গ্রামীণের মুনাফা ও জাতির ভবিষ্যৎ ধ্বংস!

?oh=3cf58427292f1e206f1ea522f40fa518&oe=54CB823F&__gda__=1422766809_65bffec7577cd195937f755baffac1ec” width=”400″ />

সম্প্রতি দেশের শীর্ষ মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোন একটি অফার দিয়েছে। সেটি হচ্ছে ১৮ ঘন্টা ফেসবুক ব্রাউজিং ফ্রি! প্রতিষ্ঠানটি তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে এ বিষয়ক বিজ্ঞপ্তিতে লেখে- ‘এখন রাত ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত একদম ফ্রি ফেসবুক ব্যবহার করার সুযোগ দিচ্ছে গ্রামীণফোন!! মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনে অথবা যেকোনো মোবাইল ব্রাউজারে যান এবং আপনার সোশ্যাল নেটওয়ার্ককে আরো জমজমাট করুন। এসময়ে ফেসবুক মেসেঞ্জারও ফ্রি। এবার গ্রামীণফোন-এর মাধ্যমে আপনার বন্ধুদের সাথে ফেসবুকে কানেক্টেড থাকুন এবং আপনার অনুভূতি ও ফান ছড়িয়ে দিন বেশি বেশি! … ফেসবুক-এর বাইরে কোনো লিংক, ছবি, ভিডিও অথবা গেম্‌স-এর ক্ষেত্রে ডাটা চার্জ প্রযোজ্য হবে।’1

এই অফারটি নিয়ে কথা বলা গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি। ১৮ ঘন্টা ফেসবুক ব্রাউজিং ফ্রি করাটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ! এটির ব্যবহার শুরু হবে রাত ১২টা থেকে। সন্ধ্যা থেকে অন্যান্য কাজে ব্যস্ত সময় কাটানোর পর রাত ১২টা থেকে ফ্রি ফেসবুক ব্রাউজিং শুরু হলে বাধ্য হয়েই একজন ইউজারকে রাত জাগতে হবে। গ্রামীণফোন এর আগে একবার রাতজাগা একটি অফার দিয়েছিল- ডিজুস আমলে! প্রথম মিনিটের পর থেকে ফ্রি! সেটাও ছিল মধ্যরাতের অফার। আর এবারের অফার মধ্যরাত থেকে শুরু করে সন্ধ্যা পর্যন্ত। যদিও এর মূল ব্যবহারটা হবে মাঝরাতেই! কিছুটা হবে দিনের বেলায়! তারুণ্যের অনলাইন ব্রাউজিং টাইপ অ্যানালিসিস করলেই এটা বোঝা যায়। ফেসবুকে সর্বোচ্চ সংখ্যক লোক দেখা যায় সন্ধ্যার পর থেকে। মাঝরাতে যারা জেগে থাকেন, তারা অধিকাংশই তরুণ!

তো, এ নিয়ে আমার মাথাব্যথা কেন? কারণ, ইন্টারনেট থাকলেও আউটনেট বলে আসলে কোনো কিছু নেই। ফ্রি ফেসবুক ব্যবহারের ফলে আপনি ঢুকে যাচ্ছেন ইন্টারনেটের বর্ণিল জগতে! যা গ্রামীণফোনের লাভ করিয়ে দেবে *তারা মার্কা ডাটা চার্জের কল্যাণে! অন্যদিকে এর মাধ্যমে ধ্বংসের মুখে পড়বে আমাদের তারুণ্য! কিভাবে? বাংলাদেশের প্রখ্যাত চুলপড়া, এলার্জি, চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মোড়ল নজরুল ইসলাম সম্প্রতি এ বিষয়ে একটি ছোট্ট প্রবন্ধ লিখেছেন দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায়।

তিনি লিখেছেন, ‘প্রতিটি সুস্থ মানুষের জন্য রাতে অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘন্টা ঘুমের প্রয়োজন। অতি সম্প্রতি সুইডিস বিশেষজ্ঞগণ গবেষণায় দেখেছেন যদি কেউ মাত্র একরাত ঘুমাতে না পারেন তবে তার মস্তিষ্কে নিউরোডি-জেনারেটিভ প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায় অর্থাত্ মস্তিষ্কে কোষ ক্ষয় হতে শুরু করে। পাশাপাশি মস্তিষ্কের ক্ষতির ক্ষেত্রে দায়ী বায়োমার্কারের মাত্রা বা মলিকুলসের মাত্রা বাড়তে থাকে। জার্নাল অব স্লিপে তথ্যটি প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞগণ আরও বলেছেন, তারা গবেষণায় দেখেছেন, রাতে ঘুম না হলে পরের দিন সকালে ব্রেন ড্যামেজের বা মস্তিষ্ক ক্ষতির জন্য দায়ী মলিকুলসের পরিমাণ ২০ ভাগ বেড়ে যায়। তাই বিশেষজ্ঞগণ প্রতিদিন যথা সময়ে ঘুমানোর পরামর্শ দিয়েছেন।’ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মোড়ল নজরুল ইসলাম ওই বিশেষজ্ঞদলের উদ্ধৃতি দিয়ে আরো বলেছেন, হঠাৎ বা আকস্মিক একদিন বা দু’দিন ঘুম না হলে তা পুষিয়ে নেয়া সম্ভব। তবে তারা এটাও বলছেন, ঘুমের সমস্যা যাতে ক্রমাগতভাবে হতে না থাকে তা দেখতে হবে।2

তারুণ্য ধ্বংসের একটা চিত্র কি পেলেন? আরেকটা চিত্র দেই। এ বছরের গোড়ার দিকে, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ অধিকার ফোরাম আয়োজিত একটি সেমিনারে জন যায় ভয়ঙ্কর কিছু তথ্য। সেমিনারে বলা হয়, ‘শিশুরা এখন বিভিন্নভাবে জড়িয়ে পড়ছে পর্ণোগ্রাফির সঙ্গে। বেশিরভাগই শিশুই পর্ণোগ্রাফিতে আসক্ত হয়ে পড়ছে। অবাধ ইন্টারনেটের ব্যবহারের কারণে শিশুরা পর্ণোগ্রাফি তৈরি ও বিনিময়ে করছে বন্ধুদের সঙ্গে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন পরিচালিত ‘চাইল্ড পর্ণোগ্রাফি, অ্যান এক্সপ্লরেটরি স্টাডি অ্যাট ঢাকা’ শিরোনামে একটি গবেষণায় দেখা যায়, গবেষণা কাজে অংশ নেয়া ৭৭ ভাগ শিশুই পর্ণোগ্রাফি দেখে।’3 শিশু বলতে এখানে বোঝানো হচ্ছে ১৮ বছরের কম বয়ষ্কদের। এখন ছেলে-মেয়েরা ১৪ বছরে স্কুল পাশ দেয়। ১৬ তে পাশ করে কলেজ। ১৮তে তারা থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে।

তাহলে কারা এই শিশুরা? আমাদের ভবিষ্যত। কি করছে তারা? রাত জেগে ইন্টারনেট চালাচ্ছে। যার মূল অংশটা হচ্ছে ফেসবুক। টাইমস অব ইন্ডিয়ার বরাতেকিছুদিন আগে দৈনিক সমকাল একটি খবর ছেপেছে। তাতে বলা হয়েছে, ‘প্রিয়া ভেঙ্কটারমন নামে এক অভিভাবক জানান, তার টিনএজ সন্তানরা শুধু রাতে নয়, খাবার টেবিল, টিভি দেখার সময়-এমনকি ছুটিতে বেড়াতে যাওয়ার সময়ও ইন্টারনেটে ব্যস্ত থাকে।’ আরো বলা হয়েছে, ‘অনির্বাণ দ্বাদশ শ্রেণীতে পড়ে। থাকে নয়াদিল্লিতে। সে জানায়, তার অনেক বন্ধু ক্লাসে ঘুমায়। কারণ তারা রাত জেগে ফেসবুকে চ্যাট করে। তবে নিজে ক্লাসে ঘুমানোর কথা অস্বীকার করে অনির্বাণ।’4 ভারত এবং বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা প্রায় একই হওয়ার কথা!

সেদেশের একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মনোবির ভাটিয়া এ বিষয়ে বলেন, ‘তরুণ বয়সে রাতে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুমানো দরকার। কিন্তু ভারতে বিপুল সংখ্যক তরুণ-তরুণী রাতে মাত্র ২ থেকে ৩ ঘণ্টা ঘুমায়। যার ফলে তাদের স্মৃতিশক্তি লোপ পাচ্ছে, ওজন বেড়ে যাচ্ছে এবং মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’5 তাহলে? ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কে? ফেসবুকের রাতজাগা ফ্রি অফার কাকে ধ্বংস করবে? আমাদের তরুণদের। স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের। তারা ক্লাসে গিয়ে ঝিমুবে! ঘুমহীনতা তাদের মধ্যে জন দেবে অবসাদ! দিনে ঘুমুতে গিয়ে বাধ্য হয়েই তারা আরো কম সময় পাবে। আরো বাড়তে থাকবে রাত জাগা! আরো বেশি করে তারা ঝুঁকবে ইন্টারনেটের দিকে! লাভ-ক্ষতির খতিয়ানটা একটা ছক করে দেখিয়ে দেই-

?oh=c7f1d9b9db54dde242e99b54bc41e929&oe=54C62100″ width=”500″ />

অনেক নেতিবাচক দিক বললাম। এবার কিছু ইতিবাচক দিক বলি- ফেসবুক ফ্রি আছে বলেই রাত জেগে মেয়েদের সঙ্গে চ্যাট করতে পারে তরুণেরা। নইলে ইভ টিজিংয়ের ভয়ের মধ্যেই গাঁটের টাকা খরচ করে গিয়ে মেয়েদের স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাদের সঙ্গে খাতির জমাতে হতো। রাত জেগে চ্যাট করার কারণে তাদের ঘুম ভাঙে দুপুরে। এতে আর কিছু হোক বা না হোক, সকাল বেলার নাশতার টাকাটা বেঁচে যায়। ফেসবুক আছে বলেই কিছু পুরুষ সহজেই নারী সাজতে পারে এবং অন্য পুরুষদের ধোঁকা দিতে পারে। এভাবেই ফেসবুক তরুণদের রাস্তা দেখাচ্ছে। আর ফ্রি ফেসবুক তৈরী করে দিচ্ছে আসক্তি। আগে যে ছেলে/মেয়েটি ফেসবুক ইউজার ছিল, এখন ফ্রি ফেসবুকের বদৌলতে সে হবে ফেসবুক অ্যাডিক্ট! সারাদিন তাকে ওটা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হবে। ফলে ক্ষতিগ্রস্থ হবে তার স্বাভাবিক বিকাশ। অপরিণত বয়সজনিত কারণে তারা চাইলেও এ থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে না। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির স্বীকার হবে দেশ ও জাতি। সকলকে গ্রামীণফোনের এই ব্যবসাচাতুর্য্যের বিরুদ্ধে একজোট হওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।

তথ্যনির্দেশ :
1) http://www.grameenphone.com/bn/personal/offers/browse-facebook-free
2) http://archive.ittefaq.com.bd/index.php?ref=MjBfMDFfMDJfMTRfMV82XzFfOTgwNTk=
3) http://www.atntimes.com/archives/88869
4+5) http://www.samakal.net/2014/07/21/74140

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৭ thoughts on “গ্রামীণের মুনাফা ও জাতির ভবিষ্যৎ ধ্বংস!

  1. যুব সমাজ ধ্বংস হলেও এসব
    যুব সমাজ ধ্বংস হলেও এসব মাল্টিন্যাশনাল প্রতিষ্ঠানের কিছু যায় আসে না। এদের কাছে ব্যবসাটাই মুখ্য। কিন্তু প্রচার প্রচারণায় দেখা যায় এসব প্রতিষ্ঠানের দেশপ্রেম আপনার-আমার সবার চাইতে অনেক বেশি। গ্রামীণের এই প্যাকেজটির মাধ্যমে যুব সমাজ ধ্বংসের মুখোমুখি হবেই। বন্ধ করা হোক ইন্টারনেটের এই ফ্রি প্যাকেজ। ফ্রি না দিয়ে আমি গ্রামীণসহ সকল ইন্টারনেট সেবা প্রোভাইডারদের আহবান জানাবো আপনার ইন্টারনেটের দামটা একটু কমান। দাম কমালে আর সেবার মান উন্নয়ন করলে ইন্টারনেট ব্যবহারকারি এমনিতেই বাড়বে। যার সেবা যত বেশি ভাল হবে, তার গ্রাহক ততবেশি বাড়বে।

  2. মোবাইল ফোন কোম্পানী কর্তৃপক্ষ
    মোবাইল ফোন কোম্পানী কর্তৃপক্ষ বানিজ্য ছাড়া কিছুই বোঝে না। সামাজিক দায়বদ্ধতা বলে যে একটা কথা আছে সেটা তারা মনে রাখতে চায় না। শুধু মুনাফার কথাই চিন্তা করে। এবং তাদের টার্গেট সর্বদা দেশের যুব সমাজের দিকে তীর-ধনুকের মতো।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 2