মুতাজিলা থেকে মডার্নিটিঃ মুসলমানের আক্কেল ও বেয়াক্কেলের ইসলাম প্রসঙ্গে

চতুর্থ খলিফা আলীর মৃত্যুতে খলিফায়ে রাশিদিনদের যুগের সমাপ্তি এবং মুয়াবিয়ার খেলাফতের মাধ্যমে উমাইয়া রাজবংশের খেলাফতের সুচনা হয়েছিল। রাজনৈতিক ক্ষমতা সংহত করার জন্যে উমাইয়ারা তাদের শত্রুদের শক্ত হাতে দমন করেছে। উমাইয়া খেলাফতের সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল আলী ও ফাতিমার বংশধর তথা খোদ মহানবীর বংশধররা। এই পরিবারের নেতাদেরকে সামনে রেখেই নির্যাতিত ও বঞ্চিতরা বিভিন্ন সময়ে বিদ্রোহ করেছে, কারবালা থেকে যার শুরু। প্রতিটি বিদ্রোহই শক্ত হাতে দমন করা হয়েছে। উমাইয়া খেলাফতের প্রায় একশ বছর সময়কালে মুহাম্মদের বংশধর ইমামদের আস্বাভাবিক মৃত্যুই ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। এর বাইরেও উমাইয়াদের বহু শত্রু ছিল। এন্টি কুরাইশ এবং অনারব মুসলমানদের কাছেও তারা অজনপ্রিয় ছিল। সব বিদ্রোহ এবং সকল সমালোচনাকেই তারা নির্দয়ভাবে দমন করেছে। ক্ষমতার কেন্দ্র সিরিয়ার বাইরে মুসলমানদের একটা বড় অংশের কাছেই তারা অজনপ্রিয় এবং তাদের শাসনের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। এই অবস্থা মোকাবেলায় উমাইয়ারা তাদের শাসন ও কৃতকর্মের বৈধতা ইসলাম থেকে আদায় করার কিছু রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বন করেছিল। আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ আবুল ফজল আল কোয়াসির মতে, উমাইয়ারা এইক্ষেত্রে তিনটি প্রধান রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করেছিল। এরমধ্যে এক নাম্বার হলো জাবারিয়া ধর্মতাত্ত্বিকদের পূর্বনির্ধারিত ও অলঙ্ঘনিয় ভাগ্য তত্ত্বের পক্ষ নেয়া। পূর্বনির্ধারিত ভাগ্যের (predestination) ধারণা ইসলামপূর্ব সময় থেকেই আরবদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। জাবারিয়া ধর্মতাত্ত্বিকরা এই ধারণার কট্টর সমর্থক ছিলেন। তাদের মতে, জগতের ভালো মন্দ যা কিছু হয় সবকিছুই হয় আল্লাহর ইচ্ছায়। কারন মানুষের কোন স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি নাই। তাদের মতে ইচ্ছার মাওলা একমাত্র আল্লাহ, আর মানুষ তার হাতের পুতুল মাত্র। জাবারিয়াদের এই তত্ত্বে উমাইয়ারা তাদের কাজের বৈধতা খুঁজে পেয়েছিল। নিজেদের তাবৎ জুলুমের দায়ভার তারা আল্লাহর ইচ্ছার উপরে চাপিয়ে দিয়েছিল। উমাইয়া খলিফা আবদ আল মালেক ইবনে মারওয়ান তার এক শত্রুকে হত্যা করার পর ঘোষনা দিয়েছিলেন, ‘তকদিরে যেমন লেখা ছিল তেমনি খুন করেছি’। বাঙালি হলে নিশ্চয় বলতেন ‘কপালে যা লেখা ছিল তাই করেছি’। আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে যেহেতু গাছের একটি পাতাও নড়ে না, তাই তারা আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কিছুই করে না, এই ছিল উমাইয়াদের সার কথা।

বাংলাদেশের একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কয়েক বছর আগে নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে ‘আল্লার মাল আল্লায় নিয়া গেছে’ তত্ত্ব দিয়ে বড় ধরণের সমালোচনার মুখে পরেছিলেন। মধ্যযুগের সম্রাটদের বিরুদ্ধে সমালোচনা সহজ কাজ ছিল না। জীবন যাওয়ার ভয় ছিল। উমাইয়ারা সকল সমালোচকদের উপর ছিলেন খড়গহস্ত। তারপরেও জাবারিয়া ধর্ম তাত্ত্বিক এবং উমাইয়া খেলাফতের পূর্বনির্ধারিত ভাগ্য তত্ত্ব সমালোচনার মুখে পরেছিল। সমালোচকদের মধ্যে সবচাইতে বিখ্যাত ছিলেন দরবেশ হাসান আল বসরী। হাসান আল বসরীর পিতা মাতা ছিলেন পারস্যের, কিন্তু তার জন্ম হয়েছে মদিনায়। খলিফায়ে রাশিদিনের যুগে তিনি বেড়ে উঠেছেন, আলীর ভক্ত ছিলেন। উমাইয়া খেলাফতের যুগে তিনি বসরায় বসবাস করতেন এবং ধর্মনিষ্ঠা ও পান্ডিত্যের জন্যে জনপ্রিয় ও সম্মানিত ছিলেন। ইবনে কুতাইবার বর্ননা মতে, উমাইয়া খলিফাদের ‘আল্লাহর ইচ্ছা’ তত্ত্ব সম্বন্ধে হাসান আল বসরির কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি ঘোষনা দিয়েছিলেন ‘আল্লাহর শত্রুরা মিথ্যা বলছে’। হাসান আল বসরী ছিলেন মানুষের ‘স্বাধীন ইচ্ছা’ তত্ত্বের সমর্থক। তার মতে, মানুষ তার স্বাধীন ইচ্ছা অনুযায়ি ভালো কাজ করতে এবং মন্দ কাজ করা থেকে বিরত থাকতে পারে এবং মানুষের কাজের দায়ভার একান্তই মানুষের, আল্লাহর নয়। হাসান আল বসরি ছাড়াও তার সমসাময়িক যারা ‘মানুষের ইচ্ছা’র পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন ইসলামের ইতিহাসে তাদেরকে ‘কাদারিয়া’ ধর্মতাত্ত্বিক বলা হয়। কাদারিয়াদের প্রধান দুই নেতা ছিলেন মাবাদ আল জুহানি এবং ঘাইলান আল দিমেস্কি। কাদারিয়া মতাদর্শ প্রচারের অভিযোগে এই দুইজনকেই উমাইয়ারা হত্যা করেছিল। কিন্তু ‘আল্লাহর ইচ্ছা’ তত্ত্বের বিরুদ্ধে তারা যে ‘মানুষের ইচ্ছা’ তত্ত্বের প্রচার করেছিল তার মৃত্যু হয় নাই। হাসান আল বসরির দুইজন শিষ্য ওয়াসিল ইবনে আতা এবং এবং আমর বিন ওবায়েদের হাতে ইসলামের প্রথম সুসংবদ্ধ ধর্মতত্ত্ব মুতাজিলাবাদের জন্ম হয়। এই দুইজনের মাধ্যমে মুতাজিলা ধর্মতত্ত্বে কাদারিয়াদের ‘মানুষের ইচ্ছা’ তত্ত্ব জায়গা করে নেয়। কিন্তু খালি ইচ্ছার স্বাধীনতা থাকলেই কি হবে? কোনটা ভালো কাজ আর কোনটা খারাপ কাজ তা বুঝার মতো বুদ্ধি কি মানুষের আছে? মুতাজিলারা ‘মানুষের ইচ্ছা’র পাশাপাশি ‘মানুষের বুদ্ধি’র পক্ষেও প্রচার চালিয়েছিলেন। মুতাজিলারা ইসলাম ব্যাখ্যায় যুক্তি (র‍্যাশনালিটি) তর্ক ও মানুষের বুদ্ধির (আকল) ব্যবহারকে যতোটা গুরুত্ব দিয়েছেন তেমনটা আর কেউ দেয় নাই। আরবী আকল (intellect) শব্দটি বাঙলায় এসে আক্কেল হয়ে গেছে। এর অর্থ হলো বিচারবুদ্ধি। যার আক্কেল নাই, বাঙলায় তাকে বলে বলা হয় বেয়াক্কেল। বেয়াক্কেলদের ভালো মন্দ ফারাক করার মতো বিচারবুদ্ধি নাই এই বিষয়ে সবাই একমত হবেন। কিন্তু আল্লাহ, ধর্ম এবং ভালো মন্দের ভেদ বুঝার জন্যে আক্কেলের গুরুত্ব কতোটুকু তা নিয়া ইসলামী ধর্মতত্ত্বে বহু বিতর্ক আছে। এই বিতর্কের ইতিহাস হাজার বছরের। আজকের আধুনিক যুগেও ইসলাম কেন্দ্র করে যেসব বিতর্ক চলছে সেসবের সমাধান এই বিতর্ক এড়িয়ে করা যাবে না।

বিতর্কটা মূলত আক্কেল, ওহী ও হাদিসশাস্ত্রের তুলনামুলক গুরুত্ব নিয়ে। আল্লাহ, সত্য, মিথ্যা, ভালো এবং মন্দ ইত্যাদি বুঝার জন্যে কুরান হাদিসই যথেষ্ট না কি আক্কেল থাকারও দরকার আছে তা একটি বিতর্ক। আবার শুধু আক্কেল থাকলেই চলবে না কি কুরান হাদিসেরও দরকার আছে তা আরেকটি বিতর্ক। যারা দুইটাই দরকারি মনে করেন তাদের মধ্যে বিতর্ক আছে দুইটার মধ্যে কোনটার গুরুত্ব বেশি তা নিয়া। মুতাজিলারা ছিলেন আক্কেলের কট্টর সমর্থক। তারা মনে করতেন, আল্লাহকে জানার জন্যে এবং ভালো মন্দের ফারাক বুঝার জন্যে আক্কেল থাকাই যথেষ্ট। তার মানে এই না যে তারা ওহীর গুরুত্ব অস্বিকার করেছেন। তারা মনে করতেন, ওহীর মাধ্যমে যেমন আল্লাহ সম্বন্ধে জানা যায় ও ভালো মন্দের ফারাক সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করা যায়, তেমনি আল্লাহর দেয়া আক্কেলের মাধ্যমেও এইসব বিষয়ে জ্ঞান লাভ করা সম্ভব। মুতাজিলারা রাজনৈতিকভাবে উমাইয়াদের বিরুদ্ধে ছিলেন। মুসলিম সমাজের যে সমস্ত দলের সমর্থন নিয়ে আব্বাসিয় বিপ্লব সংগঠিত হয়েছিল তাদের মধ্যে মুতজিলারাও ছিলেন। উমাইয়াদের পরাজিত করে আব্বাসিয়রা যখন খলিফা হয়ে উঠলেন তখন মুতাজিলারা পেলো দরবারি ধর্মতাত্ত্বিকদের মর্যাদা। আব্বাসিয় খেলাফতের আমলে মুসলিম দুনিয়ায় জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চায় যে স্বর্ণযুগের সুচনা হয়েছিল তার পেছনে মুতাজিলাদের স্বাধীন ইচ্ছা শক্তি এবং আক্কেল চর্চার আন্দোলনের প্রভাব ছিল অপরিসিম। মুতাজিলাদের ইসলামকে একমাত্র ‘সহিহ ইসলাম’ বানাতে গিয়ে খলিফা আল মামুন যে ঐতিহাসিক বিপত্তি ঘটিয়েছিলেন সেই কাহিনী ‘কুরানের ঐতিহাসিক কনটেক্সট নির্ভর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে’ নামক ব্লগটি যারা পড়েছেন তারা জানেন। হাদিসপন্থী উলামাদের নেতা ইমাম আহমদ হাম্বলের নেতৃত্বে মুতাজিলা বিরোধী যে সংগ্রাম শুরু হয়েছিল তার পথ ধরে এবং আব্বাসিয় খেলাফতের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে মুতাজিলাদের পতন হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে পতন হলেও মুসলমানদের ধর্মতত্ত্ব এবং দর্শনচর্চায় মুতাজিলাদের প্রভাব আজ অবধি বর্তমান আছে। গায়ের জোরে র‍্যাশনালিজমের মোকাবেলা করা যায় না। র‍্যাশনালিটিকে র‍্যাশনালিটি দিয়েই মোকাবেলা করা লাগে। হাদিসপন্থী সুন্নি মুসলমানরা মুতাজিলাদেরকে গ্রহণ করে নাই ঠিক, কিন্তু মুতাজিলাদের র‍্যাশনালিজমকে তারা ঠিকই গ্রহণ করেছে (সালাফিরা ছাড়া)। সুন্নি ইসলামের যে দুটি ধর্মতাত্ত্বিক ধারা এখনো বর্তমান সেগুলো হচ্ছে আশারি ও মাতুরিদি ধর্মতত্ত্ব। দুটি ধারারই জন্ম হয়েছে মুতাজিলাদের ধর্মতত্ত্বিক প্রশ্নগুলোকে মোকাবেলা করতে গিয়ে। আশারিয়রা ইচ্ছা ও আক্কেলের সীমাবদ্ধতার তত্ত্ব প্রচার করেছে, কিন্তু তা করতে গিয়ে নিজেরাই আক্কেলের ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছে। মুতাজিলা ও আশারিয় ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্কের মাঝে আবির্ভাব হয়ে মাতুরিদি ধর্মতত্ত্বের প্রবক্তা আবু মনসুর আল মাতুরিদি অনেকক্ষেত্রেই এই দুইয়ের মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছেন। বহুক্ষেত্রে আশারিয়দের সাথে একমত হলেও মানুষের আক্কেল প্রসঙ্গে মুতাজিলাদের সাথেই তিনি একমত ছিলেন যে মানুষের পক্ষে আক্কেল ব্যবহার করেই আল্লাহ সম্পর্কে জানা এবং ভালো এবং মন্দের ভেদ বুঝা সম্ভব। ইতিহাসের পরিক্রমায় অনারব সুন্নি মুসলমানদের মাঝে মাতুরিদি ধর্মতত্ত্বটি জনপ্রিয় হয়েছে। ইউরোপিয়দের ঔপনিবেশিক যুগের পূর্বে ওসমানি তুর্কি খেলাফত এবং ভারতীয় উপমহাদেশের মুঘল সাম্রাজ্যের অধিন মুসলমানদের মধ্যে প্রধান ধর্মতত্ত্ব ছিল মাতুরিদি ধর্মতত্ত্ব। ভারতিয় উপমহাদেশ বিশেষ করে বাংলাদেশের সুন্নিদের মধ্যেও মাতুরিদি ধর্মতাত্ত্বিক ধারাটিই প্রধান। ধর্মতাত্ত্বিক প্রশ্নে আক্কেলের গুরুত্ব ও ব্যবহার পুরোপুরি অস্বিকার করেছে সালাফি/ওয়াহাবিরা। আসলে তারা ধর্মতাত্ত্বিক প্রশ্ন তথা খোদ ধর্মতত্ত্বকেই অস্বিকার করেছে। কুরান হাদিসের লিটারাল ইন্টারপ্রিটেশনের বাইরে তারা আর কিছুই স্বিকার করে না।

আক্কেল প্রশ্নে বিতর্ক কেবল ইসলামী ধর্মতত্ত্বের এলাকাতেই হয় নাই, আইন এবং দর্শনের এলাকাতেও হয়েছে। শিয়া আইনে আক্কেল খুবি কেন্দ্রীয় বিষয়। সুন্নিদের মধ্যে হানাফিদের আইনে ইজতিহাদের নামে আক্কেলের ব্যবহার করা হয়েছে সবচাইতে বেশি, আক্কেল ব্যবহারের সুযোগও আছে সবচাইতে বেশি। শাফি এবং মালেকি আইনের অনুসারিরা আক্কেলের ব্যবহার সিমিত করেছে। হাম্বলিবাদীরা আক্কেলের ব্যবহার পুরোপুরি অস্বিকার করেছে। আরবের সালাফিদের শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া যে হাম্বলি আইনের অনুসারি ছিলেন এবং বাংলাদেশের সুন্নিদের আকিদার গুরু আল মাতুরিদি যে একজন হানাফি আইনের অনুসারি ছিলেন তা কোন কাকতালিয় বিষয় না। সালাফি/ওয়াহাবিদের মধ্যে হাম্বলি আইন এবং মাতুরিদি আকিদার সুন্নিদের মাধ্যে হানাফি আইনের প্রচলন ‘আক্কেল’ সংক্রান্ত তাদের অবস্থানের কারনেই। যারা ধর্মতত্ত্বে আক্কেলের ব্যবহার করেন, তারা আইনের ক্ষেত্রেও করেন। যারা আক্কেলের ব্যবহার করতে চান না তারা কোন ক্ষেত্রেই চান না। আক্কেলের মাধ্যমে ভালো মন্দের ভেদ বুঝা সম্ভব এটা যারা মানেন তারা কুরান হাদিসের বাইরে মানুষের আক্কেলের উপর নির্ভর করে গড়ে তোলা আইনও মানবেন। আল মাতুরিদি স্বিদ্ধান্তে পৌছেছিলেন যে খুন, চুরি, ডাকাতির মতো বিষয়গুলো যে খারাপ তা বুঝার জন্যে আক্কেল থাকলেই চলে, ওহীর দরকার পরে না। বাংলাদাশের হানাফি উলামারা যে মানুষের আক্কেলের উপর নির্ভর করে তৈড়ি করা ফৌজদারি আইনেই সকল বৈষয়িক সমস্যার বিচার খোঁজে তার পেছনে মাতুরিদি ধর্মতত্ত্বের প্রভাব তো অস্বিকার করা যাবে না। বাংলাদেশের দেওবন্দী ও হাটহাজারি ঘড়ানার উলামারা সর্বোচ্চ সংবিধানে ‘আল্লাহর উপর বিশ্বাস’ সংযুক্তির দাবি তোলেন, অথবা কুরান হাদিস বিরোধী আইন করা যাবে না এই আওয়াজ তোলেন, কিন্তু পুরো সংবিধান অথবা আক্কেলের তৈড়ি সেকুলার বিচার ব্যবস্থাকেই খারিজ করেন না। আক্কেলের পাশাপাশি সকল প্রকার সেকুলার আইন খারিজ করে একমাত্র সালাফিরা। শুধুমাত্র কুরান হাদিসের লিটারাল ইন্টারপ্রিটেশনই তাদের কাছে ইসলাম। আক্কেল বহির্ভুত এই ইসলাম চর্চাকে ‘লিটারালি বেয়াক্কেলে’র ইসলাম বলা যেতে পারে এবং সালাফিদেরকে ‘থিওরিটিকালি বেয়াক্কেল’ মুসলমান বললে ভুল বলা হবে না।

ওহি ও আক্কেলের বিতর্কটা মুসলমানদের দর্শন চর্চায় বড় আকাড় ধারণ করেছিল ইবনে সিনা ও আল ফারাবির বিরুদ্ধে আল গাজালির আক্কেল নির্ভর কিন্তু আক্কেল বিরোধী তৎপরতার মাধ্যমে। ইবনে রুশদের গুরু ইবনে তুফায়েল এই বিতর্ককে কেন্দ্রীয় বিষয় ধরে ‘হাই ইবনে ইয়াকজান’ নামে একটি দার্শনিক উপন্যাস লিখেছিলেন। হাই ইবনে ইয়াকজান নামে ইবনে সিনারও একটি বই আছে, তুফায়েলের বইয়ের অধিকাংশ চরিত্রও সিনার বই থেকে নেয়া। কিন্তু দুইটি আলাদা বই, একটির সাথে আরেকটি মিলিয়ে ফেলা যাবে না। তুফায়েলের হাই ইবনে ইয়াকজান খুব সম্ভবত আরবী ভাষায় লিখিত প্রথম উপন্যাস। বাঙলায় এর নাম হবে ‘জাগ্রতের পুত্র জীবিত’। উপন্যাসের নায়ক হাই ভারত মহাসাগরের একটি নির্জন দ্বীপে ছোটবেলা থেকে হরিনের দুধ খেয়ে বড় হয়। জঙলি পশুর মতো সে জীবন যাপন করতো। মা হরিনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সে মৃত্যু সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করে। তারপর হরিনের অটোপসির মাধ্যমে বায়োলোজির জ্ঞান। মানুষ বিবর্জিত ঐ দ্বীপে একা একা নিজের আক্কেল ব্যবহার করে এক পর্যায়ে হাই পরম সত্যের সন্ধান লাভ করে, লাভ করে ভালো মন্দের জ্ঞান। একদিন ঐ দ্বীপে নির্জনে ধর্মচর্চা করার জন্যে হাজির হয় একজন মুসলমান পন্ডিত। তাদের দুইজনের মধ্যে বন্ধুত্ব হয় এবং দুইজন এই স্বিদ্ধান্তে পৌছান যে ওহীর মাধ্যমে যে জ্ঞান লাভ করা যায় স্বাধীন ভাবে আক্কেলের ব্যবহার করেও সেই একি জ্ঞান লাভ করা সম্ভব। তবে পথ ভিন্ন হলেও দিনশেষে মতটা এক। এরিস্টটলপ্রেমী ইবনে তুফায়েল এই উপন্যাসটি লিখেছিলেন ওহী ও আক্কেলের মধ্যে সমন্বয়বাদী তত্ত্ব প্রচারের উদ্দেশ্যে। তার শিষ্য ইবনে রুশদও এই সমন্বয়ের চেষ্টা করেছেন, কুরান ঘেটে তাই দর্শনের সাথে মেলে এমন ইন্টারপ্রিটেশন করেছেন। সময়টা ছিল জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চায় স্বর্ণযুগের শেষ সময়। গাজালির আক্রমনে দর্শন চর্চা তখন ধর্মবিরোধীতা হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে। তুফায়েল, রুশদরা সমন্বয় করে মুসলিম চিন্তা জগতে দর্শন চর্চাকে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু লাভ হয় নাই। স্পেনের কর্ডোবায় মুসলমানরা যখন রুশদের বই পুড়িয়েছে, ফ্রান্সসহ ইউরোপের অন্যান্য অঞ্চলে তখন তার বইয়ের অনুবাদ ক্রমেই জনপ্রিয় হয়েছে। ইউরোপের রেনেসা থেকে এনলাইটেনমেন্টের পথে ইবনে রুশদের যতোটুকু প্রভাব ছিল, সেইটুকু প্রভাব আধুনিক মুসলমানদের মধ্যে এখনো তৈড়ি হওয়া বাকি আছে। ইবনে তুফায়েলের ‘হাই ইবনে ইয়াকজান’ ইউরোপিয় রেনেসার সময় ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ হয় ‘ফিলোসোফাস অটোডিডাক্টাস’ নামে এবং এরপর ইউরোপের অধিকাংশ ভাষাতেই এর অনুবাদ হয়েছে। বইটি ইউরোপের বিজ্ঞান বিপ্লব এবং এনলাইটেনমেন্টের পেছনে ভুমিকা রাখা সবচাইতে প্রভাবশালি বইয়ের একটি। সাহিত্যের ক্ষেত্রে ড্যানিয়েল ডেফোর রবিনসন ক্রুসোর অনুপ্রেরণা হাই ইবনে ইয়াকজান। যে বইটি মুসলমানদের চিন্তা জগতে ওহী এবং আক্কেলের বিতর্কে সমন্বয় সাধনে লেখা হয়েছিল তা ইউরোপিয়দের আক্কেল ব্যবহারে অনুপ্রানিত করেছে এই হলো ইতিহাস। ইউরোপের এনলাইটেনমেন্ট কি জিনিস তা বুঝাতে গিয়ে ইমানুয়েল কান্ট তাই মানুষের আক্কেলের জয় গান গেয়েছেন। আর এনলাইটেনমেণ্টে আক্কেলমন্দ ইউরোপিয় মডার্নিজম যখন উপনিবেশকদের মাধ্যমে মুসলমানদের দুনিয়ায় এসে হাজির হলো, তখন মডার্নিজমের মোকাবেলায় মুসলিম দুনিয়ায় আক্কেলমন্দ মুতাজিলা নয়, বরং বেয়াক্কেল সালাফি রিভাইভালিজম সংগঠিত হয়েছে, এটাও ইতিহাস।

মডার্নিস্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধ হলো একটি আক্কেলমন্দ আধিপত্যের কৌশল। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত বেয়াক্কেল সালাফি জিহাদীদের কাছে এই যুদ্ধ হলো হাদিসে লেখা শেষ জমানার এপোকেলিপ্টিক যুদ্ধ। অলঙ্ঘনিয় এবং পূর্বনির্ধারিত ভাগ্যে বিশ্বাস এবং হাদিস নির্ভর ভবিষ্যতবানীর উপর অন্ধ বিশ্বাসের কারনে এই জিহাদীরা ভাবে তারা শেষ জমানার এপোকেলিপ্টিক যুদ্ধে সামিল হয়ে দাজ্জালে(ইউরোপিয় সভ্যতা)র বিরুদ্ধে লড়াই করছে। ইউরোপিয় মডার্নিজমের মোকাবেলায় সালাফি রিভাইভালিজম মুসলমানদেরকে খাদের কিনারে নিয়ে গেছে। একটি আক্কেলমন্দ মুতাজিলা রিভাইভাইলিজম তাদেরকে রক্ষা করতে পারে।

আসলেতো রিভাইভাল কখনো সম্ভব না, কারন ইতিহাস কখনো ফিরে আসে না। আর রিফর্ম বলেও আসলে কিছু নাই। যা সম্ভব তা হলো বর্তমানের মোকাবেলা আর ভবিষ্যতের নির্মান। মানুষ নিজেই তার ইতিহাস নির্মান করতে পারে। ইচ্ছা এবং আক্কেল থাকলেই হয়।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১১ thoughts on “মুতাজিলা থেকে মডার্নিটিঃ মুসলমানের আক্কেল ও বেয়াক্কেলের ইসলাম প্রসঙ্গে

  1. মানুষের আক্কেল দিয়ে ভালো মন্দ
    মানুষের আক্কেল দিয়ে ভালো মন্দ নির্ধারিত হলে সৃষ্টিকর্তার ওহীর গুরুত্ব কি কম গুরুত্বপূর্ণ বা গুরুত্বহীন হয়ে যায় না? কোরান বা হাদিসের সরাসরি উল্লেখ যেভাবে সাধারন মুসলিমদের প্রভাবিত করবে মুতারিদি বা মুতাজিলা মতবাদ কি সেভাবে প্রভাবিত করতে পারবে? ওহীর চাইতে মানুষের আক্কেলের উপর নির্ভর করাটা কি একটু কম ইসলাম হয়ে যায় না? এ কারনেই এই মতবাদগুলো মূলধারায় আসতে পারেনি বা পারলেও তাদের স্থিতি ছিল ক্ষণস্থায়ী। কোরানকে দর্শনের আলোকে ব্যাখ্যা করে আক্কেলমন্দ মুতাজিলা রিভাইভাইলিজম খুবই আশার কথা কিন্তু দুঃখজনক হোল বেয়াক্কেল সালাফি জিহাদীরা সংখ্যায় বেশী এবং বেশী পপুলার। সাধারনভাবে কোন মুসলিম কম মুসলিম হবার রিস্ক নিতে যাবে না।

    1. মূলধারায় আসতে পারে নাই তা ঠিক
      মূলধারায় আসতে পারে নাই তা ঠিক না। মাতুরিদি সুন্নি ধর্মতত্ত্বের অন্যতম প্রধান মূলধারা এবং বাংলাদেশে প্রধান ধারা। সংখ্যার দিক থেকেও সালাফি জিহাদীরা বেশী না, বরং সংখ্যালঘু। ।

      1. ইসলামের ইতিহাস বলে ইসলাম যখন
        ইসলামের ইতিহাস বলে ইসলাম যখন অনারবদের মাঝে বিস্তার লাভ করে তখন থেকেই এর বিশুদ্ধতা নস্ট হয়। আরবের বাইরে দূর দুরান্তে ইসলাম সেই সমস্ত অঞ্চলের সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মূল বিসয়কে গৌন করে ফেলে। ইরান সম্ভবত এই বিশুদ্ধতা নস্টকারী অঞ্চলের তালিকায় প্রথম যেখানে ইসলাম পারস্যের ইসলাম পূর্ব সভ্যতা দ্বারা খুব বেশী পরিমান প্রভাবিত হয়। ইসলামে আক্কেলের ব্যবহার ইসলামিক কোন বিষয় বিষয় নয় বরং অন্য ধর্ম এবং সভ্যতার প্রভাব যা কিনা আল্লাহ্‌র ওহীকে কোরান এবং সুন্নার আলোকে ব্যাখ্যা না করে অইসলামিক উপায়ে ব্যাখ্যা করা হয়। মাতুরিদি ধর্মতত্বের বাংলাদেশীরা ভেজাল মুসলমান আর নিজেদের শুদ্ধ প্রমান করার জন্য মরিয়া হয়ে ইরান ইরাকে পূর্বপুরুষ বা নিদেন পক্ষে পাকিস্তানে পূর্বপুরুষের আবাস বলে আরাম পায়।

        1. মাতুরিদি ধর্মতত্বের

          মাতুরিদি ধর্মতত্বের বাংলাদেশীরা ভেজাল মুসলমান আর নিজেদের শুদ্ধ প্রমান করার জন্য মরিয়া হয়ে ইরান ইরাকে পূর্বপুরুষ বা নিদেন পক্ষে পাকিস্তানে পূর্বপুরুষের আবাস বলে আরাম পায়।

          চমৎকার বলেছেন আপা।

  2. আপনার পোস্টগুলো নিয়মিত পড়ছি
    আপনার পোস্টগুলো নিয়মিত পড়ছি আর অনেক কিছু জানছি। আপনি ইতিহাসকে বাংলা ভাষায় সমৃদ্ধ করছেন। আপনার কলম ও কি-বোর্ড যেন না থামে।

  3. গোগ্রাসে গিললাম। বাঙলা
    গোগ্রাসে গিললাম। বাঙলা ব্লগটাকে উঁচুতে তুলে ধরে রেখেছে এমন পোষ্টগুলো। জ্ঞানের অনেকগুলো দিক উন্মোচিত হচ্ছে। চালিয়ে যান।

  4. কুরআন কে বিতর্কের উরধে রেখে
    কুরআন কে বিতর্কের উরধে রেখে ইসলাম কে ব্যাখ্যা করলে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন অসম্ভব। সত্য উপলব্ধি ও অসম্ভব।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 54 = 60