খালি সাম্রাজ্যবাদের ঘাড়ে দোষ চাপায়া মুক্তি মিলবে কি? (দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব)

ইরাকে ২০০৩ সাল থেকে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের যে রাজনীতি যুক্তরাষ্ট্র শুরু করেছে, এবং কমিউনাল লাইন অনুসারে ইরাক দেশটাকে টুকরো করেছে, তা কোন নতুন রাজনীতি না। কলোনাইজেশনের একেবারে শুরু থেকেই সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো এই কাজ করে আসছে। তারা ভারতিয় উপমহাদেশে কমিউনাল লাইনে বাঙলাকে ভাগ করে রেখে গেছে, তাতে হিন্দু মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার যে অর্থনীতি ও সামাজিক চর্চা বিকাশ লাভ করেছিল তা আজ অবধি টিকে আছে। ফিলিস্তিনেও এই কাজ করা হয়েছে, ইহুদি ও মুসলিম কমিউনাল লাইন অনুসারে দুইটি রাষ্ট্র করার যে প্রক্রিয়া তারা শুরু করেছিল তার ফলাফল আমরা এখনো দেখতে পাচ্ছি। জিয়া হাসান এই বিষয়টিকে বলছেন কলোনাইজারদের ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ পলিসি। খুব দ্বিমত নাই, কিন্তু কিসের ডিভিশন আর কাদের ডিভিশন, সেই প্রশ্নেতো সবাই একমত হবে না। ইন্ডিয়ার মানুষ এইভাবে ইতিহাস চর্চা করতে পারে যে এক ইন্ডিয়াকে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা উস্কে দিয়ে ব্রিটিশরা ভাগ করেছে। বাংলাদেশের অনেকে তা মানবে না, বলবে যে এক ইন্ডিয়া বলে কোন কিছুর অস্তিত্বই ছিল না। একজন বাঙালি বলতে পারে, ধর্মের নামে বাঙালি এবং বাঙলাকে ভাগ করা হয়েছে। বাংলাদেশে এখনো কিছু ইসলামিস্ট আছেন যারা ভাবেন যে ‘জাতীয়তাবাদে’র নামে ইসলামী পাকিস্তানকে ভাগ করা হয়েছে। পাকিস্তানীরা বাংলদেশের জন্মকে হিন্দু ইন্ডিয়া এবং কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের ম্যানুফেকচার দাবি করতে পারে। ইরাক ভাগ করে তিন টুকরা করা হয়েছে, এই কথাটা কুর্দিরা হয়তো মানবেই না, তারা দীর্ঘদিন যাবৎ স্বাধীন কুর্দিস্তানের জন্যে আন্দোলন করছে। বর্তমানে কুর্দিরা যতোটুকু সার্বভৌমত্ব অর্জন করতে পেরেছে তাতে কিন্তু আমেরিকার সমর্থন খুবি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছে। এখন কুর্দিদের এই স্বাধীন রাষ্ট্রের আকাঙ্খাকে কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ডিভাইড এন্ড পলিসি প্রকল্পে’র অংশ বলে এড়িয়ে যাওয়া যাবে? জিয়া হাসান কি তা করবেন। জিয়া হাসান কে যতোদুর জানি, তিনি তা কখনোই করবেন না। কুর্দিদের জাতীয়তার আইডিন্টিটিকে যেমন এড়ানো যাবে না, তেমনি শিয়া এবং সুন্নিদের ধর্ম সম্প্রদায়গত আইডিন্টিটিকেও না। ২০০৩ সালের আগে ইরাকের সুন্নিদের মাঝে ‘সুন্নি’ আইডেন্টিটির বদলে ইরাকী জাতীয়তাবাদী আইডেন্টিটি প্রবল ছিল তা সত্য। কিন্তু তার মানে এই না যে সুন্নি আইডিন্টিটিটা মার্কিন হামলার পর হঠাত করে এসে হাজির হয়েছে। ইরাকের বাথিস্ট জাতীয়তাবাদীদের একাংশের আইসিসের সুপ্রিমেসি মেনে নেয়ার প্রেক্ষাপট উদাহরণ হিসাবে আলোচনা করা যায়। ইরাকে মার্কিন দখলদারিত্ব এবং শিয়া অধ্যুষিত সরকারের বিরুদ্ধে ২০০৩ সালের পর থেকে যেসব বিদ্রোহী সংগঠন যুদ্ধ চালিয়ে আসছে তার মধ্যে নখশবন্দি বাহিনী (JRTN) অন্যতম। নখশবন্দি বাহিনী ইরাকের নখশবন্দি সুফি তরিকার অনুসারিদের সংগঠন। এই সংগঠনের অনুসারীরা বাথিস্ট, তারা ইজ্জত ইব্রাহিম আল দউরিকে শায়েখ বলে মান্য করে। ইজ্জত ইব্রাহিম ছিলেন সাদ্দাম হোসেইনের ডান হাত। ইরাকের বিদ্রোহী সংগঠনগুলোর মধ্যে আইসিসের পরেই সবচাইতে শক্তিশালী এবং সংগঠিত হলো নখশবন্দি বাহিনী। জাতীয়তবাদী এবং সুফিপন্থী হওয়ায় সালাফি আইসিসের সাথে তাদের আইডোলোজিকাল ফারাক থাকলেও আইসিসের সাম্প্রতিক উত্থানে তাদের এক ধরণের সমর্থন আছে, বিশেষ করে বাগদাদের শিয়া অধ্যুষিত সরকারবিরোধী তৎপরতায় সহযোগিতার সম্পর্ক আছে বলে জানা যায়। আইসিসের উত্থানের পর থেকে ইরাকের আইসিস বিরোধী সুন্নিদের গোত্র ও সংগঠনগুলো যে একজোট হতে পারছে না তার অন্যতম প্রধান কারন নখশবন্দি বাহিনীর নিরবতা এবং মাঠ ছেড়ে দেয়া। কারন, শিয়া প্রশ্নে আইসিসের সাথে তাদের আইডিওলজিকাল ফারাকটা কম। নখশবন্দি বাহিনীর জাতীয়তাবাদী চেতনা এখানে শিয়া বিরোধী সাম্প্রদায়িক চেতনার কাছে মাথা ঝুকিয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে, নখশবন্দি সুফি তরিকা যদি দুনিয়ার আর দশটা সুফি তরিকার মতো হতো তাইলে তারা একি কাজ করতো কি না? নখশবন্দি সুফি তরিকা সুফি ইসলামের অন্যান্য যেকোন তরিকার চাইতে আলদা। আর সব সুফি তরিকার অনুসারিরা যেখানে নিজেদেরকে মুহাম্মদ এবং আলীর আধ্যাত্বিক উত্তরাধিকার বলে গন্য করে, নখশবন্দিরা সেখানে নিজেদেরকে মুহাম্মদ এবং আবু বকরের আধ্যাত্বিক উত্তরাধিকার বলে মনে করে (কিছু সাবসেক্ট বাদে যারা আলীকেই মানে)। নখশবন্দি সুফি তরিকা যেভাবে নিজেকে সুন্নি ইসলামের সাথে আইডেন্টিফাই করে তেমনটা অন্য কোন সুফি তরিকা করে না। এই তরিকার জন্মই হয়েছে সুফিবাদী ইসলামে প্রচ্ছন্ন শিয়া মতাদর্শকে খারিজ করে সুন্নি মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে। এই আইডিন্টিটি, আইডোলোজি এবং এর ঐতিহাসিক পরস্পরাকে কি এড়িয়ে যাওয়া যাবে? সাদ্দামের আমলে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকায় তাদের সেকুলার জাতীয়তবাদী মতাদর্শ ও পরিচয় প্রধান হয়ে উঠেছিল, যেহেতু তারা সংখ্যালঘু। কিন্ত পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এখন তাদের জাতীয়তাবাদী আইডেন্টিটি ও সংগ্রাম সাম্প্রদায়িক আইডেন্টিটি এবং সংগ্রামের কাছে মাথা নুইয়েছে। সুতরাং, ২০০৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমন আজকের পরিস্থিতির জন্যে দায়ি হলেও বর্তমান সাম্প্রদায়িক যুদ্ধের পেছনকার আইডিওলোজি এবং এর ঐতিহাসিক পরস্পরতা না বুঝে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটানো সম্ভব না। দুঃখজনকভাবে জিয়া হাসান তাই করতে চান। ইরাক ও সিরিয়ার বর্তমান পরিস্থিতির পেছনকার বহু বছরের ঐতিহাসিক পরস্পরতা এবং যুদ্ধরত বিভিন্ন আইডেন্টিটির পেছনকার আইডিওলোজিকে গুরুত্ব না দিয়ে শুধু সাম্রাজ্যবাদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে জিয়া হাসান যে ব্যাখ্যা হাজির করেছেন, সেই ব্যাখ্যা টেরোরিজমের ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ তত্ত্বের মতোই মিনিমালিস্ট এবং পক্ষপাতদুষ্ট।


ছবিঃ সাদ্দাম হোসেইনের সাথে নখশবন্দি বাহিনীর শায়েখ ‘ইজ্জত ইব্রাহিম আল দউরি’

বাংলাদেশের হিন্দুরা সংখ্যালঘু, তারা বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং সেকুলারিজমের প্রতি সমর্থন দেয় মানে এই না যে তাদের মধ্যে ধর্মীয় সম্প্রদায়গত আইডেন্টিটি অনুপস্থিত এবং এই আইডেন্টিটির ঐতিহাসিক পরস্পরতা তারা বহন করে না। বাংলাদেশে ব্রুট মেজোরিটি মুসলমানদের ইসলামী সাম্প্রদায়িকতা বৃদ্ধি পেলে হিন্দুদের ধর্ম সম্প্রদায়গত আইডেন্টিটি বোধও প্রবল হবে। তার মানে এই না যে তাদের মধ্যে এই সাম্প্রদায়িকতাবোধ এখন অনুপস্থিত। বাংলাদেশে যদি ভবিষ্যতে কখনো কোন হিন্দু ধর্মাবলম্বী প্রধানমন্ত্রী হয় এবং তার বিরুদ্ধে যদি ইসলামিস্টদের এক বা একাধিক গ্রুপ জিহাদ শুরু করে, তার মানে এই না যে হিন্দু প্রধানমন্ত্রী না মেনে নেয়ার মতো সাম্প্রদায়িক বোধ তখন নতুন করে জন্ম হবে, এই বোধ বাংলাদেশের বহু মুসলমানের মনে এখনি বর্তমান আছে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তা আত্মপ্রকাশ করবে মাত্র। সংখ্যালঘু ধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষের শাসন মেনে নিতে না পারার যে সাম্প্রদায়িক বোধ তা ইরাকে সক্রিয় ছিল, এখন সিরিয়াতে সক্রিয় আছে। এই বোধ যেহেতু সাম্প্রদায়িক তাই এর প্রকাশটাও সাম্প্রদায়িক, এবং এই সাম্প্রদায়িকতাকে বৈধতা দেয়ার মতো ধর্মীয় মতাদর্শও উপস্থিত আছে। মধ্যযুগীয় সাম্প্রদায়িক মনস্তত্ব এবং মতাদর্শ কাধে নিয়ে সাম্রাজ্যবাদের মোকাবেলা করা সম্ভব না। এড়িয়ে গিয়েও না। সাম্প্রদায়িকতাকে কাধে নেয়া, মোকাবেলা না করা অথবা এড়িয়ে যাওয়ার এই প্রবনতার কারনেই মুসলমানরা আজকে এই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। টেরোরিজম থেকে ইসলামের দায়মুক্তি চাওয়া এক জিনিস, আর টেরোরিজমের মতাদর্শ এবং মতাদর্শের পেছনকার ইতিহাকে স্বিকার এবং মোকাবেলা না করে কেবলি সাম্রাজ্যবাদের ঘাড়ে দায় চাপানো হলো আরেক জিনিস।

জিয়া হাসান ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে খারিজ করতে গিয়ে ইরাক-সিরিয়ার সাথে বাংলাদেশ-ভারতের একটা তুলনামূলক আলোচনা করেছেন তার “শিয়া সুন্নি বিরোধের মার্কিন ইতিহাস এবং আমরা যা জানিনা বা জানতেও জানিনা এবং জানতে হবে তাও জানিনা” নামক লেখায়। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট খারিজ করার জন্যে এটা খুবি দুর্বল একটি তুলনা এবং মোটাদাগে বাস্তবতা বিবর্জিত। আমি সরাসরি ওনার লেখা থেকে নিচে কিছু লাইন তুলে দিলাম-

আমাদের নিজের দেশের প্রেক্ষাপটে ভাবতে গিয়ে দেখলাম, ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দু মুসলমান দন্দের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আছে। একদম মডার্ন টাইম হিসেবে করলেও আমরা দেখি, পার্টিশনের পূর্বে উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দাঙ্গায় বেশ কয় এক হাজার হিন্দু মুসলমান একে অপরের হাতে খুন হয়। কলকাতায়, নোয়াখালীতে উল্লেখযোগ্য মাসাকার হইছে, উভয় সম্প্রদায়ের । এমনকি সাম্প্রতিক কালের বাবরি মসজিদের ঘটনায় ভারতে, প্রায় হাজার দুই এক মুসলমানকে হত্যা করা হয় এবং বাংলাদেশও অনেক হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ খুন হয় তার পরে পরেই।

কিন্তু এর মানে কি ভারতে, বা বাংলাদেশে হিন্দু মুসলমান একই সাথে শান্তি পূর্ণ ভাবে বাস করছেনা? এবং আমরা এও দেখছি, বিগত ভারতীয় নির্বাচনে, মুসলমানদের রক্তে রঞ্জিত , নরেন্দ্র সিং মোদীকে ৮% মুসলমান ভোট দিয়েছে।

রক্তপাতের ইতিহাস তো আমাদের এই অঞ্চলেও আছে,

তাইলে, আমাদের এই খানে পারলে, ইরাকে কেন পারবেনা ?

জিয়া হাসান শান্তিপূর্ণ ভাবে বসবাস করা বলতে ইরাক-সিরিয়ার মতো সাম্প্রদায়িক খুনাখুনি না করার কথা বলছেন। এইরকম খুনাখুনির ইতিহাস বাংলাদেশে থাকলেও এই মুহুর্তে খুনাখুনি হচ্ছে না। কিন্তু খুনাখুনি না হলেই কি শান্তিতে থাকা হয়? এইযে বাংলাদেশে বিগত কয়েক বছরে একের পর এক হিন্দু বসতি, মন্দির ইত্যাদি আক্রান্ত হলো, লুটপাটের শিকার হলো সেসব কি শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করার নিদর্শন হতে পারে? এর পেছনেও রাজনীতি আছে, কিন্তু ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাকে পুঁজি করেই সেই রাজনীতিটা হয়। জিয়া হাসান বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতার এই সাম্প্রতিক বাস্তবতাকে এড়িয়ে গিয়ে খুনাখুনির স্কেল অনুযায়ি যে শান্তি মাপছেন এবং বাংলাদেশ ও ইরকাকে প্রায় দুই মেরুতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন, আসল বাস্তবতাতো তা নয়। ইরাকের সাথে বাংলাদেশের তুলনা হতে পারে, তবে তা দুই মেরুতে দাঁড় করিয়ে নয়। কেনো নয়, তা গত কিছুদিনে বিভিন্ন লেখায় লিখেছি। এখন জিয়া হাসানের “এই খানে পারলে, ইরাকে কেন পারবেনা” এই প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্যে আবারো বলি। বাংলাদেশে ২০১৩ সালটা রক্তরঞ্জিতই ছিল। সেকুলার বনাম ইসলামিস্ট, মুসলমান বনাম হিন্দু, বাঙালি বনাম আদিবাসী নানাবিধ মেরুকরণে হামলা, লুটতরাজ, ধ্বংসযজ্ঞ কম হয় নাই, খুনাখুনিও খুব কম হয় নাই। বাংলাদেশটা যে ইরাক হয়ে যায় নাই এবং বাংলাদেশে যে শান্তি! জিয়া হাসান দেখতে পাচ্ছেন সেটা একনায়ক শেখ হাসিনার স্বৈরতন্ত্র এবং আওয়ামী লীগের একদলীয় ফ্যাসিস্ট শাসনের দামে অর্জিত। ইরাক সিরিয়াও একসময় বাংলাদেশের মতো পেরেছিল, যখন সাদ্দামের স্বৈরশাসন ছিল, যখন বাশার আল আসাদ পুরো সিরিয়া নিয়ন্ত্রন করতেন তখন। ইরাকের সাথে বাংলাদেশের তুলনা করলে বরং প্রশ্ন চলে আসে, বাংলাদেশও ইরাকের পথে হাটছে কি না। এই প্রশ্নটা করলে সাম্প্রদায়িকতার ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত, পেছনের মতাদর্শ ইত্যাদিকে বুঝা এবং মোকবেলা করার দরকারটা নিশ্চয় জিয়া হাসানও বুঝতে পারবেন।

পশ্চিমের আধুনিকরা যখন প্রাচ্যের সামন্তবাদী দেশগুলোর মাতবর হয়ে উঠলো তখন থেকেই এসব অঞ্চলের মানুষের জাতীয় আইডেন্টিটির বদলে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক আইডিন্টিটি অনুযায়ি বিভাজন এবং সাম্প্রদায়িকতার বোধ উস্কে দেয়ার বিভিন্ন ওরিয়েন্টলিস্ট প্রকল্প এবং রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করেছিল। ওরিয়েন্টালিস্ট প্রকল্পগুলো মূলত জ্ঞানতাত্ত্বিক তৎপরতা। প্রাচ্যের মানুষকে তারা যেভাবে ক্যাটাগোরাইজ করেছে সেভাবেই বর্তমান সময়কার সাম্প্রদায়িক বিভাজনগুলো তৈড়ি অথবা প্রবল হয়েছে। ধর্ম সম্প্রদায় ভেদে জনসংখ্যার পরিসংখ্যান একটা উদাহরণ হতে পারে। বাঙলায় এই জাতীয় পরিসংখ্যানের পর হিন্দু এবং মুসলমান আইডিন্টিটি যেভাবে কালেক্টিভ চেতনা লাভ করেছে তাই পরবর্তিতে সাম্প্রদায়িক ঘৃনা এবং দাঙ্গা উস্কে দিয়েছে। শিয়া এবং সুন্নিদের সংখ্যাতাত্বিক পরিসংখ্যানটাও যে মুসলিম দুনিয়ার বাস্তব চেহারা প্রকাশ করতে পারে না এই বিষয়ে ভবিষ্যতে লেখার ইচ্ছা রাখি। আমাদের এখনকার বাস্তবতা হলো, প্রাচ্যের মানুষরা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মাধ্যমে বিভিন্ন স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র গঠন করতে সক্ষম হলেও এসব রাষ্ট্রে ঔপনিবেশিক আমলে উস্কে দেয়া ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক বিভাজনগুলো এখনো সক্রিয় আছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট দেশগুলোতে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতির যে উত্থান ঘটেছে, তাতে বহু রাষ্ট্রের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়ে গেছে। কিছু রাষ্ট্রের অস্তিত্বই এখন হুমকির মুখে। আমাদের গ্লোবাল দুনিয়ায় সবকিছুই গ্লোবাল, ইসলামের নামে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিটাও তাই গ্লোবাল। ইরাকের টেরোরিজম তাই বাংলাদেশেরও সমস্যা। শুধু সাম্রাজ্যবাদের ঘাড়ে দায় চাপিয়ে তাই এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব না। বরং তাতে আরো গভিরে তলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈড়ি হয়। ইসলামি স্বর্ণযুগের শেষে, সেই ১৩ শতকে ক্রুসেডার ও মোঙ্গলদের আক্রমনের মুখে যে সাম্প্রদায়িক এবং রিভাইভালিস্ট আইডিওলোজি নিয়ে ইবনে তাইমিয়া হাজির হয়েছিলেন, সেই আইডিওলোজি দিয়ে যখন এই একবিংশ শতকেও সাম্রাজ্যবাদের মোকাবেলা করার চেষ্টা হয় তখন তাতে শোষিত জনগণের রক্ত ঝরে সবচাইতে বেশি। এতে সাম্রাজ্যবাদের টিকিটিও স্পর্শ করা যায় না, বরং তার মাতবরির বৈধতা বাড়িয়ে নিতে সুবিধা হয়। যে সাম্প্রদায়িক জঙ্গীবাদ আমাদের সমাজে মাথাচারা দিয়ে উঠতে পারছে, জাতীয়তাবাদী আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়ায় বারবার হুমকি তৈড়ি করে পাশ্চাত্যকে মাতবরি করার সুযোগ তৈড়ি করে দিচ্ছে সেই আইডিওলোজিকে মোকাবেলা না করে সাম্রাজ্যবাদকে কিভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব? সাম্রাজ্যবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতা যে একে অপরের টিকে থাকার বৈধতা দিয়ে জনগণের বিরুদ্ধে এক দেহে লীন হয়ে যাচ্ছে, তা এড়িয়ে গিয়ে কি এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটানো সম্ভব? এই যে আমরা এখনো সংখ্যালঘুর শাসন, ধর্মনিরপেক্ষ শাসন ইত্যাদিকে গ্রহণ করতে পারলাম না, মধ্যযুগে যেমন ছিলাম এখনো তেমনি আছি, মধ্যযুগের ফতোয়াবাজরা যে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইয়ে এখনো আইডিওলোজিকাল ফাদার হয়ে আছেন, এই পরিস্থিতির উন্নয়ন না ঘটিয়ে সাম্রাজ্যবাদকে কি মোকাবেলা করা সম্ভব? মধ্যযুগ দিয়ে আধুনিকতার সাথে যুদ্ধে জেতা যাবে? গত দুইশ বছরে কি জেতা গেছে?

জিয়া হাসানের যে কাজটিতে সবচাইতে বেশি হতাশ হয়েছি, তা হলো তিনি ‘আলাওয়িত’রা সহিহ মু সলমান নয় এই প্রচারটি পরোক্ষভাবে হলেও করেছেন। অথচ এটা কট্টর সুন্নি অথবা সালাফি জিহাদীদের কাজ, জিয়া হাসানের কাজ নয়। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে জিয়া হাসান নিজে একবারো আলাওয়িতরা সহিহ মুসলমান নয় এমন কোন ফতোয়া দেন নাই। কিন্তু কয়েকজন সুন্নি ধর্মীয় নেতা যে আলাওয়িতদের অমুসলিম বলে ফতোয়া দিয়েছেন এবং খ্রিষ্টান মিশনারিরা যে আলাওয়িতদের ধর্মাচারকে ইসলামের চাইতে খ্রিষ্টান ধর্মের কাছাকাছি বলেছেন তাও উল্লেখ করেছেন। সেইটুকু করলেও সমস্যা ছিল না। কিন্তু আলাওয়িতদের মদ খাওয়ায় নিষেধ নাই, তারা হিজাব ব্যবহার করে না, তাদের যৌনাচার নিয়া গুজব আছে এই ধরণের বহু তথ্য তিনি দিয়েছেন। সিরিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষন করতে গেলে এসব তথ্যের আবশ্যকতা কতোটুকু সেই প্রশ্নটা রাখছি? বিশেষ করে যেখানে জিয়া হাসান এই যুদ্ধের তাবৎ দায়ভার মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ঘাড়েই চাপাচ্ছেন, যেখানে সুন্নি কিংবা সালাফি জিহাদীদের আইডিওলোজির খোঁজ খবর তিনি আমাদের দিচ্ছেন না, সেখানে আলাওয়িতদের ঘরের খবর তিনি আমাদের কেনো দিচ্ছেন? যদিও তিনি ভুল পাঠ করতে মানা করেছেন, কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে জিয়া হাসান তার লেখা দুটিতে সুক্ষভাবে সুন্নিদের ভিক্টিমাইজ এবং আলাওয়িতদের ভিলেনাইজ করেছেন। আলাওয়িতদের ভিলেনাইজ করা হয়েছে এমন মনে হওয়ার একটা বড় কারণ হলো এন্টি কলোনিয়াল মুভমেন্টের ইতিহাসে তাদের ভুমিকাকে খাটো করা। জিয়া হাসান আলাওয়িতদেরকে মোটামুটি ফ্রেঞ্চ কলোনিয়ালিজমের সাহায্যকারী এবং সিরিয়ান জাতীয়তাবাদী মুভমেন্টের বিরোধী শক্তি হিসাবে চিত্রিত করেছেন। এটা হলো ইতিহাসের পক্ষপাতমূলক পাঠ। আলাওয়িতরা মোটেই ফ্রেঞ্চদের সহায়ক ছিল না, ফ্রেঞ্চ কলোনাইজেশনের বিরুদ্ধে তারা শক্ত লড়াই করেছে, লড়াই করেই নিজেদের অবস্থান সংহত করেছে। সিরিয়ার অন্যান্য জনগোষ্ঠির মতোই তারা উপনিবেশের বিরুদ্ধে কখনো বিদ্রোহ আবার কখনো সমঝোতা আবার কখনো সহায়তা করেছে। আলাওয়িতরা সিরিয়ার একটা নির্দিষ্ট অঞ্চলে বসবাস করে। এখন তারা যদি বৃহত সিরিয়ান জাতীয়তার বদলে নিজেদের অঞ্চলে নিজেদের জন্যে আলাদা রাষ্ট্র কায়েম করতে চায় তার জন্যে নিশ্চয় তাদেরকে সিরিয়ান স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে বেইমানীর অভিযোগ করা যায় না। ফ্রেঞ্চ ম্যান্ডেট থেকে স্বাধীন হয়ে তারা নিজেদের আলাদা রাষ্ট্র চেয়েছিল এটাতো দোষের কিছু না, বিশেষ করে যেখানে অন্য জাতিদের হাতে তারা অতীতে নির্যাতিত হয়েছে। আমরা যে বৃহত ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে অস্বিকার করার পথ ধরে বাংলাদেশ রাষ্ট্র কায়েম করেছি তারজন্যে তো আমাদেরকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের সাথে বেইমানী করার অভিযোগ করা যাবে না। কিংবা ভারতের সাহাজ্য নিয়ে পাকিস্তানের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া পাকিস্তানী জাতীয়তাবাদ অথবা ইসলামের সাথে বেইমানী করার উদাহরণ হতে পারে না। যদিও জিয়া হাসান ‘বেইমানি’ শব্দের কোন ব্যবহার করেন নাই, কিন্তু সূরটা ঐরকমই। আমার ভুল হলে আশা করি তিনি ধরিয়ে দেবেন। বাঙালিরা খাটি মুসলমান নয়, বাঙালি মুসলমানদের ধর্মাচরণ হিন্দুদের মতো, এই প্রচারটা পাকিস্তানীরা করেছে একাত্তরে। এটা খুবি দুঃখজনক যে আলাওয়িতরা ‘ঐতিহাসিকভাবে’ সহিহ মুসলমান বলে স্বিকৃত নয়, তাদের ধর্মাচরণ অদ্ভুত এবং তাদের ধর্ম খ্রিষ্টানদের মতো এসব বক্তব্য জিয়া হাসান হাজির করেছেন। অবশ্য শিয়া ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা এবং সুন্নি সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি আলাওয়িতদেরকে মুসলমান হিসাবে স্বিকৃতি দিয়ে ফতোয়া দিয়েছেন সেটাও তিনি উল্লেখ করেছেন।

ছবিঃ ফ্রেঞ্চ উপনিবেশের বিরুদ্ধে আলাওয়িত বিদ্রোহের নেতা ‘সালেহ আল আলী’

সহিহ ইসলাম সম্পর্কে ফতোয়াবাজীর আলোচনা দিয়েই শেষ করি। আলাওয়িতদের বিরুদ্ধে যে দুইজন ফতোয়বাজের নাম জিয়া হাসান উল্লেখ করেছেন আমি তাদের সম্বন্ধে জানি না। তবে ইবনে তাইমিয়াযে নুসাইরি নাম ধরে আলাওয়িতদের বিরুদ্ধে ফতোয়া দিয়েছিলেন তা জানা আছে। এও জানি যে তিনি ড্রুজদের বিরুদ্ধেও ফতোয়া দিয়েছিলেন। ফতোয়া দিয়েছিলেন শিয়াদের বিরুদ্ধে, মোঙ্গল মুসলমানদের বিরুদ্ধে। ইবনে তাইমিয়ার মতো ফতোয়াবাজদের ফতোয়া গন্য করতে গেলে ‘জিয়া হাসান’ নিজেই মুসলমান থাকতে পারবেন কি না সেই প্রশ্নটি তাকে ভেবে দেখার অনুরোধ রাখছি। ইসলামের নামে মনোলিথ দাঁড় করিয়ে, ইসলামের পক্ষে অথবা ইসলামকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে যারা লড়াই করছেন, জিয়া হাসান তাদের কারো পক্ষের না বলেই বিশ্বাস করি। ডাইভার্সিটির পক্ষে না দাঁড়িয়ে ইসলাম নামক কোন মনোলিথের পক্ষে অথবা বিপক্ষে নেমে লড়াই করলে সেটা ধর্মযুদ্ধই থেকে যাবে, জ্বালানীসহ অন্যান্য বৈষয়িক স্বার্থের রাজনৈতিক যুদ্ধে পরিণত করা যাবে না। জিয়া হাসান কিন্তু এই ধর্মযুদ্ধের মুখোশ খুলে এর পেছনকার বৈষয়িক চেহারাটাই উন্মোচন করতে চান। আশা করি তিনি নিজের ভুলগুলা ধরতে পারবেন, অথবা আমারগুলা ধরিয়ে দিবেন। আবার একসাথে এই দুইটাই করতে পারেন।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “খালি সাম্রাজ্যবাদের ঘাড়ে দোষ চাপায়া মুক্তি মিলবে কি? (দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব)

  1. অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জিয়া
    অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জিয়া হাসান ভাইয়ের কাছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখেছেন। আশা রাখি তিনি সে গুলোর উত্তর দিবেন।

    আপনাদের আলোচনায় জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হব আমরা।

  2. অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জিয়া
    অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জিয়া হাসান ভাইয়ের কাছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখেছেন। আশা রাখি তিনি সে গুলোর উত্তর দিবেন।

    আপনাদের আলোচনায় জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হব আমরা।

  3. ভাল লিখেছেন। রাজনীতি ও ইতিহাস
    ভাল লিখেছেন। রাজনীতি ও ইতিহাস নিয়ে আপনার সিরিজগুলো যথেষ্ঠ আগ্রহ নিয়েই পড়ছি। আপনার এসব লেখার বিরুদ্ধে জোরালো কোন কাউন্টার পোস্ট না আসায় আপনার তথ্যগুলোকেই এখন পর্যন্ত বাস্তবতার আলোকে সত্য বলে ধরে নিচ্ছি। আপনার কি-বোর্ড যুদ্ধ অব্যাহত থাকুক।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

31 − 26 =