যাদি, কিংবা গণতন্ত্রের নামে একনায়কতন্ত্র, কর্তৃত্ববাদ, আত্মসম্মানবোধ বিবর্জিত চাটুকারিতা ও সকলের মনোবলহীনতা (total demoralization)। তাজউদ্দীন আহমদের প্রতি যে বিরূপতার কথা আমি উল্লেখ করেছি, অনেক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরেও তাঁর দলে আজো তা অব্যাহত আছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতন্ত্রের জন্য মূল্যবোধসম্পৃক্ত যুক্তিসঙ্গত inner-party struggle-এর কোনো ধারণাই নেই, আছে কেবল স্বতঃস্ফূর্ত power-struggle যা কথাবার্তায় শ্লীলতার সীমা লঙ্ঘন করে এবং কাজের বেলায় সহিংস রূপ নেয়।
যেকোনো জাতির রাজনীতিকে বোঝার জন্য সেই জাতির রাজনৈতিক দলসমূহের আন্তর্বিরোধ ও অন্তর্বিরোধ – দুটোরই ইতিহাস জানা অপরিহার্য। ইতিহাসের জ্ঞান ছাড়া কোনো বিষয়ের জ্ঞানই পূর্ণতা পায় না- কার্যকর রূপও লাভ করে না। আমাদের এখানে রাজনৈতিক ইতিহাসে আন্তর্বিরোধকে গুরুত্ব দেয়া হলেও অন্তর্বিরোধকে বিবেচনার আওতায় আনা হয় না। মনোজগত থেকে যায় বিবেচনার বাইরে। ফলে পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। মুহসীন হলে সাতজন ছাত্রলীগ নেতার হত্যাকাণ্ড, সপরিবারে আবদুর রব সেরনিয়াবাতের হত্যাকাণ্ড, সপরিবারে ফজলুল হক মণির হত্যাকাণ্ড, সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড, জেলখানায় মুক্তিযুদ্ধকালীন চার নেতার হত্যাকাণ্ড, জিয়াউর রহমান ও আবুল মঞ্জুরের হত্যাকাণ্ড, বিডিআর-এর ৫৭ জন সামরিক অফিসারের হত্যাকাণ্ড, গণতন্ত্রের নামে একনায়কতন্ত্র ও দেশব্যাপী সকলের মনোবলহীনতা -এসব নিয়ে আমরা যতই সভা-সমাবেশ ও আইন-আদালত করি না কেন, সংশ্লিষ্ট সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানের অন্তর্বিবোধের ইতিহাস না জানলে সামান্যই জানা হয়। আমি বলতে চাইছি, রাজনীতির সুস্থতার ও গণতন্ত্রের অস্তিত্বের জন্য আন্তর্দলীয় বিরোধ মীমাংসার যেমন, অন্তর্দলীয় বিরোধ মীমাংসারও তেমনি সুষ্ঠু উপায় অবলম্বন অপরিহার্য। বাংলাদেশে বিভিন্ন দলের নেতাদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও শ্রদ্ধাবোধ খুঁজে পাওয়া যায় না। গণতন্ত্রের নামে দলীয় রাজনীতির প্রবণতা, দলের ভেতরে সব সময়ই অবাধ একনায়কতন্ত্রের (absolute dictatorship) দিকে। দলের বাইরেও একনায়কেরাই সমর্থন লাভ করেন।

তাছাড়া মন্ত্রিপরিষদ থেকে ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত নেতৃত্বের ধারায় দেখা যাচ্ছে বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকার ও পরিবারতন্ত্র। বাংলাদেশের যাত্রা, গণতন্ত্রের কথা বলা হলেও, গণতন্ত্রের দিকে নয়।
মুক্তিযুদ্ধ আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড়, গুরুত্বপূর্ণ ও গৌরবজনক ঘটনা। এ নিয়ে সঙ্গতভাবেই আমরা গর্ববোধ করি এবং শহিদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করি। প্রশ্ন হলো, আমাদের গোটা ইতিহাসে আর কোনো গুরুত্বপূর্ণ কিংবা গৌরবজনক ঘটনা কি নেই? কেবল এক ঘটনায় আমরা আমাদের মনকে আচ্ছন্ন রাখছি কেন? গোটা ইতিহাসের বিকাশ ঘটেছে প্রগতিশীল, রক্ষণশীল ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। এই ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সূত্র ধরে বিভিন্ন কালে কাজ করেছে বিভিন্ন বৈদেশিক শক্তি। বৈদেশিক শক্তি দীর্ঘকাল এদেশে রাজত্ব করেছে। আর্থ-সামাজিক-রাষ্ট্রিক ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে কারণ-করণীয়-করণ ও ফলাফলের সূত্র পাওয়া যায়। কোনো ঘটনাই অকারণে ঘটেনি, ঘটে না।। মুক্তিযুদ্ধ ও এর অন্তর্গত প্রতিটি বিষয়কে কারণ-করণীয়-করণ ও ফলাফলের সূত্র ধরে বিচার করা সমীচীন। গোটা ইতিহাসে দৃষ্টিকে প্রসারিত করতে হবে। ইতিহাসের গতি নির্দ্বন্দ্ব নয়।

মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম, জামায়াতে ইসলামী ও পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি পাকিস্তানে বিশ্বাসী ছিল, তারা পাকিস্তানকে রক্ষা করার জন্য আগাগোড়াই সচেষ্ট ছিল এবং তারা আমাদের স্বায়ত্তশাসন-অভিমুখী স্বাধীনতা-অভিমুখী, অচেতন ও সচেতন সকল প্রচেষ্টা, সংগ্রাম, যুদ্ধ ও বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিল। তাদের থেকে কিছু লোক ১৯৭১-এ হানাদার বাহিনীর সক্রিয় সহকর্মী হয়েছিল। যারা হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসলীলায় অংশগ্রহণ করেছিল, যুদ্ধ শেষ হওয়ার দুই-তিন বছরের মধ্যই তাদের বিচার সম্পন্ন হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বিচার আজো চলছে। কবে শেষ হবে কে জানে? শাস্তিযোগ্য অপরাধীদের কথা বলছি না, বলছি অন্য সবার কথা- কোনো পর্যায়ে জাতির কি তাদের প্রতি সম্প্রীতির মনোভাব অবলম্বন করা সমীচীন হবে? মুজিব-সরকারের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা (১৯৭৩) কি ভুল ছিল?

আওয়ামী লীগ বলয়ের বাইরে কিছু দল ছিল এবং জনসাধারণের নানা অংশ ছিল, যারা আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব পছন্দ না করলেও কিংবা মেনে না নিলেও, মুক্তিযুদ্ধের বিজয় ও স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করেছিল। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার পর প্রায় চুয়াল্লিশ বছর ধরে তারা কী করেছে? আওয়ামী লীগই-বা তাদের প্রতি কী আচরণ করেছে? যুদ্ধকালে তাজউদ্দীন সরকারকে সমর্থন দিয়ে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যে তারা শামিল ছিল। সংখ্যায় তারা নগণ্য ছিল না। মওলানা ভাসানীও এই ধারায় ছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশেও ভাসানীর শক্তি সামান্য ছিল না। দেশের ভেতরে নানা স্থানে গড়ে ওঠা কিছু বাহিনী কর্নেল ওসমানীর কেন্দ্রীয় কম্যান্ডের সঙ্গে কিংবা সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ ছাড়াই স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করেছিল। তাছাড়া ছয় দফা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সময় সাধারণ মানুষ যাঁরা আওয়ামী লীগের সমর্থক হয়েছিলেন, তাঁরাও অনেকে পরে আর আওয়ামী লীগের সমর্থক বা অনুসারী থাকেননি। এই সব-শক্তিকে পাইকারিভাবে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি বলা কি সমীচীন? আমাদের স্বাধীনতা-সংগ্রাম কি সঙ্কীর্ণ দলীয় ব্যাপার মাত্র ছিল, জনগণের ব্যাপার ছিল না? মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের কিছু বিষয় নিয়ে যে বিতর্ক ও অন্ধ ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া চলছে, তা দ্বারা কি রাষ্ট্র, জাতি কিংবা জনগণের কোনো কল্যাণ হচ্ছে? মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে কিংবা বঙ্গবন্ধুর ভাবমূর্তিকে সঙ্কীর্ণ দলীয় স্বার্থে কিংবা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার ফল কি শেষ পর্যন্ত ভালো হবে? পুরাতন পরিত্যক্ত সব সংস্কার-বিশ্বাস ও পরাজিত সামাজিক শক্তির পুনরুজ্জীবন ঘটেছে কেন? তারা বাংলাদেশকে পাকিস্তানে ফিরিয়ে নিতে চায়- একথা বললে কি সত্য কথা বলা হয়? H.A.L Fisher-এর একটি উক্তি : Progress is not a law of nature. The ground gained by one generation can be lost by the next. প্রগতি স্বতঃস্ফূর্ত ব্যাপার নয়, সচেতন মানবীয় সাধনা সংগ্রাম ও চেষ্টা দ্বারা অর্জনের ব্যাপার। তা যেমন অর্জন করার ব্যাপার, তেমনি রক্ষা করার ও নতুন অর্জনে এগিয়ে যাওয়ারও ব্যাপার। বাংলাদেশে গণতন্ত্র যে পরিমাণে ব্যর্থ হচ্ছে, ধর্মীয় শক্তি ঠিক সেই পরিমাণেই পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে। গণতন্ত্রের ধারণাকে বিকৃত করা না হলে, দুর্নীতি ভাঁওতা-প্রতারণা ও হুজুগ সৃষ্টিতে না গিয়ে গণতন্ত্রের জন্য আন্তরিকভাবে চেষ্টা করা হলে এমন হতো না।

দেশে মার্শাল ল’ হয়েছে, জরুরি অবস্থা হয়েছে, সে কি কেবল সেনাপতিদের ক্ষমতালিপ্সার কারণে? রাজনৈতিক দলগুলোর কি কোনো দায়িত্ব ছিল না? বিদেশি শক্তি এদেশে এত কর্তৃত্বশীল কেন? প্রগতিশীল বলার মতো কোনো রাজনৈতিক দল তো খুঁজে পাওয়া যায় না। প্রগতিশীল কোনো সংগঠনের উদ্ভবের কোনো লক্ষণ কি দেখা যায়? প্রগতি কী?

যেসব শক্তিকে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি বলে রাত-দিন তিরস্কার করা হয়, তাদের খুব বড় করে দেখা এবং দেখানো ঠিক নয়। সংখ্যায় বড় দেখা গেলেও চিন্তা-ভাবনা ও বৌদ্ধিক সামর্থ্যরে দিক দিয়ে তাদের নিতান্তই দুর্বল দেখা যায়। বিরোধ যাতে বংশানুক্রমিক রূপ না নেয়, সহিংস হয়ে না ওঠে, সেদিকে লক্ষ রাখা দরকার। পশ্চাৎবর্তী সংস্কৃতির লোকদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া ভালো। কেবল প্রতিপক্ষের দিকেই নয়, নিজেদের ত্র“টি-বিচ্যুতি ও সীমাবদ্ধতার দিকেও তাকাতে হবে। শৃঙ্খলা ও আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনকে অস্বীকার করে কতদূর যাওয়া যায়? নিজেকে জান, আত্মা নং বিদ্ধি, know thyself, a life unexamined is not worthliving- এসব কথাকে মূল্য দিতে হবে। শরৎচন্দ্রের একটি মহান উক্তি : “ত্রুটি, বিচ্যুতি, অপরাধ, অধর্মই মানুষের সবটুকু নয়। … মানুষকে তন্ন তন্ন করিয়া দেখিবার চেষ্টা করিলে তাহার ভিতর হইতে অনেক জিনিস বাহির হয়, তখন তাহার দোষ-ত্রুটিকেও সহানুভূতি না করিয়া থাকা যায় না।”
আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বে গৌরবজনক দিকের সঙ্গে ত্রুটি-বিচ্যুতি ও দুর্বলতার দিকও ছিল। যুদ্ধে জয়লাভের পর, ১৯৭২ সালের প্রায় শুরু থেকেই, ত্রুটি-বিচ্যুতি ও অনুচিতের দিক দ্রুতগতিতে বিকশিত হয়ে চলছে, আর গৌরবজনক দিক লোপ পেয়ে যাচ্ছে। উন্নততর ভবিষ্যৎ সৃষ্টির জন্য অতীতের ভুল এড়িয়ে চলতে হয়। উন্নততর ভবিষ্যৎ সৃষ্টির জন্য ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণের প্রয়োজনে নেতৃত্বের গুণাবলির সঙ্গে ত্রুটি-বিচ্যুতি ও দুর্বলতাগুলোকেও দেখতে হয়। শুদ্ধির ও সংশোধনের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সে কাজে কেউ অগ্রসর হন না কেন?

ইতিহাসকে চেপে রেখে, দাবিয়ে রেখে, বিকৃত করে কখনো সুফল হয় না। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্র, জাতি ও জনজীবন। একটি মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য অজস্র মিথ্যার আশ্রয় নেয়া হয়, তার পরেও সেই মিথ্যা প্রতিষ্ঠা পায় না। মিথ্যার সঙ্গে মিথ্যার, হীন-স্বার্থান্বেষীদের সঙ্গে হীন-স্বার্থান্বেষীদের প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সংঘাত-সংঘর্ষ যেখানে সংযমহীন, নিয়ন্ত্রণহীন, সেখানে মতামতের বেলায় সহিষ্ণুতা, গ্রহিষ্ণুতা ও সম্মানজনক সহাবস্থানের মনোভাব থাকে না- থাকতে পারে না। সর্বোপরি জনগণ সম্পূর্ণ মনোবলহারা totally demoralized) হয়ে পড়ে। এই রকম অবস্থা কত কালের মধ্যে কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে তা অনুসন্ধান করে দেখা দরকার।

অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে গেলে মনে হয়, অবস্থা এরকম থাকবে না। মানুষের মধ্যে চিন্তাশক্তি ও শ্রমশক্তি আছে, শুভকর পরিবর্তনের আকাক্সক্ষা আছে, কর্মস্পৃহা আছে- মহান লক্ষ্যে সাধনা ও সংগ্রামের স্পৃহাও দেখা দেবে। নতুন রেনেসাঁস, নতুন গণজাগরণ ও উন্নত নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টির মধ্য দিয়ে ইতিহাসের গতি ভালোর দিকে মোড় নেবে- এটা বিশ্বাস করি। তা সত্ত্বেও চারপাশের পরিবেশ আমাকে হতোদ্যম করে। অনন্ত জীবনপ্রবাহে আমাদের প্রত্যেকের জীবন তো সান্ত! এই বক্তৃতার শিরোনাম যেসব বিষয়ের বর্ণনা ও মূল্যবিচার দাবি করে, সেগুলো সম্পর্কে আমি যথেষ্ট জানি না। এখন আমার অনুসন্ধিৎসাও অন্যকিছুর প্রতি। আমার মনে হচ্ছে, এই বক্তৃতার জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি আমি নই। তবু অসতর্কতাবশত যে দায়িত্ব আমি নিয়ে ফেলেছি, তার দায় আমাকে সারতে হচ্ছে ভাসাভাসা কিছু কথা দিয়ে। আমার অসামর্থ্যরে জন্য আমি দুঃখিত। যেসব ধারণা এই বক্তব্যে প্রকাশ পাচ্ছে, সেগুলোকে দেশের কোটি কোটি লোকের মধ্যে মাত্র একজনের ধারণা বলে গণ্য করা সমীচীন হবে।

রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছে সাধনা ও সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস। তাতে নানা মতের, নানা দলের লোকদের অবদান আছে। শেষ পর্যন্ত যে ধারাবাহিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা হলো আওয়ামী লীগের ছয় দফা আন্দোলন (১৯৬৬-৭১)। ছয় দফার মধ্যে বাঙালির স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের বীজ উপ্ত ছিল। আওয়ামী লীগের পাশাপাশি আরো নানা দল-মতের লোকেরা নানাভাবে স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেছেন। ছয় দফা আন্দোলনে নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান, এবং তাঁর ঘনিষ্ঠতম সহযোগী ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। ছয় দফা নিয়ে ১৯৬৬-র ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ পর্যন্ত তাঁরা দুজন আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের মতপার্থক্য দূর করেছেন, একাত্ম হয়ে সংগ্রাম করেছেন, নির্যাতন ভোগ করে লক্ষ্য অর্জনের দিকে এগিয়ে গেছেন। কিন্তু ২৫ মার্চে তাঁদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে যায়। শেখ মুজিবের চেতনায় ছিল আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে জিন্নাহ্ ও নেহরুর কাছে মাউন্টব্যাটেনের ক্ষমতা হস্তান্তরের দৃশ্য; আর তাজউদ্দীনের চেতনায় ছিল বিভিন্ন জাতির মুক্তিসংগ্রামের ও মুক্তিযুদ্ধের দৃশ্য। সামরিক আক্রমণ আসন্ন জেনে শেখ মুজিব বন্দিত্ব বরণ করেন; আর তাজউদ্দীন সহকর্মীদের নিয়ে, প্রবাসে নিজেদের সরকার গঠন করে, মুক্তিবাহিনী গঠন করে, দেশের জনসাধারণকে নিয়ে, ভারতের সরকার ও জনগণের সাহায্য নিয়ে, বিশ্ববাসীর সমর্থন নিয়ে, নয়মাস যুদ্ধ করে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেন। তাজউদ্দীনের এই ভূমিকাকে বঙ্গবন্ধু প্রসন্ন চিত্তে গ্রহণ করতে পারেননি। অপারেশন সার্চলাইটের পরে যদি ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আবার আলোচনা হতো, তাহলে কী হতো? স্বাধীন বাংলাদেশে দুজন একই মন্ত্রিপরিষদে কর্মরত থাকলেও ২৫ মার্চে যে বিচ্ছেদ ঘটে যায়, তা আর কাটেনি। ২৬. ১০. ৭৪ তারিখে তাজউদ্দীন মন্ত্রিপরিষদ থেকে বহিষ্কৃত হন। তাঁদের এই বিচ্ছেদ তাঁদের জন্য যেমন, জাতির জন্যও তেমনি মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির কারণ হয়েছে।

সম্রাট আকবর ভারতকে পনেরোটি সুবায় বিভক্ত করে দিল্লি থেকে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। ওই বিভাগের যুক্তিসঙ্গত ভৌগোলিক ভিত্তি ছিল। প্রতিটি সুবার আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিশিষ্টতাও ছিল। নানা পরিবর্তনের পর ১৯৪০-এর দশকে যে বাস্তবতা বিরাজ করছিল তাতে ভারতে সতেরোটি কিংবা তার চেয়েও দু-একটি বেশি স্বাধীন সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র হতে পারত। সব জাতিরাষ্ট্র মিলে একটি কনফেডারেশন গঠন করতে পারত। সেটা হলে ভারতে জাতিসমস্যার সুষ্ঠু সমাধান হতো। সে রকম চিন্তা ছিল, কিন্তু দলীয় রাজনীতিতে তা স্থান করে নিতে পারেনি। হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ, নানা ঐতিহাসিক প্রবণতা, ব্রিটিশ সরকারের Divide and Rule Policy ও রাজনৈতিক নেতাদের বিচ্যুতির ফলে জাতীয়তাবাদের স্থলাভিষিক্ত হয় সাম্প্রদায়িকতাবাদ। হিন্দু সাম্প্রদায়িকতাবাদ ও মুসলিম সাম্প্রদায়িকতাবাদের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ধারায় ব্রিটিশ শাসনের অবসানের মধ্য দিয়ে কায়েম হয় দুই রাষ্ট্র- পাকিস্তান ও ভারত। এর দ্বারা উপমহাদেশে জাতিসমস্যার সুষ্ঠু সমাধান হয়নি।

পাকিস্তানের অবস্থা ছিল অস্বাভাবিক। রাষ্ট্র হয়ে ওঠার কোনো বাস্তবতাই সেদিনের পাকিস্তানে ছিল না। সেজন্য কার্যকর সংবিধান প্রণয়ন সম্ভব হয়নি। ১৯৪৮ সালে সংবিধানের মূল নীতি ঘোষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পূর্ববাংলার স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে শুরু হয় তীব্র বিতর্ক। তারও আগে সূচিত হয়েছিল রাষ্ট্রভাষা-বিতর্ক ও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। তেইশ বছর ধরেই দেখা গেছে পাকিস্তানকে স্থায়ী করার নানা কৃত্রিম প্রচেষ্টা। চেষ্টা চালানো হয়েছিল পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ ও পাকিস্তানবাদী জাতীয় সংস্কৃতি গড়ে তোলার। এই কৃত্রিম প্রচেষ্টার প্রতিবাদে দেখা দেয় পূর্ব বাংলার বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাঙালি সংস্কৃতি। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে পাকিস্তানকে স্থায়ী করার জন্য নানাবিধ দমনমূলক ও প্ররোচনামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, এবং তার প্রতিবাদে দেখা দেয় গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষা ও ভিন্ন ধারার চিন্তা। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তান বঞ্চিত হতে থাকে এবং বৈষম্য বাড়তে থাকে। এরও প্রতিবাদ দেখা দেয়। রাষ্ট্রব্যবস্থার অঙ্গে অঙ্গে পাঞ্জাবের কর্তৃত্ববাদী লোকদের ভূমিকা সকলকে অতিষ্ঠ করে তোলে। পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক ক্রমেই খারাপ হয়ে চলে। মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম, জামায়াতে ইসলামী প্রভৃতি দল পাকিস্তানকে স্থায়ী করার তৎপরতায় মেতে ছিল। সেনাশাসক আইয়ুব খানও মুসলিম লীগ দখল করে নিয়ে পাকিস্তানবাদী নীতিই অবলম্বন করেছিলেন।

১৯৫৪ সালে East Bengal Lagislative Assembly-র যে নির্বাচন হয়, তাতে যুক্তফ্রন্টের একুশ দফা কর্মসূচির মূল প্রবণতা ছিল পূর্ববাংলার স্বাতন্ত্র্য ও আত্মনির্ভরতা অর্জন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সাড়ে আট বছর পর ১৯৫৬ সালে যে সংবিধান গৃহীত হয় তাতে পূর্ববাংলার স্বায়ত্তশাসনের স্বীকৃতি ছিল না। সেই সংবিধানের বাস্তবায়নের সময়ে ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে জারি হয় সামরিক আইন। সামরিক আইনের মধ্যে ১৯৬২ সালে গৃহীত হয় ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ ভিত্তিক নতুন সংবিধান। তারও আগে ১৯৬২ সাল থেকেই আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধে তুমুল আন্দোলন আরম্ভ হয়েছিল। আন্দোলনের মূল দাবি ছিল মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, ১৯৫৯ সালের শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বাতিল ও গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রতিষ্ঠা। আন্দোলনের ভেতর থেকে সার্বিক রাজনৈতিক লক্ষ্য সংবলিত কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি বেরিয়ে আসেনি। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির প্রধান মওলানা ভাসানী ও আওয়ামী লীগের প্রধান হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীই ছিলেন তখন প্রধান নেতা। ভাসানী চাইতেন উন্নত সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে আন্দোলনকারী সকল দলের কর্মসূচিভিত্তিক ঐক্য। কিন্তু তাঁর কিংবা তাঁর দলের সেরকম কোনো কর্মসূচি ছিল না। তিনি ছিলেন জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের প্রবল সমর্থক। সোহরাওয়ার্দী আইয়ুব খান প্রদত্ত ১৯৬২ সালের সংবিধানের গণতন্ত্রায়ণ (সোহরাওয়ার্দীর ভাষায় democratization) দাবি করতেন। আওয়ামী লীগ ও ন্যাপের মধ্যে কোনটি বড়, কোনটি ছোট, তা তখন বোঝা যেত না। ছাত্র ইউনিয়ন তখন ছাত্রলীগের চেয়ে জনপ্রিয় ও বড় হয়ে উঠেছিল। এ-অবস্থায় ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দী মারা যান।

এর মধ্যে ১৯৬৪ সালের শেষে মৌলিক গণতন্ত্রী নির্বাচন ও জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচন এবং ’৬৫ সালের শুরুতে প্রসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তাতে সরকারি মুসলিম লীগই (কনভেনশন) জয়ী হয়- আইয়ুব খানই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। নির্বাচনের পরেও গতানুগতিক ধারায় সরকারবিরোধী আন্দোলন চলতে থাকে।

১৯৬৬ সালের মার্চে শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি হন। তারপর তিনি পাকিস্তান আওয়ামী লীগেরও সভাপতি হন। সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের জন্য চাইতেন শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার, পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবি তিনি অনুমোদন করতেন না। সেজন্য স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের আকাক্সক্ষা তখন অবদমিত ছিল। ভাসানী পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সরব ছিলেন। সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পরেই শেখ মুজিব, তাজউদ্দীন ও ছাত্রলীগ স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নটি সামনে নিয়ে আসেন। ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের যুদ্ধ হয়। যুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তানে নিরাপত্তার অভাব অনুভূত হয়। ১৯৬২ সাল থেকে সরকার উৎখাতের যে আন্দোলন চলে আসছিল, রাজনৈতিক বিবেচনায় তা ছিল লক্ষ্যহীন। রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল অন্তহীন। এ অবস্থায় একটি সর্বাঙ্গীণ রাজনৈতিক লক্ষ্য ও কর্মসূচির অভাব শিক্ষিত সমাজে অনুভূত হচ্ছিল। শিক্ষিত সমাজে তখন একদিকে ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্রের আকাক্সক্ষা, অপরদিকে ছিল সমাজতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র-অভিমুখী গণতন্ত্রের আকাক্সক্ষা। গণতন্ত্র সম্পর্কে প্রথম পক্ষের নেতাদের চিন্তা স্পষ্ট ছিল না, আর জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে দ্বিতীয় পক্ষের নেতাদের চিন্তা স্পষ্ট ছিল না। এই পটভূমিতেই প্রণীত হয়েছিল ছয় দফা। ’৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের একুশ দফার পর ’৬৬ সালের আওয়ামী লীগের ছয় দফাই হয়েছিল জাতীয় লক্ষ্য। একুশ দফা অনেক বেশি বিষয়কে ধারণ করেছিল, ছয় দফা কম বিষয়কে।

ছয় দফা অত্যন্ত সুচিন্তিত, সুলিখিত, সুস্পষ্ট বক্তব্য সংবলিত কর্মসূচি। এতে প্রস্তাব আকারে পাকিস্তানের সংবিধান রচনার ছয়টি মূল নীতি নির্দেশিত হয়েছে। বলা হয়েছে, পাকিস্তান হবে ‘ফেডারেশন ভিত্তিক রাষ্ট্রসঙ্ঘ এবং তার ভিত্তি হবে লাহোর প্রস্তাব।’ পার্লামেন্টারি ধরনের সরকার ব্যবস্থা, আইন পরিষদের সার্বভৌমত্ব, সর্বজনীন ভোটাধিকার ও নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন ইত্যাদির উল্লেখ আছে। কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা কেবল দেশরক্ষায় ও বিদেশনীতিতে সীমাবদ্ধ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। ‘সমগ্র দেশের জন্য দুটি পৃথক অথচ অবাধে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা’ চালু করার কথা বলা হয়েছে। যদি একটি মুদ্রা চালু রাখা হয় তাহলে সাংবিধানিক ব্যবস্থা দ্বারা পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে মূলধন পাচার বন্ধ রাখা হবে। পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ‘পৃথক ব্যাংকিং রিজার্ভ পত্তন’ এবং ‘পৃথক আর্থিক ও অর্থবিষয়ক নীতি’ প্রবর্তনের প্রস্তাব আছে। রাজস্ব, কর ও শুল্ক ক্ষেত্রে অঙ্গরাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌম ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করে বলা হয়েছে, অঙ্গরাষ্ট্রগুলো তাদের প্রাপ্ত সব রকম করের অংশ শতকরা একই হারে কেন্দ্রীয় সরকারের তহবিলে প্রদান করবে। বৈদেশিক বাণিজ্যে অঙ্গরাষ্ট্রগুলোর প্রাপ্য নিশ্চিত করার জন্য পাঁচটি সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থার প্রস্তাব আছে। অঙ্গরাষ্ট্রগুলোকে আধাসামরিক বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠন করার ও রক্ষা করার ক্ষমতা প্রদানের কথা বলা হয়েছে। ছয় দফায় সাংবিধানিক বিষয় ছাড়া আর কোনো বিষয়ই অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

শেখ মুজিবুর রহমানের নামে প্রচারিত ছয় দফা কর্মসূচি পুস্তিকায় শেখ মুজিবের আট/নয় লাইনের একটি বক্তব্য আছে, তাতে তিনি ‘শাসনতান্ত্রিক কাঠামো সম্পর্কে নতুনভাবে চিন্তা করে দেখা’র প্রয়োজনের কথা বলেছেন। আর রয়েছে ছয় দফার পটভূমি ও প্রয়োজন ব্যাখ্যা করে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদের দুই পৃষ্ঠার একটি ভূমিকা। এই ভূমিকায় ছয় দফা কর্মসূচিকে একাধিক বার ‘শেখ সাহেবের ছয় দফা কর্মসূচি’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। এতে একে একে ছয়টি দফা বিবৃত হয়েছে কোনো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছাড়া। পরে আওয়ামী লীগের নামে প্রকাশিত হয় আমাদের বাঁচার দাবি ছয় দফা কর্মসূচি। এতে অত্যন্ত চমৎকার একটি প্রস্তাবনা আছে, এবং প্রতিটি দফার শেষে সেই দফার সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা আছে। এই পুস্তিকাটি ঢাকায়, অন্যান্য শহরে, গ্রাম-গ্রামান্তরে- সর্বত্র শিক্ষিত লোকদের মধ্যে পুনঃ পুনঃ প্রচারিত হয়েছিল ১৯৬৬ সালের এপ্রিল, মে, জুনে এবং তার পরেও। ছয় দফা প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সারা দেশে সাড়া পড়ে যায়। এই কর্মসূচি প্রচার করে আওয়ামী লীগ রাতারাতি অভাবনীয় জনপ্রিয়তা লাভ করে। মানিক মিয়া ইত্তেফাকে একটি একটি দফা করে ছয় দিনে ছয়টি দফা ব্যাখ্যা করে উপসম্পাদকীয় লিখেছিলেন। তখন সরকার ইত্তেফাক বন্ধ করে দেয়। উনসত্তরের গণঅভুত্থানের আগে ইত্তেফাক আর প্রকাশিত হতে পারেনি। ছাত্রলীগের প্রসার দেখে মানিক মিয়া ইত্তেফাকে ‘এই যৌবনজলতরঙ্গ রুধিবে কে?’ শিরোনামে অত্যন্ত উদ্দীপক উপসম্পাদকীয় লিখেছিলেন। আওয়ামী লীগকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তখনকার ইত্তেফাকের ছিল অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

সরকার, সরকারি দল, বিরোধী দলসমূহ- কোনটিই ছয় দফা সম্পর্কে নীরব থাকতে পারেনি। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সরকার অবলম্বন করে নির্যাতনমূলক কঠোর দমননীতি। আর বিরোধী দলগুলো ছয় দফার প্রতি জনমনে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি করে চেষ্টা করে নিজ নিজ দলের প্রতি জনসাধারণকে আকৃষ্ট করতে । আওয়ামী লীগের নেতারা নিক্ষিপ্ত হন কারাগারে। তাঁদের বিরুদ্ধে দেওয়া হয় মামলার পর মামলা। ন্যাপ থেকে বলা হয়, ছয় দফা পূর্ব পাকিস্তানের উঠতি ধনিকদের স্বার্থে রচিত কর্মসূচি, এই আন্দোলন দ্বারা শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তের কোনো কল্যাণ হবে না। বলা হয়, আওয়ামী লীগের মতো উচ্ছৃঙ্খল একটি দল ক্ষমতায় গেলে সাধারণ মানুষের অবস্থা আরো খারাপ হবে। বলা হয়, ছয় দফায় সাম্রাজ্যবাদের হাত থেকে মুক্ত হওয়ার লক্ষ্যে কোনো বক্তব্য নেই। আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিবকে অভিহিত করা হয় মার্কিনঘেঁষা বলে। ন্যাপের অনুসারী শ্রমিক ফেডারেশন, কৃষক সমিতি ও ছাত্র ইউনিয়ন থেকেও তখন এসব কথা বলে আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিবের নেতৃত্বের সমালোচনা করা হয়। ন্যাপ থেকে তখন একটি চৌদ্দ দফা কর্মসূচি প্রচার করা হয়। সেটির প্রচার ছিল স্বল্প এবং সে বক্তব্যের আবেদনও ছিল সামান্য। ১৯৬৮ সালে ন্যাপ পিকিংপন্থি ও মস্কোপন্থি পরিচয় নিয়ে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। মস্কোপন্থি ন্যাপ ছয় দফাকে সমর্থন দিয়ে চলে। কমিউনিস্ট পার্টি তখন আত্মগোপনে থেকে কাজ করত। তাদের বক্তব্যও ন্যাপের বক্তব্যের মতোই ছিল। সরকার-বিরোধী মুসলিম লীগ (কাউন্সিল), নেজামে ইসলাম, জামায়াতে ইসলামী তখন পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের সমর্থনে স্লোগান দানে, প্রচারপত্র বিতরণে ও প্রচারকার্যে অতিউৎসাহী হয়ে ওঠে। আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিবের সমালোচনা করে তারা জনসাধারণকে বোঝাতে চেষ্টা করে যে, রাজনীতিতে কেবল তারাই সৎ ও জনকল্যাণে নিষ্ঠ। ইসলামের কথাও তারা জোরেশোরে বলতে থাকে। ‘জাগো জাগো- বাঙালি জাগো’, ‘তোমার নেতা আমার নেতা- শেখ মুজিব শেখ মুজিব’- আওয়ামী লীগের এসব স্লোগানের পাল্টা স্লোগান হিসেবে জামায়াত তখন সামনে আনে ‘পাকিস্তানের উৎস কী- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, ‘তোমার নেতা আমার নেতা- বিশ্বনবি মোস্তাফা’- এসব স্লোগান। ডানপন্থিরা পাকিস্তানকে রক্ষার প্রশ্নে দৃঢ় থেকে স্বায়ত্তশাসনের বক্তব্য প্রচার করত। মওলানা ভাসানী ও তাঁর অনুসারীরা সমাজতন্ত্রের কথা বলতেন। এর মোকাবেলায় ডানপন্থিরা, বিশেষ করে জামায়াত- ইসলামি সমাজতন্ত্রের কথা বলে আর্থ-সামাজিক-রাষ্ট্রিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের কথা বলত। তবে সবকিছুর মধ্যে তারা পাকিস্তান ও ইসলামকে রক্ষা করার কথা জোর দিয়ে বলত। ডানপন্থি কোনো দলের প্রতিই জনগণের সমর্থন ছিল না। ভাসানীও কখনো কখনো, বিশেষ করে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর, ইসলামি সমাজতন্ত্রের কথা বলেছেন।

ছয় দফা আন্দোলনের কালে মার্ক্সবাদী বিভিন্ন গ্র“পের মধ্যে এবং সমাজের আরো কোনো কোনো কেন্দ্রে পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করে স্বাধীন রাষ্ট্ররূপে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিক্ষিপ্ত বিচ্ছিন্ন নানা প্রবণতা ও প্রয়াস দেখা দেয়। ১৯৬৭ সালের শেষে আইয়ুব সরকার নৌবাহিনীতে চাকুরিরত কয়েকজন সামরিক ব্যক্তির ও দুইজন সিএসপি অফিসারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক ষড়যন্ত্রের মামলা দেয়। এতে এক নম্বর আসামি করা হয় লে. ক. মোয়াজ্জেম হোসেনকে। মাস দেড়েক পরে শেখ মুজিবুর রহমানকেও এই মামলায় আসামি করা হয়, এবং তাঁকেই করা হয় এক নম্বর আসামি! তখন মামলার নাম পরিবর্তন করে করা হয় স্টেইট ভার্সাস শেখ মুজিব অ্যান্ড আদার্স। বলা হয়, মামলার আসামিরা পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্র করেছিলেন। খবর প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সারা পূর্ব পাকিস্তানে মামলার বিরুদ্ধে প্রবল জনমত দেখা দেয়। জনগণ পাকিস্তান রক্ষার পক্ষে না থেকে শেখ মুজিব ও অন্য আসামিদের পক্ষে অবস্থান নেয়। জনগণ বিচ্ছিন্নতাবাদী ও স্বাধীনতাকামী হয়ে ওঠে। মামলা দিয়ে সরকার যা আশা করেছিল, বাস্তবে ঘটে ঠিক তার বিপরীতটি। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার রয়েছে অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ভূমিকা। এ সম্পর্কে লে. ক. মোয়াজ্জেম হোসেনের গুরুত্বপূর্ণ লেখা আছে। যেসব কারণে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান তীব্রতা লাভ করেছিল তার মধ্যে এই মামলার স্থান সর্বাগ্রে। এই মামলায় আসামি হওয়ার ফলেই শেখ মুজিব জনপ্রিয়তার সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি লাভ করেছিলেন। গণঅভ্যুত্থানের চাপে যখন এই মামলা নিঃশর্তে তুলে নেওয়া হয়, তখন তিনি মুক্ত হন। তখন রমনা রেসকোর্স ময়দানে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ তাঁকে গণসংবর্ধনা দেয় এবং ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেয়। সংবর্ধনাসভায় দেশবাসীর প্রতি তিনি ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’কে ‘ইসলামাবাদ ষড়যন্ত্র মামলা’ বলে অভিহিত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এই মামলা সম্পর্কে তাঁর আর কোনো উক্তি পাওয়া যায় না।

১৯৬৮ সালের ৬ ডিসেম্বর থেকে ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত সংঘটিত হয় উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান। গণঅভ্যুত্থানের সূচনা করেন মওলানা ভাসানী। মওলানার আহ্বানে মাসাবধি ঢাকার গভর্নমেন্ট হাউজ থেকে জেলা-মহকুমা-থানা পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অফিস ঘেরাও করে জনগণের পক্ষ থেকে দাবি-দাওয়া পেশ করা হয়। গণঅভ্যুত্থান শহর অতিক্রম করে গ্রাম-গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়ে । গণঅভ্যুত্থানে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব গ্রহণ করে ডাকসুসহ সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। তাদের কর্মসূচি ও কার্যক্রম পরিচালিত হতো ইকবাল হল (বর্তমান জহুরুল হক হল) থেকে। গণঅভ্যুত্থানে অন্তত চল্লিশ ব্যক্তি শহিদ হন। শহিদদের মধ্যে আসাদুজ্জামান, ড. শামসুদ্দোহা ও মতিউরের নাম সবচেয়ে স্মরণীয় হয়ে আছে। অভ্যুত্থানকালে বিভিন্ন জেলায় অন্তত দশ-বারোটি স্থানে গণআদালত গঠন করে মুসলিম লীগের বদমাতব্বর ও দুর্বৃত্তদের বিচার করা হয়। গণঅভ্যুত্থানের চাপেই আইয়ুব সরকার নিঃশর্তে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা তুলে নেয় এবং আসামিদের মুক্তি দেয়। তারপর প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের আহ্বানে ইসলমাবাদে সব রাজনৈতিক দলের নেতাদের গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। শেখ মুজিবুর রহমান গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দেন, মওলানা ভাসানী বৈঠক বর্জন করে দেশবাসীর প্রতি আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। ভাসানী সরকারি সহিংসতাকে জনগণের পাল্টা সহিংসতা দিয়ে মোকাবিলা করার ঘোষণা দিয়ে আসছিলেন। Time পত্রিকায় Cover Story-তে ভাসানীকে তখন Prophet of Violance বলে অভিহিত করা হয়েছিল। আরো আগে থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন চলছিল। সহিংসতা বেড়ে চলা এবং পাকিস্তানের ভেঙ্গে যাওয়ার সম্ভাবনা উল্লেখ করে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব সাড়ে দশ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ১৯৬৯ সালের ২৫মার্চ সন্ধ্যায় প্রধান সেনাপতি ইয়াহিয়া খানকে প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত করে ক্ষমতা ত্যাগ করেন। ইয়াহিয়া প্রেসিডেন্ট হয়েই সারা দেশে মার্শল ল জারি করেন।

রাজনৈতিক বাস্তবতার উত্তাপ ইয়াহিয়া অনুভব করেন এবং জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন-বিধিমালা হিসেবে ‘আইন কাঠামো আদেশ’ জারি করেন। জাতীয় সংসদে তিনি সংখ্যাসাম্যের বদলে জনসংখ্যানুপাতিক আসনের ব্যবস্থা করেন। তাতে পূর্ব পাকিস্তানের আসনসংখ্যা পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় ২৫টি বেশি হয়। আইন কাঠামো আদেশে নির্বাচিত জাতীয় সংসদের প্রথম কাজ নির্দেশিত ছিল ১২০দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতির নিকট পাকিস্তানের জন্য একটি সংবিধান সুপারিশ করা। তাতে সংবিধানের প্রকৃতি সম্পর্কে পাঁচটি সুস্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া ছিল যা ছিল আওয়ামী লীগের ছয় দফার বিরোধী। তা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ নির্বাচনে সম্মত হয়।

১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর দক্ষিণের সমগ্র উপকূল এলাকায় ঘটে যায় বিধ্বংসী সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাস। তাতে কমপক্ষে দশ লক্ষ লোকের প্রাণহানি ঘটে বলে প্রচারমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। ইয়াহিয়া সরকার দুর্গত লোকদের সাহায্যে কোনো দায়িত্ব পালন করেনি বলে মওলানা ভাসানী, আতাউর রহমান খান, শেখ মুজিবুর রহমান, মোজাফফর আহমদ ও অন্যান্য নেতা তীব্রতম ভাষায় নিন্দা করেন। ডানপন্থি নেতারাও তখন সরকারের বিরুদ্ধে নিন্দায় মুখর হন। মওলানা ভাসানী দুর্যোগকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে এসে ২৭ নভেম্বর পল্টন ময়দানে জনসভা করেন। তাতে তিনি লাখো লোকের সামনে দুর্গত এলাকায় মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু, সম্পদ ধ্বংস, পশু-পাখি, ফসলাদি ও গাছপালার দুর্গতি বর্ণনা করেন এবং সরকারের ঔদাসীন্যের জন্য সরকারের পদত্যাগ দাবি করেন। সভায় জনতাকে নিয়ে তিনি বার বার ‘পূর্ব পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ স্লোগান দেন, এবং লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী স্বাধীন সার্বভৌম পূর্ব পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য পূর্ব পাকিস্তানের সব নেতা, কর্মী ও জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।

৪ ডিসেম্বর পল্টনে অনুষ্ঠিত আরেক জনসভায় লাখো মানুষের সামনে মওলানা ভাসানী পূর্ব পাকিস্তানের ২৩ বছরের বঞ্চনার ইতিহাস তুলে ধরে উপকূলের দুর্গত লোকদের দুর্দশার প্রতি পাকিস্তান সরকারের নিষ্ক্রিয়তার বর্ণনা দেন। এসবের প্রতিকার হিসেবে তিনি নিজেদের স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য জনগণের প্রতি, শেখ মুজিব সহ পূর্ব পাকিস্তানের সকল নেতার প্রতি আহ্বান জানান। এই সভাতেও জনতাকে সঙ্গে নিয়ে মওলানা বার বার ‘পূর্ব পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ স্লোগান দেন। ভাসানীর উক্ত দুটি বক্তৃতার বিবরণই সব পত্রিকায় এবং বিবিসি রেডিওতে বড় করে প্রচার করা হয়। ভাসানীর প্রবল কণ্ঠে নিজেদের স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা শুনে কবি শামসুর রাহমান নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করে তখনই রচনা করেন তাঁর বিখ্যাত ‘সফেদ পাঞ্জাবি’ কবিতাটি। পরবর্তী সময়ে ভাসানী দেশের কয়েকটি শহরে বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সকল নেতার প্রতি, বিশেষ করে শেখ মুজিবের প্রতি আহ্বান জানান। শেখ মুজিব উপদ্রুত এলাকা পরিদর্শন করে এসে ২৬ নভেম্বর সংবাদ সম্মেলন করেন। তিনি সরকারের ঔদাসীন্যের ও অযোগ্যতার বিস্তারিত বিবরণ দেন এবং পূর্ব পাকিস্তানের ২৩ বছরের বঞ্চনার চিত্র তুলে ধরেন। দুর্গতদের সাহায্য দানের উপায় সম্পর্কেও তিনি কথা বলেন।

১২ নভেম্বরের প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে আওয়ামী লীগ ছাড়া সব দলই নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার দাবি তোলে। তখন শেখ মুজিব সাংবাদিক সম্মেলন করে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় নির্বাচন না পেছানোর, ঘোষিত তারিখেই নির্বাচন অনুষ্ঠানের যৌক্তিকতা ব্যখ্যা করেন এবং বলেন, ‘পশ্চিম পাকিস্তানি আমলা, পুঁজিপতি ও সামন্তবাদী স্বার্থের স্বেচ্ছাচারী শাসনের দুর্ভোগ থেকে মুক্তির জন্য ক্ষমতা জনগণকে জয় করতেই হবে। তার জন্য নির্বাচন অপরিহার্য।’ তিনি বলেন, ঘোষিত তারিখে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোনো বিকল্প নেই।
এর মধ্যে পূর্বঘোষিত তারিখ অনুযায়ীই ’৭০-এর ৭ ও ১৭ ডিসেম্বর যথাক্রমে জাতীয় পরিষদের ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হয়। আর সাইক্লোন উপদ্রুত এলকায় উভয় পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ’৭১-এর ১৭জানুয়ারি।

নির্বাচনের পর সংবিধান প্রণয়নের জন্য প্রেসিডেন্টের জাতীয় পরিষদ অধিবেশন ডাকার কথা ছিল। কিন্তু নির্বাচনের ফল দেখে প্রেসিডেন্ট বিচলিত হন এবং অধিবেশন ডাকতে দেরি করেন। তিনি অধিবেশনে বসার আগে রাজনৈতিক নেতাদের অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় বসে সমঝোতায় পৌঁছার অনুরোধ জানান।

জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে প্রধান দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে আওয়ামী লীগ ও পিপলস পার্টি। মোট ৩১৩টি আসনের মধ্যে ১৬৯টি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের আর ১৪৪টি পশ্চিম পাকিস্তানের। আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে ১৬৭টি, আর পিপলস পার্টি পশ্চিম পাকিস্তানে ৮৮টি আসন লাভ করে। আওয়ামী লীগ পশ্চিম পাকিস্তানে একটি আসনও পায়নি; পিপলস পার্টি পূর্ব পাকিস্তানে একটি আসনও পায়নি। নির্বাচনের ফল পাকিস্তানের দুই অংশকে আলাদা করে দেয়। আওয়ামী লীগের ১৬৭জন সদস্যের বিরুদ্ধে বাকি সকল সদস্য ঐক্যবদ্ধ হলেও তাঁদের সংখ্যা দাঁড়ায় মাত্র ১৪৬। সংখ্যাধিক হওয়ার জন্য দরকার হয় অন্তত ১৫৭ জন। জাতীয় পরিষদ সদস্যসংখ্যার দিক দিয়ে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। জাতীয় পরিষদে সংখ্যাসাম্যের বদলে জনসংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ফলে এই অবস্থা হয়েছে। ছয় দফার প্রশ্নে আওয়ামী লীগ ছিল আপসহীন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া, পিপলস পার্টির প্রধান ভুট্টো ও পাকিস্তানবাদী নেতারা মনে করেন, ছয় দফার ভিত্তিতে পাকিস্তানের সংবিধান রচিত হলে পাকিস্তান টিকবে না।

জাতীয় পরিষদ অধিবেশনের তারিখ ঘোষণা করে পরে তা স্থগিত করা হলে পূর্ব পাকিস্তানে দেখা দেয় সার্বিক জাতীয় অভ্যুত্থান। ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ ত্যাগ করে লোকে অবলম্বন করে ‘জয় বাংলা’। সংঘাতময় সেই বাস্তবতায় ৭ মার্চ রমনা রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু যে ভাষণ দেন, তার উপযোগিতা ও সৌন্দর্য বর্ণনা করে শেষ করা যায় না। যে আন্দোলন তিনি চালিয়ে আসছিলেন তার ধারাবাহিকতায় যেমনটি দরকার ছিল, ঠিক তেমনটিই তিনি বলেছেন। বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতার অন্তত এক ঘণ্টা আগে থেকে ৪/৫টি স্লোগানে মুখর ছিল লক্ষ লক্ষ লোকের সভার বিভিন্ন অংশ। সবচেয়ে উচ্চকিত স্লোগান ছিল মাঝে মাঝে মাইকে মঞ্চ থেকে উত্থিত- ‘আমার দেশ তোমার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ’, ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’। ১৯৯৬ সাল থেকে রাজনৈতিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মধ্যে একটি মহল প্রচার করে যে, বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের বক্তৃতা শেষ করেন ‘জয় বাংলা’ ‘জয় পাকিস্তান’ বলে। এ কথা ঠিক নয়। বঙ্গবন্ধু বক্তৃতা শেষ করেন কেবল ‘জয় বাংলা’ বলে, ‘জয় পাকিস্তান’ বলেননি। ‘জয় পাকিস্তান’ বলার মতো অবস্থা সভায় ছিল না। সেদিনের সভায় লক্ষ লক্ষ লোকের মধ্যে আমিও মঞ্চের কাছেই উপস্থিত ছিলাম।

’৭১-এর ১ মার্চ দুপুর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানে ইয়াহিয়া সরকারের কর্তৃত্ব লয় পেয়ে যাচ্ছিল। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের বক্তৃতার পর পূর্ব পাকিস্তান পরিচালিত হতে থাকে তাঁরই নির্দেশে। তাঁর নির্দেশে তখন অহিংস অসহযোগ আন্দোলন চলতে থাকে। কিন্তু সেনাবাহিনী আন্দোলন দমনের জন্য সহিংস কার্যক্রম চালাতে থাকে। আন্দোলনের জন্য জনগণের ও কর্মীদের উদ্দেশে প্রাত্যহিক নির্দেশাবলি রচনা ও প্রচার করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, বঙ্গবন্ধুর সার্বক্ষণিক সহকর্মী তাজউদ্দীন আহমদ। ৭ মার্চের বক্তৃতার পরেও পাকিস্তানকে রক্ষা করার সুযোগ ছিল। তখন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার উদ্যোগে শেখ মুজিব, ভুট্টো ও ইয়াহিয়ার মধ্যে সমঝোতার আলোচনা চলতে থাকে। ইয়াহিয়া পশ্চিম পাকিস্তানের আরো কোনো কোনো নেতার সঙ্গে পরামর্শ করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্তই কোনো সমঝোতা হয়নি।

ইয়াহিয়া সেনাপতিদের সঙ্গে পরামর্শ করে পাকিস্তানকে রক্ষা করার নতুন কর্মপদ্ধতি চিন্তা করেন। ঢাকা শহরে অপারেশন সার্চলাইট নামে সামরিক অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। তারপর ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় তিনি বিমানে ইসলামাবাদ রওনা হন। ওইদিন ঢাকায় রাত সাড়ে এগারোটায় আরম্ভ করা হয় অপারেশন সার্চলাইট। ইয়াহিয়া সন্ধ্যায় ইসলামাবাদ চলে যাবেন এবং তার পরেই ঢাকায় সর্বাত্মক সামরিক আক্রমণ চালানো হবে -এ কথা ওইদিন দুপুরের পরেই আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা জেনে গিয়েছিলেন। অন্যান্য দলের কোনো কোনো নেতাও তখনই এ সংবাদ পেয়েছিলেন। সামরিক আক্রমণের কথা শুনে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যাঁরা ছিলেন এবং পরে যাঁরা এসেছিলেন তাঁরা সকলেই বঙ্গবন্ধুকে আত্মরক্ষার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

ভবিষ্যৎ সংগ্রামের জন্য তাঁর প্রয়োজনের কথাও তাঁকে বলেছিলেন। তাঁকে সকলেই অনুরোধ করেছিলেন যাতে তিনি নিজের বাড়ি থেকে সরে থাকেন এবং শত্র“র হাতে ধরা না দেন। বঙ্গবন্ধু এসব অনুরোধে কান দেননি। তিনি সম্পূর্ণ একা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজ বাড়িতে থেকে বন্দিত্ব বরণ করেন। মাঝরাতে সৈন্যেরা তাঁকে তাঁর বাড়ি থেকে নিয়ে যায় এবং ইসলামাবাদে বন্দী রাখে। বঙ্গবন্ধু শান্তিপূর্ণ উপায়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানে বিশ্বাসী ছিলেন। তাজউদ্দীন সামরিক আক্রমণের খবর শুনে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামের কথা ভাবেন। স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামকে তিনি অপরিহার্য মনে করেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তিনি কথা বলেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। ফলে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সেদিন তাঁর বিচ্ছেদ ঘটে যায়। বঙ্গবন্ধু বন্দী থাকেন ইসলামাবাদে, তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দেয় ইয়াহিয়া সরকার, আইনি ধারায় সেই মামলার মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। আর তাজউদ্দীন ভারতে গিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার গঠন করে, ভারতের সাহায্য নিয়ে, মুক্তিবাহিনী গঠন করে, প্রশাসনব্যবস্থা গড়ে তুলে, শরণার্থীদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে, বিশ্বজনমত জয় করে, বাংলাদেশের জনগণকে নিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন এবং যুদ্ধে জয়লাভ করে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেন।

’৭১ সালে প্রবাসে শেখ মুজিবের অনুপস্থিতিতে এক Hobbesian state of nature-এ সরকার গঠন করা অত্যন্ত কঠিন কাজ ছিল। তাজউদ্দীন সেই কঠিন কাজ কীভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছিলেন, তা ভাবতে বিস্ময় লাগে। ছয় দফা আন্দোলনকালে অতি দ্রুত আওয়ামী লীগ জনপ্রিয় হয়েছিল। তখনই আওয়ামী লীগের ভেতর থেকে দলীয় স্বার্থে জনমনে শেখ মুজিবের উজ্জ্বল ভাবমূর্তি গড়ে তোলার চেষ্টা দেখা দিয়েছিল। পরে তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি প্রদানে ছাত্রলীগ তৎপর হয়। তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ করার পর আওয়ামী লীগে তাঁর ভাবমূর্তি গড়ে তোলার প্রচেষ্টা আরো জোরদার হয়। দলটির ভেতর গণতন্ত্রের অধ্যয়ন-অনুশীলন অল্পই ছিল, গণতান্ত্রিক শৃঙ্খলাও গড়ে তোলা হয়নি। দলের সংবিধানে যা-ই লেখা থাক, কার্যক্ষেত্রে দলটি গড়ে উঠেছিল একনায়কত্ববাদী দল রূপে। দলের নেতা-কর্মীরা মুজিবের হাতে সব ক্ষমতা তুলে দিয়ে তাঁর দ্বারা পরিচালিত হতেন। এজন্যই ‘একনেতা একদেশ, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ’ ইত্যাকার স্লোগান দেওয়া হতো। শেখ মুজিবের অনুপস্থিতিতে কলকাতায় বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যে তাজউদ্দীনের নেতৃত্বে শৃঙ্খলা কিছুটা গড়ে উঠেছিল। একনায়কতান্ত্রিক প্রবণতা তাজউদ্দীনের মধ্যে ছিল না।

প্রবাসে সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় তাজউদ্দীন ও তাঁর অনুসারীদের ধারাকে যদি মূলধারা গণ্য করা হয়, তাহলে তাঁর সামনে বাধা হিসেবে ছিল দুটি গ্র“প। এক গ্র“পে ছিলেন অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতাদের একাংশ এবং ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের একাংশ। এই গ্র“প অসহযোগ আন্দোলনের সময় থেকেই উপদল হিসেবে সংগঠিত হয়ে আসছিল। এর নেতৃত্বে ছিলেন ফজলুল হক মণি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমদ। এঁরা ভারত সরকারের সমর্থন নিয়ে তাজউদ্দীন সরকারের বাইরে মুজিব বাহিনী নামে সশস্ত্র বাহিনী গঠন করে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। এঁদের তৎপরতা স্বাধীনতাযুদ্ধকে কিছুটা হলেও বিভক্ত রাখে। এঁদের দাবি ছিল, শেখ মুজিব তাঁর অনুপস্থিতিতে কেবল এঁদের কাছেই নেতৃত্ব দিয়ে যান। এঁদের মধ্যে ফজলুল হক মণি প্রধানমন্ত্রী হতে আকাক্সক্ষী ছিলেন।

প্রথমে এঁরা সরকার গঠনে আপত্তি তোলেন এবং বলেন, War Council গঠন করে তার পরিচালনায় যুদ্ধ করে দেশকে হানাদারমুক্ত করার পর সরকার গঠনের বিষয় বিবেচনা করতে হবে, তার আগে নয়। তাজউদ্দীন সরকারের সঙ্গে এঁদের বিরোধ অমীমাংসিত থাকে। তবে সরকার গঠিত হয়ে যাওয়ার পর এঁরা সরকারকে স্বীকার করেই স্বতন্ত্রভাবে কাজ করেছেন। ভেতরে ভেতরে ফজলুল হক মণির সঙ্গে সিরাজুল আলম খানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। ১৯৭২ সালে ফজলুল হক মণি আওয়ামী যুবলীগ গঠন করেন, আর সিরাজুল আলম খান জাসদ গঠন করেন। অপর গ্র“পটি ছিল খন্দকার মোশতাক আহমদের। মোশতাক সরাসরি প্রধানমন্ত্রী হতে তৎপর ছিলেন। শুরুতে তিনি আগরতলায় একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ছিলেন। প্রথম থেকেই তিনি কলকাতায় থাকলে সরকার গঠনের জটিলতা আরো বাড়ত।

তাজউদ্দীনকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্বীকার করে নিলেও তিনি শেষ পর্যন্তই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য তাজউদ্দীনকে সরাতে তৎপর ছিলেন। তাজউদ্দীনের বিরুদ্ধে ভেতরে ভেতরে মণি ও মোশতাকের সমঝোতা ছিল। মুক্তিবাহিনীর প্রধান এম এ জি ওসমানী মোশতাকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তাজউদ্দীন ওসমানীকে যথেষ্ট আস্থায় নিতে পারতেন না। এজন্য সেনাপ্রধানের দায়িত্ব কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী নিজেই পালন করেছেন। মোশতাক ছিলেন সরকারের একেবারে ভেতরে- পররাষ্ট্রমন্ত্রী। পররাষ্ট্র সচিব মাহবুব আলম চাষী তাঁর সার্বক্ষণিক সহযোগী ছিলেন। সেপ্টেম্বরে মোশতাক মন্ত্রিপরিষদের সভায় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সমস্যার সমাধানের প্রস্তাব করলে প্রধানমন্ত্রী তাঁকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ থেকে এবং চাষীকে পররাষ্ট্র সচিবের পদ থেকে অপসারিত করেছিলেন। তখন তাঁদের পুলিশের নজরদারিতেও রাখা হয়েছিল। এজন্য মোশতাকের মনে প্রতিহিংসা দেখা দিয়েছিল। মণি মন্ত্রিপরিষদের বাইরে ছিলেন, তবে ভারত সরকারের সমর্থন নিয়ে মুজিব বাহিনী নিয়ে তিনি কাজ করেছেন। ভারত সরকারের এই দ্বিচারী ভূমিকা তাজউদ্দীন সরকারকে বিচলিত রেখেছিল।

শেষ পর্যন্ত সকল বাধা-বিপত্তিই সাফল্যের সঙ্গে অতিক্রম করেছে তাজউদ্দীনের নেতৃত্বে পরিচালিত সরকার। পাকিস্তানি বাহিনীর দখলে থাকা রাষ্ট্র, তার প্রথম সরকার, অভাব-অনটন, অসুবিধা, সমস্যা, সঙ্কট অন্তহীন, তার উপর যুদ্ধ- এই সবকিছু অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে অতিক্রম করেছে ওই সরকার। এর কৃতিত্ব প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের, মন্ত্রিপরিষদের, ’৭০-এ জাতীয় পরিষদে ও প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত সদস্যদের যাঁদের নিয়ে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় পরিষদ গঠিত হয়েছিল। এর কৃতিত্ব প্রগতিশীল লেখক-শিল্পীদের, এর কৃতিত্ব তখনকার প্রশাসনব্যবস্থার, মুক্তিবাহিনীর যে বাহিনী শেষ পর্যন্ত ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে মিলে সামরিক অভিযান চালিয়ে হানাদার বাহিনীকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করেছে। এই বিজয় ও স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত কৃতিত্ব বাংলাদেশের সাত কোটি মানুষের যাদের মধ্য থেকে স্বাধীনতা-সংগ্রামের সকল শক্তির আত্মপ্রকাশ। সমস্ত ত্র“টি, বিচ্যুতি, অপরাধ অধর্মের চেয়ে অনেক অনেক অনেক গুণ বড় রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা- নিজেদের রাষ্ট্র। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় লক্ষ লক্ষ নরনারী শহিদ হয়েছেন। যাঁদের ত্যাগে, শ্রমে, মেধাগুণে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, চিরকাল এদেশের মানুষ শ্রদ্ধাবনত চিত্তে তাঁদের স্মরণ করবে।

শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদের দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য ছিল। মুজিবের ব্যক্তিত্ব ছিল আকর্ষণীয়, প্রবল, কর্তৃত্ববাদী, সাহসী। তাজউদ্দীনের ব্যক্তিত্ব আপাতদৃষ্টিতে নমনীয়, কিন্তু মূল্যবোধ ও যুক্তিপরায়ণতার দিক দিয়ে অত্যন্ত দৃঢ় ও সাহসী। গণনেতা হিসেবে মুজিব অর্জন করেছিলেন অসাধারণ সম্মোহনশক্তি (cherisma)। একনায়কত্ববাদী কিংবা কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা তাজউদ্দীনের মধ্যে সামান্যই ছিল। তাজউদ্দীন সম্মোহনশক্তি অর্জনে প্রয়াসী ছিলেন না। তিনি বুঝতেন, যে-ঐতিহাসিক কালে তাঁর রাজনীতি, তাতে মুজিবের নেতৃত্বের অনুসারী হয়েই তাঁকে কাজ করতে হবে, এর অন্যথা দ্বারা কিছুই করা যাবে না। রাজনৈতিক জীবনে তাজউদ্দীন শেষ পর্যন্তই মুজিবের সবচেয়ে বিশ্বস্ত অনুসারী হিসেবে কাজ করেছেন।

অনেকে মনে করেছেন, তাজউদ্দীনের রাজনৈতিক জীবনের প্রধান দুর্বলতা শেখ মুজিবের উপর তাঁর নির্ভরশীলতা। তবে এতে একটি বড় ব্যতিক্রম মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি সব রকম নির্ভরশীলতা কাটিয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীন মনোবল নিয়ে, সহকর্মীদের নিয়ে কাজ করেছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়কে একটি ঐতিহাসিক সত্তা (historical entity) গণ্য করা সমীচীন। এই সময়ের মহানায়ক তাজউদ্দীন। তাজউদ্দীনের জায়গায় মোশতাক, কিংবা মণি, কিংবা অন্য কেউ প্রধানমন্ত্রী হলে কী ভালো হতো? War Council করে কী করা যেত?

১৯৭২ সালের ১০জানুয়ারি ঢাকা পৌঁছার পরেই বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতির পদ ছেড়ে প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করেন এবং নতুন মন্ত্রিপরিষদ গঠন করেন। গোটা ক্ষমতা-কাঠামেকেই তিনি বদলে দেন। তাজউদ্দীনকে করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী। খন্দকার মোশতাককে মন্ত্রিপরিষদে গ্রহণ না করার জন্য তাজউদ্দীন শেখ মুজিবকে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু শেখ মুজিব সে কথা রাখেননি, মোশতাককে তিনি করেন সেচ ও পানিসম্পদ মন্ত্রী। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশকে গড়ে তোলার জন্য বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সরকার কাজ আরম্ভ করে। এতে অন্তরায় হয় সরকারের ও সরকারি দলের লোকদের উদগ্র ক্ষমতালিপ্সা ও সম্পত্তিলিপ্সা।

পাকিস্তানকালের সেনাবাহিনীর একটি অংশের সঙ্গে মুক্তিবাহিনীকে যুক্ত করে গঠন করা হয় বাংলাদেশের সেনাবাহিনী। এতে সেনাবাহিনী সংহত হয়নি, দুই অংশের মধ্যে বিরোধ লেগে থাকে। মুক্তিযুদ্ধকালে মওলানা ভাসানীকে চেয়াম্যান করে তাজউদ্দীন সরকার যে উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেছিল, মুজিব সরকার তা রক্ষা করেনি। ওই পরিষদ দরকার হয়েছিল বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য রক্ষা করার এবং আওয়ামী লীগের ভেতরকার উপদলীয় বিরোধকে বাড়তে না দেওয়ার জন্য। ১৯৭২ সালে ওই পরিষদে আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ, আবুল মনসুর আহমদ, আতাউর রহমান খান, আবদুস সালাম খান, আবুল হাশিম প্রমুখকে সদস্য করে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য রক্ষার এবং সরকারকে রাজনৈতিক পরামর্শ দানের সংস্থা রূপে কার্যকর রাখা যেত। এই পরিষদই হতে পারত বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের অবলম্বন।

যুদ্ধোত্তর বাস্তবতায় বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের সমস্যা নিয়ে সরকার পক্ষ কোনো চিন্তাই করেনি। ন্যাপের অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ সরকারের প্রতি পুন পুন আহ্বান জানাচ্ছিলেন নতুন রাষ্ট্র গঠনের প্রয়োজনে সকল দলের প্রতিনিধি নিয়ে জাতীয় সরকার গঠনের। বঙ্গবন্ধু সে প্রস্তাবকে বিবেচনাযোগ্য মনে করেননি। মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা না থাকার ফলে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে অনেক বিষয় বোঝা কঠিন ছিল। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে সরকার ও আওয়ামী লীগ একদলীয় কর্মনীতি নিয়ে চলে। বঙ্গবন্ধু চাইলে ১৯৭২ সালে ছাত্রলীগের ভাঙ্গন রোধ করতে পারতেন এবং জাসদ গঠনের উদ্যোগ বন্ধ করতে পারতেন। তার জন্য মন্ত্রিপরিষদকে এবং আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠিত করতে হতো। সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের শৃঙ্খলার মধ্যে আনার এবং কর্মসংস্থানের দরকার ছিল। এ কাজ কঠিন ছিল, কিন্তু অসম্ভব ছিল না।

১৯৭৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে সরকার, সিপিবি ও ন্যাপের (মোজাফফর) মধ্যে সমঝোতা হয়। কিন্তু ততদিনে রাষ্ট্রব্যবস্থার সব অঙ্গে এবং সমাজের স্তরে স্তরে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা এতই বেড়ে গিয়েছিল যে, এই সমঝোতার দ্বারা কোনো সুফল অর্জন সম্ভব হয়নি। মওলানা ভাসানী ও পিকিংপন্থি মার্ক্সবাদী গ্র“পগুলোর সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি অল্পই অবলম্বন করা হয়েছিল। গোপন সশস্ত্র কর্মকাণ্ড দমন করার জন্য সরকারের দমননীতি ১৯৭৪-৭৫ সালে অত্যন্ত কঠোর করা হয়। রক্ষীবাহিনী প্রথম থেকেই সরকারি লোকদের ছাড়া অন্যদের দ্বারা নিন্দিত হতো।

তখনকার দ্বিকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে তাজউদ্দীন সরকার দৃঢ়তার সঙ্গে দিল্লি-মস্কো ধারা ধরে এগিয়েছিল। তাজউদ্দীন বিশ্বব্যাঙ্কের ঋণ গ্রহণের বেলায় বাংলাদেশের জন্য আত্মনির্ভরতার নীতি অবলম্বন করে চলতে চাইতেন। কিন্তু সরকার এত দৃঢ় নীতি চাইত না। পররাষ্ট্রনীতির বেলায় শেখ মুজিব যুক্তরাষ্ট্রের ধারায় এগোতে চাইতেন। ঙওঈ সম্মেলনে তাঁর যোগদানের পর পত্র-পত্রিকায় লেখা হয়, প্রধানমন্ত্রীর দুই নৌকায় পা দেওয়া বিপদের কারণ হবে। ১৯৭৪ সালে ঘটে যায় ভয়াবহ মন্বন্তর। তখন যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্র“ত খাদ্য বাংলাদেশের কাছে বিক্রি করেনি। বন্যা দ্বারা দেশে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হয়েছিল।

রাজনৈতিক জীবনে খন্দকার মোশতাকের সঙ্গে শেখ মুজিবের প্রতিদ্বন্দ্বিতা (rivalry) ছিল। কিন্তু ১৯৭২ সাল থেকে মোশতাক শেখ মুজিবের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে চলেন। যাঁরা ঘটনাপ্রবাহের ভেতরে ছিলেন তাঁদের কারো কারো মুখে শুনেছি, ১৯৭২ সালের শুরু থেকেই বঙ্গবন্ধু তাজউদ্দীনকে প্রতিদ্বন্দ্বী (rival) ভাবতে থাকেন। মনোবিশ্লেষণের (psychoanalysis) পদ্ধতিতে বিচার করলে অনেক রহস্য উন্মোচিত হবে।

পশ্চিমা শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোতে রাজনৈতিক নেতাদের মনোবিশ্লেষণের রেওয়াজ আছে। ১৯৭৪ সালের ২৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান অর্থ এবং বন, মৎস্য ও পশুপালন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রীর প্যাডে প্রদত্ত এক পত্রে লেখেন : “বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে আপনার মন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত থাকা সমীচীন নয় বলে আমি মনে করি। তাই আপনাকে আমি মন্ত্রী পদে ইস্তফা দেওয়ার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। এই সাথে আপনার স্বাক্ষরের জন্য পদত্যাগপত্র পাঠানো হ’ল।” এই পত্রের উত্তরে ওই দিনই তাজউদ্দীন এক পত্র মারফত প্রধানমন্ত্রীকে জানান : “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৮(১)(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আমি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মন্ত্রী পদ হইতে ইস্তফা দিলাম। আমার এই পদত্যাগপত্র মাননীয় রাষ্ট্রপতি সমীপে পেশ করিলে বাধিত হইব।”

মন্ত্রীপরিষদ থেকে তাজউদ্দীনের এই বহিষ্কার জনমনে শঙ্কা সৃষ্টি করে। বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করেছিলেন, আওয়ামী লীগের প্রতি, সরকারের প্রতি জনমত বিরূপ হয়ে পড়েছে। সমাজতন্ত্রের প্রতি জনগণের আগ্রহ দেখে তিনি ধারণা করেন, সমাজতন্ত্রের দিকে অগ্রসর হলে অবশ্যই তাঁর নেতৃত্বের প্রতি, সরকারের প্রতি, আওয়ামী লীগের প্রতি জনগণের মনোভাব পরিবর্তিত হবে। তিনি তখন জনগণের প্রতি দ্বিতীয় বিপ্লবের আহ্বান জানিয়ে বাকশাল প্রবর্তনে অগ্রসর হন, এবং ১৯৭৫ সালে ২৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধন দ্বারা বাকশাল প্রবর্তনের সূচনা করেন। বাকশাল প্রবর্তনের ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনে করল যে, শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সর্বাংশে মস্কোপন্থী হয়ে গেছে। বিশ্ববাস্তবতায় ও উপমহাদেশের বাস্তবতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তখন বঙ্গবন্ধুকে আর সহ্য করতে চায়নি।

সরকারের বিরুদ্ধে জনমত প্রবল দেখে মোশতাকের উচ্চাকাক্সক্ষা তখন প্রবল হয়ে ওঠে। খন্দকার মোশতাক আহমদ, তাহেরউদ্দিন ঠাকুর ও মাহবুব আলম চাষী তখন সরকার পরিবর্তনের ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠেন। ষড়যন্ত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ধন ছিল। এরই মধ্যে সংঘটিত হয় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে মোশতাক রাষ্ট্রপতি হন। তাঁর মন্ত্রিপরিষদে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিপরিষদের মন্ত্রীরা প্রায় সকলেই মন্ত্রী হন। রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর তিনি সৈয়দ নজরুল, তাজউদ্দীন, মনসুর আলী ও কামরুজ্জামানকে হত্যা করে ’৭১-এ সৃষ্ট প্রতিহিংসা চরিতার্থ করেন। এর ফলে তিনি আর ক্ষমতায় থাকতে পারেননি।

একটি কথা বাংলাদেশে গত দুই-তিন দশক ধরে খুব শোনা যায় : ইতিহাসের শিক্ষা এই যে, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা গ্রহণ করে না। অথচ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রজ্ঞাবান ভাবুক ও কর্মীরা বলে আসছেন, উন্নত ভবিষ্যৎ সৃষ্টির জন্য অপরিহার্য নানা কাজের সঙ্গে অতীতকে জানা এবং ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করাও অপরিহার্য।

———- [সমাপ্ত]————–


অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “তাজউদ্দীন আহমদ ও প্রথম বাংলাদেশ সরকারের ইতিহাস!

  1. ইতিহাসের এসব সত্য মুছে ফেলার
    ইতিহাসের এসব সত্য মুছে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। সত্য সব সময়ই জ্বলজ্বল করে। শেয়ার করার জন্য ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

88 − = 85