আস্তিকতা, নাস্তিকতা ও সাম্প্রদায়িকতা প্রসঙ্গে

আস্তিক হওনের উপায়
প্রতিপক্ষকে নাস্তিক তকমা দিয়ে ঘায়েল করার রাজনীতি আমাদের ইতিহাসে হাজার বছরের। প্রাচীন ও মধ্যযুগে যারা বেদের ডিভাইনিটি স্বিকার করতেন না, তাদেরকে বেদের ডিভাইনিটিতে বিশ্বাসীরা গরপরতা নাস্তিক বলে আখ্যা দিতো। সেই সময়ে নাস্তিক বলতে ইশ্বরে অবিশ্বাসী বুঝানো হতো না। ব্রাহ্মন পন্ডিতরা তাই ইশ্বরের অস্তিত্বে অবিশ্বাসী হওয়া সত্ত্বেও সাংখ্য ধর্ম ও দর্শনের অনুসারিদেরকে আস্তিকদের তালিকায় রেখেছিল। অন্যদিকে বৌদ্ধ, জৈন ইত্যাদি মতাবলম্বিদেরকে নাস্তিক উপাধি দিয়েছিল, কারন তারা বেদের ডিভাইনিটিতে বিশ্বাস করেনা। ইসলামে নাস্তিক ধারণাটির পরিস্কার সংজ্ঞা নাই। ইসলাম ধর্মাবলম্বিরা বেশি ব্যবহার করেছে কাফির, মুশরিক এই জাতীয় শব্দ, যেগুলো দিয়ে ঠিক নাস্তিক বুঝায় না। বাংলদেশে সুলতানি আমলে দেখা যেতো উলামারা মাশায়েখদের, আবার মাশায়েখরা উলামাদের মুরতাদ আখ্যা দিচ্ছেন। নাস্তিক শব্দটি ব্যবহার করে শক্তিশালী রাজনীতি হয়েছে গত শতকে। বাংলাদেশের কমিউনিস্টরা যেসব রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার একটি হচ্ছে নাস্তিক তকমা। কমিউনিস্টরা নাস্তিক, এই প্রচারণা বাঙলার গ্রামে গঞ্জে কমিউনিস্ট রাজনীতির বিকাশ যথেষ্ট পরিমানে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। গ্রামপ্রধান বাঙলার শহরগুলোতেও এখনো সামন্তযুগের ছাপ লেগে আছে। ঔপনিবেশিক যুগে পুঁজিবাদী দুনিয়ায় প্রবেশ করলেও নিজের মাটিতে শিল্প বিপ্লব হয় নাই। সামন্ততান্ত্রিক মোহ অতিক্রম করে জনগণের প্রকৃত গণতন্ত্রের বিকাশ হয় নাই। ধর্ম ব্যবসায়ী পুরোহিতদের বিরুদ্ধে লড়াই করে কোন ধর্মনিরেপক্ষ বুর্জোয়া বিপ্লবও সংগঠিত হয় নাই। এমন সমাজে কমিউনিস্টরা উত্তর পুঁজিবাদী সাম্যবাদ কায়েম করতে চাইলেও পারবেন না, তাই পারেনও নাই। তবে বাংলাদেশে নাস্তিক শব্দ ব্যবহার করে সবচাইতে বড় রাজনীতিটা হয়েছে শাহবাগের তরুনদের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশে ‘তরুন প্রজন্ম’ নাম ধারণ করে যে জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণীর আত্মপ্রকাশ হলো তাদের লিবারাল, ধর্মনিরপেক্ষ এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতি প্রথম দফাতেই সামন্ততান্ত্রিক রাজনীতির প্রবল বাধার সম্মুখিন হয়েছে। সেই বাধায় ‘নাস্তিক’ শব্দের নেতীবাচক ব্যবহারই ছিল প্রধান অস্ত্র। লাশ এবং ধর্মের সামন্তবাদী রাজনীতি দিয়ে এই তরুনদের ক্ষতিগ্রস্ত ও দুর্বল করার চেষ্টা হয়েছে। নাস্তিক তকমা কমিউনিস্টদের মতো তাদের ঘাড়েও একটি বাড়তি ডিসকোর্সের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে।

আমরা দেখলাম যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে টিকতে গেলে আস্তিক হওয়াটা সুবিধাজনক। ফরহাদ মজহার তা আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন। এমনিতে আস্তিক হতে গেলে তো কাউকে মুসলমান হতে হবে না। যারা ইশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে তারাই এখন আস্তিক। যেমন, ইহুদিরাও আস্তিক। কিন্তু বাংলাদেশে আস্তিক হতে গিয়ে ইহুদী হওয়া যাবে না। এটা মনে রাখতে হবে। বেদের ডিভাইনিটি ঘোষনাকারী হিন্দু আস্তিক হওয়াও খুব নিরাপদ নয়। তবে মুসলমান হতেই হবে এমন কথা নাই। বাংলাদেশে আস্তিক হতে হলে আপনাকে শুধু মুসলমানদের ধর্মানুভুতি ও মহানবীর সম্মানের রক্ষক হয়ে উঠতে হবে। হজ্জ গমনও করা যাইতে পারে। এক্ষেত্রে আলহাজ্জ হাসানুল হক ইনু ও আলহাজ্জ রাশেদ খান মেনন থেকে শিক্ষা নেয়া যায়। তবে নাস্তিক তকমা ধুয়ে মুছে আস্তিকে পরিণত হওয়ার সবচাইতে ভালো উপায়টা আমাদেরকে দেখিয়ে দিয়েছে আধা সামন্ত এবং আধা বুর্জোয়া চরিত্রের আওয়ামী লীগ। তদের পথ অনুসরণ করতে চাইলে অবশ্য আপনাকে প্রথমে বাঙলার মসনদ দখল করতে হবে। আর মসনদ দখল হয়ে গেলে আল্লামা শফিকে ১৬০ কাঠা জমি উপহার দিতে হবে। তখন আর আপনাকে কেউ নাস্তিক বলতে আসবে না।
আস্তিকের উদাহরণঃ চাঁদাবাজ ও দূর্ণিতিবাজ লতিফ সিদ্দিকী। তার বিরুদ্ধে ইসলামিস্ট আস্তিকদের কোন আপত্তি নাই। তিনি বাংলাদেশে থাকতে পারবেন।

নাস্তিক হওনের উপায়
বাংলাদেশে একটা মানুষের নাস্তিক হয়ে ওঠার অভিজ্ঞতা সাধারণত মধুর কিছু হয় না। যখনি একজন কিশোর বা তরুন ইসলাম, ইশ্বর, ধর্ম ইত্যাদি বিষয়ে জিজ্ঞাসু হয়ে ওঠে, সংশয়বাদী প্রশ্ন করা শুরু করে, তখনি তাকে প্রথম যেই তকমাটা দেয়া হয়, তাহলো ‘নাস্তিক’। তাকে বলা হয়, তুই নাস্তিকের মতো প্রশ্ন করিস কেন? কিংবা, তুই তো নাস্তিক হয়ে গেছিস, দোজখে যাবি। যেই তরুন তরুনিরা বেহেশত দোজখের অস্তিত্ব বিষয়ে সন্দিহান তারে দোজখের ভয় দেখায়াতো লাভ নাই। এই প্রতিক্রিয়াগুলো একজন জিজ্ঞাসু তরুনকে তার ধর্মের মানুষদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী করে তোলে। যেই নাস্তিক শব্দটি দিয়ে তাকে নিন্দা করার চেষ্টা করা হয়, সেই নাস্তিক শব্দের মাঝেই সে নিজের পরিচয় খুঁজে পায়। ভাষার তৈড়ি মানুষের সমাজে বিভিন্ন শব্দের মাঝে নিজের পরিচয় খোঁজা মানুষের স্বভাব। তাই একটা পরিচয় ত্যাগ করার পরে তার আরেকটা পরিচয়ের দরকার হয়। পিতৃধর্মের পরিচয় ত্যাগ করার পরেও আরেকটা পরিচয় দরকার লাগে। অনেকের কাছেই সেই পরিচয়টি হয় ‘নাস্তিক’। নাস্তিক শব্দটি তখন আর তার কাছে নেতীবাচক মনে হয় না, বরং সে গর্বের সাথে ঘোষনা করে, ‘আমি নাস্তিক’। কেউ যদি নাস্তিক শব্দের মাঝে তার পরিচয় খুঁজে পায় তাতে আপত্তি করার কিছু নাই। আমি নিজে একটা বয়সে এই শব্দে নিজের পরিচয় খুঁজে নিয়েছিলাম। কিন্তু সমস্যা হলো, নাস্তিকতা মানে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বে অবিশ্বাস, এর চাইতে বেশি না। নাস্তিকতার একক কোন রাজনৈতিক অথবা ধর্মীয় মতাদর্শ নাই। কোন নাস্তিক তাই লিবারাল, কেউ কমিউনিস্ট, কেউ ক্যাপিটালিস্ট, কেউ আবার নিহিলিস্ট। তবে বর্তমান সময়ে সবচাইতে বেশি যাদের দেখা যায়, তাদেরকে সুন্নতি নাস্তিক বলা যেতে পারে। সুন্নতি মুসলমানরা যেমন নবীর সুন্নত পালন করাকে তাদের ধর্ম গণ্য করেন, তেমনি সুন্নতি নাস্তিকরা মনে করেন সেলিব্রেটি নাস্তিকরা যেসব কথা বলেন, যা কিছু লেখেন তেমন বলা অথবা লেখাই হচ্ছে নাস্তিকতা। কয়েক মাস আগে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। স্ট্যাটসটি প্রাশঙ্গিক হওয়ায় নিচে তুলে দিলাম –
১. ইহুদী জাতটাই খারাপ। হিটলার ভালো কাজ করেছে।
২. হিন্দু জাতটাই বেইমান। মালুদেরকে এদেশ থেকে বের করে দেয়াই উচিত।
৩. মুসলমান জাতটাই সন্ত্রাসী। এদের পাছায় কুরকুরায়, এদের মার খাওয়াই উচিত।
বাংলাদেশের কিছু প্রগতিশীল, নাস্তিক, মুক্তমনা হিসাবে দাবিকারী আছেন যারা ১ ও ২ নম্বর বক্তব্যকে চরম সাম্প্রদায়িক অথবা রেসিস্ট বক্তব্য মনে করলেও ৩ নম্বরটিকে মনে করেন না। বরং ৩ নম্বরের কাছাকাছি বক্তব্য তারা নিয়মিতই দিয়ে থাকেন। এদের একজনকে অনেক চেষ্টা করেও বুঝাতে পারিনাই স্পেসিফিকলি একটি জাতি, গোষ্ঠি বা সম্প্রদায়কে একটি বিশেষ স্টেরিওটাইপে ফেলে ঘৃনা ছড়ানো ও বিদ্বেষ উস্কে দেয়াই হলো সাম্প্রদায়িকতা। মুসলমানদের ঘৃনা করলে কিভাবে সাম্প্রদায়িকতা হয় তা সে বুঝতে পারে নাই। তার ধারনা যেহেতু সে নাস্তিক তাই সে সাম্প্রদায়িক হতে পারে না। তার ধারণা সাম্প্রদায়িক হওয়া কেবল আস্তিকের পক্ষেই সম্ভব। ধার্মিকরা অন্য সম্প্রদায়ের ধার্মিকদের ঘৃনা করলে তারা সাম্প্রদায়িক, কিন্তু নির্ধর্মী! হলে ঘৃনা ছড়িয়ে এবং গালিগালাজ করেও অসাম্প্রদায়িক থাকা যাবে এইরকম অযৌক্তিক, এলিটিস্ট এবং অবশ্যই সাম্প্রদায়িক ধ্যান ধারণা যারা পোষন করেন তারা হয়তো মানবজাতির চিন্তা জগতের গভীরে লুকানো কোন আদিম স্টুপিডিটির কারনে এমনটা করেন। অনেক ধার্মিকদের কাছে যেমন ধর্ম হতে পারে কিছু মুখস্ত আচার যেমন নামাজ, রোজা, হজ্জ ইত্যাদি। তেমনি এদের কাছে নাস্তিকতা হলো কিছু আচারের মতো, যেমন বিজ্ঞান, বাক স্বাধীনতা, হোমো সেক্সুয়ালিটি ইত্যাদির সমর্থন, মুসলমানের দোষ কির্তন ইত্যাদি ইত্যাদি.।

সম্প্রতি ‘সালাফি সেকুলারিজম’ বিষয়ে যে বিতর্ক হয়ে গেলো সেই বিতর্কে একজন সুন্নতি নাস্তিক এসে মন্তব্য করলেন, সহিহ ইসলাম বিষয়ে যদি আইসিসের দাবির বদলে আইসিস বিরোধীদের দাবি তারা মেনেই নিতেন, তাইলে তো তারা নাস্তিক হইতেন না। অর্থাৎ, কেবল ইশ্বরের অস্তিত্বে অবিশ্বাসই এই সুন্নতি নাস্তিকের কাছে নাস্তিকতা না, তিনি মনে করেন যে সহিহ ইসলাম বিষয়ে মুসলমানদের কোন একটি পক্ষের দাবি মানা অথবা না মানাও নাস্তিকতার অন্তর্ভুক্ত বিষয়। ‘নাস্তিকতা’র ভেতরে এইরকম নানান গুনাবলি ও ক্ষমতা যুক্ত করে নাস্তিকতাকে এরা একটা ধর্মের চেহারা দিচ্ছেন। মজার বিষয় হচ্ছে, এই নাস্তিকরা ভাবেন যে তারা নির্ধর্মী এবং সাম্প্রদায়িকতা শুধু ধার্মিকের পক্ষেই করা সম্ভব। এই দুইটা ভুল ধারণার মাঝে থাকার কারনে এরা নিয়মিত সাম্প্রদায়িক কথা বর্তা প্রচার করেও নিজেদেরকে অসাম্প্রদায়িক ভাবে। যেই ধরণের আচরণের জন্যে তারা আস্তিকদেরকে সাম্প্রদায়িক বলেন, সেই ধরণের আচরণ করেও তারা নাস্তিকতার ইনডিমিনিটি নিয়ে অসাম্প্রদায়িক থেকে যান বলে ভাবেন। ধর্ম, আস্তিকতা, নাস্তিকতা ইত্যাদি বিষয়ে দর্শনগত অগাথ জ্ঞান না থাকলে নাস্তিক হওয়া যাবে না তা ঠিক না। কিছুটা কমনসেন্স এবং যুক্তি ব্যবহারের ক্ষমতা থাকলেই নাস্তিক হওয়া যায়। সুন্নতি নাস্তিকতার আবির্ভাবে নাস্তিক হওয়া এখন আরো সহজ হয়ে গেছে।
নাস্তিকের উদাহরণঃ হজ্জ ও শেখ পরিবারের সমালোচনাকারী লতিফ সিদ্দিকী। তার বিরুদ্ধে নাস্তিকদের কোন আপত্তি নাই, অনেক নাস্তিকই তার পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন এই বলে যে তিনি শতভাগ ঠিক কথা বলেছেন (যদিও ঐতিহসিক তথ্য ভুল দিয়েছেন)। তার বিরুদ্ধে ইসলামিস্ট আস্তিকদের অনেক আপত্তি, তিনি বাংলদেশে থাকতে পারবেন না।

সাম্প্রদায়িকতা কি জিনিস?
উপরে উল্লেখিত স্ট্যাটাসে লিখেছিলাম “একটি জাতি, গোষ্ঠি বা সম্প্রদায়কে একটি বিশেষ স্টেরিওটাইপে ফেলে ঘৃনা ছড়ানো ও বিদ্বেষ উস্কে দেয়াই হলো সাম্প্রদায়িকতা”। এই স্টেরিওটাইপিং এবং ঘৃনার উৎস হলো মানুষের পরিচয় ভাবনা ও পরিচয় অনুসারে সম্প্রদায়বোধ। একজন সাম্প্রদায়িক ব্যক্তি সবকিছু বিচার করতে যান অপর ব্যক্তির সম্প্রদায়গত পরিচয় অনুসারে। তাই এরা সাধারণত তর্ক করতে গেলে আগে জিজ্ঞাস করে নেন কার সাথে তর্ক করছেন, সে কি তার নিজের সম্প্রদায়ের না কি ভিন্ন সম্প্রদায়ের। তার প্রধান মাথা ব্যাথা অপর ব্যক্তি কি লিখছেন বা বলছেন তা নয়, বরং তার সম্প্রদায়গত পরিচয়। একজন সাম্প্রদায়িক ব্যক্তির কাছে তার সম্প্রদায়ের বাইরের সবাই হলেন আন(other)। তার কাছে একমাত্র তার সম্প্রদায়ের মানুষই শ্রেষ্ঠ ও সভ্য, অন্যরা নিচ ও বর্বর। নিজের সম্প্রদায়ের মানুষের সাত খুন মাফ হলেও অপর সম্প্রদায়ের সব কিছুতেই তিনি দোষ খুঁজে বেড়ান। ইদানিং যেহেতু নাস্তিকরা নিজেদেরকে এলিট সম্প্রদায় ভাবতে শুরু করেছেন, তাই সাম্প্রদায়িকতাও তাদের মধ্যে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অবস্থায় কোন ব্যক্তি, যাকে নাস্তিকরা নিজেদের সম্প্রদায়ভুক্ত ভাবতেন, তিনি যদি তাদের সমালোচনা করা শুরু করেন, তাহলে তারা সমালোচনার বক্তব্যের চাইতে সমালোচনাকারির সম্প্রদায়গত পরিচয় নিয়া অধিক চিন্তিত হয়ে ওঠেন। তারা তখন ভাবতে থাকে, সমালোচনাকারী হয়তো সহিহ নাস্তিক নয়, অথবা সে আসলে নাস্তিক পরিচয়ে একজন ছদ্ম আস্তিক, কিংবা নেহাত একজন সুফিবাদী অথবা মডারেট মুসলমান।

ফারাবী একজন সাম্প্রদায়িক আস্তিক। আমার একটি লেখা পড়ে তার মনে হয়েছিল আমি নাস্তিক। তাই কতল করার ফতোয়া দিয়েছিল। পরে কোন কারনে সে আবার এসে ভুল স্বিকার করে মাফ চেয়েছে। কেনো চেয়েছে জানতাম না। সাম্প্রতিক বিতর্কের সময় সে আবারো ম্যাসেজ করে মাফ করে দেয়ার অনুরোধ করা শুরু করলো। তাকে সাফ জানিয়ে দিলাম ফেসবুকে জনসম্মখে স্ট্যাটাস দিয়ে এই ধরণের কাজের জন্যে ভুল স্বিকার না করে তারপর এসে কথা বলতে। ফারাবী পালটা প্রস্তাব দিলো যে আমার স্ট্যাটাসে সে নিয়মিত লাইক দেবে, যাতে মানুষ বুঝতে পারে আমি আসলে নাস্তিক নই। ফারাবী ভেবেছে আমি নাস্তিক নই, এখন তার স্ট্যাটাসের ফলে কেউ আমার মতো একজন আস্তিক ব্যক্তিকে খুন করুক এটা সে চাচ্ছে না। আমি নাস্তিক এই বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারলে তার ফতোয়া নিয়া কোন অনুশোচনা থাকতো না, কারন সে সাম্প্রদায়িক। আমার ধর্মিয় বিশ্বাস ও অবস্থান নিয়ে ফারাবী যেইরকম কনফিউশনে আছে, সেইরকম কনফিউশনে যেসব নাস্তিকরা আছেন, তারাও নিজেদের মন থেকে সাম্প্রদায়িকতা উৎখাত করতে পারে নাই। গত কয়দিনে আমার লেখার বক্তব্যের চাইতে আমি ইসলামিস্ট, না মডারেট মুসলমান, না এক্স নাস্তিক না কি সুফিবাদী এইসব বিষয়েই তাদের অধিকাংশ তকমা, প্রশ্ন ও গবেষনা সীমাবদ্ধ। তবে এক্স নাস্তিক হওয়া অথবা ছদ্ম নাস্তিকতার অভিযোগে তারা ফারাবীর মতো আমাকে কতলের ফতোয়া দেবেন না সেই ভরশা তাদের উপরে আছে। কিন্তু মুসলমানরা অসভ্য ও বর্বর এই প্রচারোণা চালিয়ে তারা যখন পৃথিবীর বিভিন্ন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে পশ্চিমা শক্তিগুলোর সামরিক হামলা ও ম্যাস কিলিংকেও জায়েজ করেন, তখন তাদেরকে নিয়া খুব বেশি আশাও করতে পারি না।

আস্তিক? না কি নাস্তিক?
বাঙলা ব্লগে লেখা শুরু করার পরপরই, আজ থেকে প্রায় পাঁচ বছর আগেই সামহোয়ারইনব্লগে একটি ধারাবাহিক লেখা লিখেছিলাম ‘কেনো আমি একজন আস্তিক নই, কেনো আমি একজন নাস্তিক নই’ এই শিরনামে। এছাড়াও বিভিন্ন লেখা ও মন্তব্যে নিজের অবস্থান প্রকাশ করেছি। আইডেন্টিটির পেছনে সবসময় লেগে ছিলাম। কিন্তু তাতে বিশেষ কোন লাভ হয় নাই। সামহোয়ারইনে ব্লগিং করার সময় তথাকথিত আস্তিকরা আমাকে নাস্তিক হিসাবেই ট্যাগ দিয়ে এসেছে। অন্যদিকে নাস্তিকরা আমাকে সুফিবাদী বলে প্রচার করেছে। কেউ কেউ ছুপা ইসলামিস্টও বলেছে। মাঝখানে কিছুদিন এন্টি ইন্ডিয়ান লেখালেখির দোষে কিছু ভারতিয় নাগরিক ‘নাস্তিক মুসলমান’ বলেও ট্যাগ দিয়েছে। ভারতের দালাল ট্যাগ এককালে অনেকেই দিয়েছে, আবার কেউ কেউ আমাকে উগ্র জাতীয়তাবাদীও মনে করেন। অথচ বিভিন্ন সময়ে বলেছি যে আমি কোন আইডিন্টিটির গোলাম নই বরং মানুষ হিসাবে আইডেন্টিটির মাওলা হইতে পারি। রাজনৈতিক কারনে, এবং যে গণমানুষের ইতিহাস ও সংগ্রামের মাঝে আমি নিজেকে শুধু খুঁজেই পাই না, বরং তা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে অপারগ সেই গণমানুষের স্বার্থে বিভিন্ন আইডেন্টিটির সাথে যুক্ত থাকতেও পারি। সেই হিসাবে আস্তিক অথবা নাস্তিক কোন গুরুত্বপূর্ণ আইডিন্টিটি নয়। আস্তিক অথবা নাস্তিক পরিচয় দিয়া কারো সভাব, চরিত্র, নৈতিকতা, রাজনৈতিক মতাদর্শ এসব কিছুই বুঝা যায় না। কেবলি ইশ্বরের অস্তিত্ব বিষয়ক বিশ্বাস অথবা অবিশ্বাসের সাথে যেই আইডেন্টিটি যুক্ত, সেই আইডেন্টিটিকে নিজের প্রধান পরিচয়ের মালা হিসাবে গলায় ঝুলানো গুরুত্বপূর্ণ মনে করি না।

গৌতম বুদ্ধকে সারাজীবন অনেকেই ইশ্বর আছেন কি নাই এই বিষয়ে প্রশ্ন করে গেছেন। তিনি একেকবার একেক উত্তর দিয়েছেন, কখনো আবার চুপ করে থেকেছেন। বুদ্ধ আস্তিক না নাস্তিক ছিলেন, তা নিয়া অনেকেই কনফিউশনে থেকেছেন। লালন হিন্দু ছিলেন, না মুসলমান, তা নিয়াও বিতর্ক কম হয় নাই। লালনের জন্ম নিয়া হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের ঐতিহাসিকরা ভিন্ন ভিন্ন ইতিহাস চর্চা করেছেন। লালনের জীবদ্দশাতেই তার জাত পরিচয় নিয়ে তিনি প্রশ্নের সম্মুখিন হতেন, এই কারনে তিনি গেয়েছেন ‘সব লোকে কয় লালন কি জাত, সংসারে’। সাম্প্রদায়িকরা লালনকে হিন্দু অথবা মুসলমান যাই ভাবুক না কেন, লালন নিজের পরিচয় নিয়া কখনোই কিছু বলেন নাই। আমি বুদ্ধ এবং লালনের এলাকা ও ঐতিহ্যের মানুষ। রিচার্ড ডকিংস কিংবা স্যাম হ্যারিসের এলাকা এবং ঐতিহ্যের মানুষ না। তাই আস্তিক, নাস্তিক এই জাতীয় জেনারালাইজড আইডেন্টিটির মাঝে নিজের পরিচয় খুঁজতে যাবার প্রশ্ন আসে না। তবে ইশ্বরের অস্তিত্ব আছে কি নাই কিংবা ইশ্বরের অস্তিত্ব বিষয়ে আমার মতামত কি তা নিয়া অবশ্যই আগ্রহীদের সাথে আলোচনা ও বিতর্কে আমার কোন আপত্তি নাই। কিন্তু এইসব প্রশ্ন আমার কোন লেখায় অপ্রাসঙ্গিকভাবে টেনে আনলে যাস্ট ইগনোর করবো, তাই অপ্রাসঙ্গিকভাবে টেনে না আনাই ভালো।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৬ thoughts on “আস্তিকতা, নাস্তিকতা ও সাম্প্রদায়িকতা প্রসঙ্গে

  1. পুরো পোস্টটাই ব্যক্তিগত
    পুরো পোস্টটাই ব্যক্তিগত অবস্থান নিয়ে। শেষটায় রহস্য করেছেন নিজের বিশ্বাস নিয়ে লালন বা বুদ্ধের অনুকরনে (আপনার ভাষ্য মতে)। রহস্যটা আমাদের সঙ্গে করে থাকলে এক কথা, কিন্তু নিজের সঙ্গে করে থাকলে শেষ বয়েসে তসবিই জপবেন আমার ধারনা। তা তসবি জপা বা বিশেষ কোন ধর্ম পালন করা দোষের বলছি না। তবে আপনি নাস্তিকদের এক হাত নিয়েছেন। এবং অনলাইনে যাদের আপনি নাস্তিক হিসেবে জানেন তারা কেউেই যে নাস্তিকতাটাই ধরতে পারেনি সেটা জানান দিয়েছেন। আপনার সাথে একমত যে নাস্তিকতা ঈশ্বর অবিশ্বাস করা ছাড়া আর কিছু ধারন করে না। কিন্তু অনলাইনে যাদের সকলে নাস্তিক হিসেবে জানে তারা নানা বিষয় নিয়েই লেখেন, এখন ইসলাম নিয়ে বেশি লেখার কারণ তো অজানা থাকার কথা নয়। তাছাড়া বাংলা ব্লগ, ফেইসবুক এসবের বয়েস কত? এই সময়কালের মধ্যে ভযংকরভাবে রাজনৈতিক ইসলাম মাথাচাড়া দিয়ে উঠে বিশ্ব জুড়ে। আমাদের এই বাংলাদেশেই মৗলবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে আশংকাজনকভাবে। নাস্তিকদের বড় একটা অংশ এই মৌলবাদের উৎসমূলকে চিহ্নিত করে দেখাতে চায় কোথায় এর সুতিকাগার। সবাই যখন গোড়া রেখে ডালপালা ছাটায় ব্যস্ত, তখন এই নাস্তিকরাই শিকড়টাকে দেখিয়ে বলছে, এই হচ্ছে শিকড়, এখান থেকে খাদ্য-পানি পেয়ে জঙ্গিবাদ বর্ধিত হচ্ছে। আপনাদের সাথে আমাদের মতবিরোধ এই জায়গাটাতেই। অহেতুক “সহি নাস্তিক”, “ভাল নাস্তিক” খুঁজে লাভ নেই- মূলটা হচ্ছে আমরা পরিস্কার বলছি ইসলামের মধ্যেই জঙ্গিবাদের রসদ লুকিয়ে আছে। আপনারা সেটা মানতে নারাজ। আপনারা সেই মডারেট মুসলিমদের মতই ত্যানা প্যাচাতে থাকছেন- এসব ব্যাখ্যার ভুল, রূপক, প্রেক্ষিত, সালাফিমালাফি ইত্যাদি বলে ইসলামকে অন্য দশটা ধর্মের মতই নির্বিষ প্রমাণ করতে চান। যদিও অন্য ধর্মে সহি- অসিহ বলতে কিছু নেই। জঙ্গিবাদ, মুরতাদ, কল্লা চাই, আইএস, তালেবান দেখা যায় না। আপনার দর্শন ভাবালুতা। এই ভাবালুতার জন্ম ধর্মের মত গোজামিল, হাস্যকর, মধ্যযুগীয় বিশ্বাসকে সম্পূর্ণ মেনে নিতে শিক্ষিত মন অপারগ, আবার পুরোপুরি ঈশ্বর কনস্পেটকে ফেলেও দিতে না পারা। লালন ফকিরের আমার নিজের ধারনা সেটাই হয়েছিল। কারণ তার অনেক গানই একটার সাথে অন্যটা স্ববিরোধী।

    কোন একটা সম্প্রদায়কে সন্ত্রাসী, খারাপ, নিকৃষ্ট বলা অসুস্থতা সন্দেহ নাই। তবে কোন একটা সম্প্রদায় যদি এইরকম সন্ত্রাসী, খারাপ, নিকৃষ্ঠ হওয়ার একটা ঝুঁকির মধ্যে সব সময় থাকে তাহলে তাদের চেতনাকে আঘাত করে জাগানোই শ্রেয় মনে করি। মুসলিমদের তাদের ধর্ম সম্পর্কে সম্মুক ধারনা দিয়ে আমরা চাই যাতে তারা নিভৃতে তাদের বিশ্বাসটাকে নিয়ে ভাবুক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বাস্তবতা, ভয়াবহতা ইউরোপে ইহুদী-খ্রিস্টান ধর্মের দাফনকাফন সম্পূর্ণ হয়ে যায়। মানুষ বুঝতে পারে ইহজগতের জীবনে একজন ঈশ্বরের কার্যকরতা কতটা অসাড়। আমাদের সেরকম কোন শিক্ষা হয়নি। আজকে অনলাইনের এই যুগে, ব্লগ-ফেইসবুকের কল্যাণ্যে সামান্য একটা প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে মাত্র। দুভাগ্য এই ছয়-সাত বছরের মাথাতেই ইসলামিস্টদের সাথে আরো একটি প্রতিপক্ষ আমাদের জন্য তৈরি হয়ে গেছে! লড়াইটা নিসন্দেহে কঠিন হয়ে গেলো আমাদের জন্য। আপনাদের মত মুক্তমনের, প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক মানুষ ইসলামের শিকেড়ে হাত দিয়ে যেতেই আপনারা ইসলামকে ডিফেন্স করতে এগিয়ে আসলেন। এমনকি জাতিভেদ প্রথার মত সহি অসহি নাস্তিক খুঁজতে বসে গেলেন…।

    1. সুষুপ্ত পাঠক,এই কমেন্ট টা
      সুষুপ্ত পাঠক,এই কমেন্ট টা শুধু আপনার জন্যে। আপনি অরণ্যে রোদন করছেন। পাহাড় থেকে নামার সময় মনে হয় আহা গড়িয়ে নামতে পারলে কতই না মজা। পারভেজ আলমের লেখা আমাকে এখন এই প্রবাদ টির কথা মনে করিয়ে দেয়। মুক্তি দেন পারভেজ কে, আপনাদের কমেন্ট এর হাত থেকে।পারভেজ আলমের এখন অনেক বড়ো দায়িত্ব, অনেক কিছু লিখতে হবে। কে সালাফী সেকুলার, কে হানাফি সেকুলার, কে ওয়াহাবী সেকুলার, কে আহমদিয়া সেকুলার ………… আরও যে সকল সেক্ট আছে, সব সেক্ট এরই তো সেকুলার আছে তাইনা? পারভেজ ছাড়া আর কেইবা আছে সেসব নিয়ে লেখার?

      প্লিজ, পারভেজ আলম কে সময় দিন। ইসলামী দুনিয়া এবং সেকুলার দুনিয়া উভয়েই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে পারভেজ আলমের লেখার জন্যে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

19 + = 27