সাত মাইষা বুর্জোয়াদের কাছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাইলে যা হয়

এক
আওয়ামী লীগ পাঁচ বছরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে পারে নাই। আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় না আসলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে না, এই তত্ত্বটি তাদের গায়ের জোরে একদলীয় নির্বাচনে ক্ষমতা দখলের বৈধতায় ব্যবহার করা অন্যতম প্রধান তত্ত্ব। নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের নেতা, কর্মী ও সমর্থকরা তোতাপাখির মতো এই তত্ত্ব প্রচার করেছেন। যেহেতু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে না, সুতরাং যে কোন মূল্যে এবং যেকোনভাবেই আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে হবে, এখনো তারা এইধরণের তত্ত্বই প্রচার করছেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে এইখানে তারা জামায়াতে ইসলামের অভিযোগের সাথে একমত। এই আওয়ামী সমর্থকদের কথা অনুযায়ি, আওয়ামী লীগ ঘাড়ে ধরে ওয়ার ক্রাইম ট্রাইবুনালকে পরিচালনা করে। ঘাড় ছেড়ে দিলে বিচার বন্ধ হয়ে যাবে। জামাতিদের দাবিও এমনি, যে ট্রাইবুনালের ঘাড়ে আওয়ামী লীগের হাত আছে। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের নেতারা সম্প্রতি বেশ জোর গলাতেই দাবি করছেন যে, বাংলাদশের বিচার ব্যবস্থা স্বাধীন। দেলোয়ার হোসেইন সাইদীর আপিলের রায়ের সময়ে সরকারের হাত ট্রাইবুনাল অথবা বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার ঘাড়ে দূরে থাক, ধারে কাছেও নাকি ছিল না। সমালোচনাকারীরা বলছেন যে, আওয়ামী লীগের হাত আসলে ছিল জামাতের হাতে, তাই রায় এইরকম হয়েছে। শাহবাগে এই কথা বলার শাস্তি হিসাবে আওয়ামী লীগ ইতিমধ্যে পুলিশ বাহিনী দিয়ে সমালোচনাকারীদের পেটানোর ব্যবস্থা করেছে। তবে যারা শাহবাগে গিয়ে খালি সাইদীর ফাঁসির দাবি করেছে, কিন্তু সরকারের হাত কোথায় ছিল তা নিয়া কোন প্রশ্ন অথবা আন্দাজ করে নাই, তাদেরকে পুলিশ কিছু বলে নাই। সমালোচকরা বলতে পারেন, তাদের ঘাড়েও নিশ্চয় আওয়ামী লীগের হাত ছিল, তাই পুলিশ কিছু বলে নাই। আমি বলবো, তাদের ঘাড়ে আওয়ামী লীগের হাত নাই, বরং আওয়ামী লীগের ঠ্যাং তাদের হাতে ধরা আছে।

দুই
শাহবাগ আন্দোলনের শুরুতেই আন্দোলনকারীরা একটি বিপদে পরেছিলেন। বিপদটি হলো, তারা আন্দোলন শুরু করেছেন ট্রাইবুনালের একটি রায়ের বিরুদ্ধে। রায়ের আগেই বাতাসে আপোসের গন্ধ ছিল, জামাতে পুলিশে ফুল দেয়া নেয়া হচ্ছিল। আন্দোলনকারীরা এই আপোষ এবং এই রায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন। রায়ের বিরুদ্ধে জামাত আন্দোলন করছিল। রায়ের বিরুদ্ধে শাহবাগীরাও আন্দোলন করেছে। কিন্তু শাহবাগীদের বিপদ হলো, তারা তো জামাতের মতো ট্রাইবুনালের বিনাশ চায় না। তারা ট্রাইবুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন করবে, কিন্তু ট্রাইবুনালের বিরুদ্ধে করবে না, এই চিকন সুতার উপর দিয়ে তাদের হাটতে হলো। তারা আরো শক্ত সুতার উপর দিয়ে হাটতে পারতেন। তারা ট্রাইবুনলের ঘাড় থেকে আওয়ামী লীগের হাতের অপসারণ চাইতে পারতেন। তারা ন্যায় বিচারের পাশাপাশি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্যে আন্দোলন করতে পারতেন। কিন্তু যেহেতু শাহবাগে আওয়ামী লীগের ঠ্যাং ধরা অনেকেই ছিলেন, তাই ‘রাজনৈতিক হস্তক্ষেপহীণ ন্যায় বিচার’ দাবির আন্দোলনটি আওয়ামী লীগের নির্বাচনী রাজনীতির বলি হয়ে গেছে। পাশাপাশি তেরোর ফেব্রুয়ারিতে কাদের মোল্লার রায়ের সময় সরকারের হাত কোথায় ছিল এই প্রশ্নে যারা প্রতিবাদী হয়েছিলেন, কিন্তু সাইদীর রায়ের সময় সরকারের হাতের সন্ধান করে দেখার দরকার মনে করেন নাই, অথচ এখন আবার রায় পালটে যাওয়ায় সরকারের হাতের অনুসন্ধান করছেন তারা যদি নিজেদের রাজনৈতিক প্রাজ্ঞতা, দূর্বলতা ও দায়ভার নিয়ে একটু বেশি চিন্তা ভাবনা করে দেখেন তাহলে জাতির উপকার হবে। কেবল রায় মন মতো হইলে আনন্দ এবং তার ভিন্ন হইলে প্রতিবাদ করার জন্যে শাহবাগ আন্দোলন শুরু হয় নাই। শাহবাগ আন্দোলন শুরু হয়েছিল একটি ন্যায় বিচারের দাবিতে। কিন্তু বিচারের ঘাড়ে সরকারের হাত থাকলে তা আদায় করতে গেলে কি হয় আমরা ইতিমধ্যে দেখেছি। একজন যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি দিতে গিয়ে আওয়ামী লীগ আরেকবার ক্ষমতায় থাকার টিকেট আদায় করে নিয়েছে। সকল রাজাকারের প্রাপ্য শাস্তি নিশ্চিত করতে আওয়ামী লীগকে আর কয়টি মেয়াদে থাকতে দিতে হবে তা এখন পর্যন্ত ইলমে গায়েবের বিষয়।

তিন
সরকারী হস্তক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রনমুক্ত স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম ভিত্তি। বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। যদিও বাংলাদেশের শাসক শ্রেনীর রাজনৈতিক দলগুলি গণতন্ত্রের চর্চা করে না, তারপরেও বাংলাদেশকে আমরা অগণতান্ত্রিক বলতে পারবোনা। বাংলাদেশকে অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বললে রাজনৈতিক দলগুলির অগণতান্ত্রিক আচরণের বৈধতা তৈরি হয়ে যায়। বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে। বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে একনায়কত্ব এবং স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের পক্ষে দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের পথে হেটে এসে। কিন্তু গণতন্ত্রের সংগ্রামে যারা নেতৃত্ব দিয়েছে, বাংলাদেশের জন্যে যারা যুদ্ধ করেছেন তাদের হাতেই স্বাধীন বাংলাদেশে গণতন্ত্র নিহত হয়েছে। বাংলাদেশের শাসক রাজনৈতিক দলগুলি যতোই একে অপরের উপর দোষ চাপিয়ে নিজেদেরকে দুধের ধোয়া তুলসী পাতা দাবি করুক না কেনো, ইতিহাস সাক্ষ দেয় এবং ভবিষ্যতে আরো জোর গলায় দেবে যে, স্বাধীন বাংলাদেশে গণতন্ত্র নিহত হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের হাতে এবং তার দাফন কাজ সম্পন্ন করেছেন জিয়াউর রহমান। এও ইতিহাস যে এই দুইজনের পরিবারের নেতৃত্বে এবং এই দুইজনের রাজনৈতিক দলের হাতেই বাংলাদেশে গণতন্ত্রের পূনরুত্থান হয়েছে। বাংলাদেশের জন্মের এতো বছর পরেও আমরা এমন একটি জাতি গঠন করতে পারি নাই, যারা মধ্যযুগিয় সামন্ত মানসিকতা ত্যাগ করে ব্যক্তি ও পরিবারের আনুগত্বের রাজনীতির ঊর্ধে উঠে গণতন্ত্রের চর্চা করতে পারে। এই অবস্থায় আমরা কিভাবে ন্যায় বিচার দাবি করতে পারি? কার কছেই বা চাইতে পারি? বঙ্গবন্ধুর আমলে সিরাজ শিকদাররা বিনা বিচারে মরেছেন। জিয়ার আমলে বঙ্গবন্ধুর খুনিরা ইনডিমনিটি অধ্যাদেশে দায়মুক্তি পেয়েছেন। তারপর জিয়াও খুন হয়ে গেছেন। মুক্তিযুদ্ধ থেকে এখন পর্যন্ত সকল রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের বিচার আদায় করতে গেলে ঠগ বাছতে গাঁ উজার হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা আছে। খুঁজলে যেহেতু সবার হাতেই কম বেশি রক্তের দাগ পাওয়া যাবে, তাই বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার তিন যুগেও শেষ হয় না, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হতে লাগে চার যুগ, জিয়া হত্যার বিচার দাবি এতোদিনেও তার পরিবার ও দলের লোকের মুখে জোর গলায় শোনা যায় না।

চার
বাংলাদেশের শাসক শ্রেণীর চরিত্র ফ্রানৎস ফাঁনোর ‘জাতীয় বুর্জোয়া’ শ্রেণীর চরিত্র। জাতীয় বুর্জোয়া বললে ইউরোপিয় বুর্জোয়াদের সাথে তাদের মিলিয়ে ফেলার সম্ভাবনা আছে। তাই আমি লেখি অপরিণত বুর্জোয়া। এই শ্রেণীর কথা বার্তা আচার ব্যবহার পোষাক ইত্যাদি ইউরোপের জাতীয় বুর্জোয়াদের মতো হলেও এদের মন মানসিকতা এখনো সামন্ত যুগের। এরা মুখে গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের কথা বললেও মধ্যযুগের মতো বাপের পরিচয়ে রাজত্বের দাবিতে রাজনীতি করে, বিচার ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে নিজেদেরর ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও শ্রেণীগত স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হিসাবে । ইউরোপের বুর্জোয়াদের মতো সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় তাদের জন্ম হয় নাই। তাদের জন্ম হয়েছে ইউরোপের ঔপনিবেশিক শাসনের ছাচের মধ্যে। সমাজের ঐতিহাসিক প্রয়োজনে তাদের জন্ম হয় নাই, উপনিবেশের দাসত্ব খাটবার জন্যে তাদের জন্ম দেয়া হয়েছে। । গ্রাম বাঙলায় অপরিণত শিশুর জন্ম হইলে তারে বলা হয় সাত মাইষা। বাংলাদেশের শাসক শ্রেণীকে তাই সাত মাইষা বুর্জোয়া বলা যেতে পারে বলে পোস্ট কলোনিয়াল তাত্ত্বিক ফয়েজ আলম প্রস্তব করেছিলেন। আমি তার সাথে একমত। সাত মাইষা বুর্জোয়াদের কাছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাইলে কি হইতে পারে তা আমরা এখন হারে হারে টের পাচ্ছি।

পাঁচ
এখন বন্ধুগণ, আওয়ামী লীগের একক কর্তৃত্বময় সংসদে বিচারপতিদের অভিশংসন করার আইনও পাস হয়ে গেলো। একি সময়ে সাইদীর রায় নিয়ে আওয়ামী লীগ বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা শুনিয়ে যাচ্ছে। যাকে বলে, বিচারপতিদের ঘাড়ে ধরে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বানী শোনানো হচ্ছে। এখন, আপনে যদি খালি জামাতের হাতেই সরকারের হাত দেখেন, কিন্তু বিচারপতিদের ঘাড়ে তার হাত দেখতে ব্যর্থ হন, তাইলে ন্যায় বিচার আদায়ের আন্দোলনে আপনে জিততে পারবেন না। আপনাকে অবশ্যই নয় মাইষা বুর্জোয়া হইতে হবে। নাইলে হুদাই আওয়ামী লীগের হাতে ঘাড় ধাক্কা খাওয়ার কোন অর্থ নাই। তারচেয়ে তার ঠ্যাং ধরে থাকা ভালো।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “সাত মাইষা বুর্জোয়াদের কাছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাইলে যা হয়

  1. যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিষয়টাই
    যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিষয়টাই আগাগোড়া আওয়ামীলীগের প্রহসন। এই ইস্যু শেষ হয়ে গেলে আওয়ামীলীগের রাজনীতি করার মত কোন ইস্যু থাকবেনা। যেমন এখন বিএনপি’র রাজনৈতিক দৈন্যতা চলছে, আওয়ামীলীগও একই পথের পথিক হবে। তাই এই ইস্যু যতদিন বাঁচিয়ে রাখা যাবে, ততদিন আমাদেরকে ধোঁকা দিয়ে ক্ষমতায় আকড়ে থাকার ব্যবস্থা করছে আওয়ামীলীগ। তবে বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষকে এত বোকা ভাবাটা ভুল হবে।

  2. জামায়াতের আর কারো ফঁসি হওয়ার
    জামায়াতের আর কারো ফঁসি হওয়ার সুযোগ নাই। আওয়ামিলিগ ঐ পথে আর হাটছে না। চেতনার ব্যবসা বন্ধ করে নিজেদের বারোটা তারা না বাজানোর পথে হাটছে। কিন্তু সিদ্ধান্তটি যে কত বড় ভুল, সেটি টের যখন পারে তখন তাদের অবস্থা হবে মেনন আর ইনুর পার্টির মত।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

3 + 1 =