সারা দুনিয়ার নারীদের অধিকারের পক্ষে যুদ্ধ করছি – মায়সা আবদো


ছবিঃ মায়সা আবদো, কোবানির প্রতিরোধ যুদ্ধের একজন কমান্ডার

আমরা সিরিয়ার কোবানি শহরের জনগণ সেপ্টেম্বরের পনের তারিখ থেকে আইসিসের সাথে যুদ্ধ করছি। আইসিসের যোদ্ধাদের তুলনায় আমরা সংখ্যায় কম, অস্ত্রশস্ত্রেও আমরা তাদের চাইতে দুর্বল। এতোসব দুর্বলতা নিয়েও আমরা ইসলামিক স্টেট(আইসিস)এর সর্বাত্তক হামলার মোকাবেলা করছি। গত একমাস যাবৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈড়ি ট্যাঙ্ক এবং সাঁজোয়া যান বাহন নিয়ে তারা আমাদের উপর হামলা চালিয়ে আসছে। কিন্তু কোবানির যোদ্ধাদের প্রতিরোধ তারা ভাঙতে সক্ষম হয় নাই। আইসিসের বিরুদ্ধে আমরা কুর্দিশ, আরব, মুসলমান, খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠির গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ একটি সমাজকে রক্ষা করার জন্যে যুদ্ধ করছি।

কোবানিতে আমাদের পুরো সমাজ একজোট হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। আমাদের বহু নেতা আমার মতোই নারী। আমরা যারা আইসিসের বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে অবতির্ণ হয়েছি, আমরা জানি আইসিস নারীদেরকে কি চোখে দেখে, নারীদের সাথে কিরকম ব্যবহার করে। আমরা আশা করছি, সারা দুনিয়ার নারীরা আমাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসবে, কারন আমরা সারা দুনিয়ার নারীদের অধিকারের পক্ষে যুদ্ধ করছি। আমরা এই আশা করছি না যে তারা আমাদের সাথে এসে যুদ্ধে যোগ দেবে (যদি কেউ আসে আমরা অবশ্যই তার জন্যে গর্বিত বোধ করবো)। কিন্তু আমরা সারা দুনিয়ার নারীদের আহবান জানাচ্ছি তারা যেনো আমাদের পক্ষে প্রচারণা চালায়, আমাদের অবস্থা সম্বন্ধে তাদের নিজ নিজ দেশের মানুষকে সচেতন করে এবং তাদের দেশের সরকারকে আমাদের সহযোগিতা করার জন্যে চাপ দেয়।

আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশনকে ধন্যবাদ জানাই, কারণ তারা আইসিসের বিভিন্ন অবস্থানের উপর বিমান হামলা চালিয়েছে। এই বিমান হামলার ফলে আইসিসের পক্ষে ট্যাংক এবং ভারি আর্টিলারি বহন করা কঠিন হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো আমরা বাইরের পৃথিবীর কোন সহযোগিতা ছাড়াই যুদ্ধ করে যাচ্ছি। বিশ অক্টোবর তারিখে কোয়ালিশনের বিমান থেকে কিছু অস্ত্র ও ত্রান আমাদের জন্যে ফেলা হয়েছে, কিন্তু তা যৎসামান্য। বাইরে থেকে সহযোগিতা না পেলে অচিরেই আমাদের গুলি ফুরিয়ে যাবে। সবচাইতে বড় বাস্তবতা হলো অস্ত্রের দিক থেকে আমরা আইসিসের চাইতে বহুগুন পিছিয়ে আছি।

আমরা আইসিসের কাছে কখনোই মাথানত করবো না। কিন্তু সাধারণ রাইফেল আর আর গ্রেনেডের চাইতে আমাদের আরো বেশি কিছু দরকার, যাতে আমরা আমাদের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারি এবং জিহাদী সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে ভুমিকা রাখতে পারি। উত্তর সিরিয়ার কুর্দিশরা আমাদেরকে তাদের যোদ্ধা, কিছু সাঁজোয়া যান এবং এন্টি ট্যাংক মিসাইল দিয়ে সহযোগিতা করতে চেয়েছে, কিন্তু তুর্কির বাধার কারনে তারা তা করতে পারছে না। তুর্কি ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্র। এই যুদ্ধে তারা আমাদের বন্ধু হতে পারতো। সিরিয়ার কুর্দিশ অঞ্চলগুলোতে যোগাযোগ ও আদান প্রদানের সুবিধা করে দিয়ে তারা আমাদের সহযোগিতা করতে পারতো। তাতে আমাদের অস্ত্রশস্ত্র ও ত্রান পাওয়ায়র ক্ষেত্রে সুবিধা হতো, আরো যোদ্ধা আমাদের সাথে যোগ দিতে পারতো। অথচ তুর্কির রাষ্ট্রপতি রেসেপ তায়েপ এরদোগান বারবার জনসম্মখে আমাদেরকে খুনি আইসিসের তুলনা করেছেন। তুরস্কের কুর্দিশ সংখ্যালঘুদের সাথে রাজনৈতিক বিরোধের ইতিহাসের জের টেনে তিনি এই তুলনা করছেন। অথচ আমরা আইসিসের বিরুদ্ধে একটি বহুত্ব ভিত্তিক গণতান্ত্রিক সমাজকে রক্ষার জন্যে লড়াই করছি। গত সপ্তাহে তুরস্কের ভেতরকার এবং বাইরের আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে তুর্কি নেতারা মৌখিকভাবে স্বিকার করেছিল যে তারা ইরাকের পেশমেগরা যোদ্ধাদের ছোট একটি দল এবং ফ্রি সিরিয়ান ব্রিগেডের কিছু যোদ্ধাকে কোবানিতে আসার জন্যে করিডোর খুলে দেবেন। কিন্তু তারা এখন পর্যন্ত সিরিয়ান কুর্দিদের আমাদের কাছে আসার কোন করিডোর দিতে রাজি হচ্ছে না। তারা কাদের কোবানিতে প্রবেশ করতে দেবে আর কাদের দেবেনা সেই স্বিদ্ধান্ত নিতে আমাদের সাথে কোন আলোচনাও করছে না। বর্তমান পরিস্থিতি হলো, আইসিস যতোখুশি অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদের যোগান পাচ্ছে, কিন্তু আমরা চারদিক থেকে অবরুদ্ধ হয়ে আছি। আমাদের তিনদিকে আইসিসের যোদ্ধাদের অবরোধ, আর একদিকে তুর্কিশ ট্যাঙ্কের অবরোধ। আমাদের কাছে প্রমান আছে তুর্কি সেনাবাহিনী তাদের সিমান্ত দিয়ে আইসিসকে অস্ত্র ও যোদ্ধা আনা নেওয়া করতে দিয়েছে। অথচ সিরিয়ার কুর্দিশ যোদ্ধাদের তারা সেই সুযোগ দিচ্ছে না।

সিরিয়ার কুর্দিদের ক্ষেত্রে তুর্কি সরকার তাদের পুরনো ‘কুর্দি বিরোধী’ পলিসি অনুযায়ি কাজ করে যাচ্ছে। আইসিস নয়, বরং সিরিয়ার কুর্দিএর স্বাধীনতা সংগ্রামকে ধ্বংশ করার ক্ষেত্রেই তুর্কি সরকারের আগ্রহ বেশি। তারা কোবানির পরাজয় চায়। অথচ আমরা তুর্কির বিরুদ্ধে কোন ভুমিকা গ্রহন করি নাই। আমরা তুর্কিকে বন্ধু হিসাবে দেখতে চাই, শত্রু হিসাবে নয়। তুরস্কের সরকার পশ্চিম কুর্দিস্তানের গণতান্ত্রিক সরকারের সাথে তাদের সিমান্ত চায় না কি ইসলামিক স্টেটের(আইসিস) সাথে তাদের সিমান্ত চায়? আমরা এখনো বিশ্বাস করি তুরস্কের নিজ স্বার্থেই আইসিস নয়, বরং গণতান্ত্রিক কুর্দিস্তানের সাথে তাদের সিমান্ত থাকা উচিৎ।

পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে আমরা আহবান জানাই সিরিয়ান কুর্দিশ বাহিনী এবং তাদের ভারি অস্ত্রশস্ত্র তুর্কির সিমান্ত করিডোরের মাধ্যমে কোবানিতে প্রবেশ করতে দেয়ার জন্যে তুর্কি সরকারকে চাপ আপনারা চাপ দিন। তুর্কি সরকার ইরাকি পেশমেগরাদের যে বাহিনীকে প্রবেশ করতে দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে তার পাশাপাশি সিরিয়ান কুর্দিদের জন্যে করিডোর দেয়ার জন্যে তুর্কি সরকারকে চাপ দেয়ার ক্ষেত্রে জাতিসংঘের শক্ত ভুমিকা নেয়া উচিত বলে আমরা বিশ্বাস করি।

সিরিয়ায় আইসিসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জেতার সক্ষমতা আমাদের আছে তা আমরা ইতিমধ্যে প্রমান করেছি। যতোবার আমরা তাদের সমানে সমানে মোকাবেলা করেছি ততোবার আমরা তাদের পরাজিত করেছি। যদি আমাদের আরো অস্ত্র থাকতো এবং সিরিয়ার অন্যান্য অঞ্চলের যোদ্ধারা যদি আমাদের সাথে যোগ দিতে পারতো তাহলে আমরা আইসিসের উপর মরণ আঘাত হানতে সক্ষম হতাম, এবং আমরা বিশ্বাস করি তাতে আইসিসের সামগ্রিক পতন তরান্বিত হতো।

কোবানির জনগণ সমগ্র বিশ্বের মনযোগ এবং সহযোগিতা কামনা করছে।

লেখকঃ ‘মায়সা আবদো’ ওরফে ‘নারিন আফরিন’, কোবানির যোদ্ধাদের একজন কমান্ডার।
(মূল লেখাটি ২৮ অক্টোবর কুর্দিশ ভাষায় প্রকাশিত হয়। গুনেই ইয়েলদিজের ইংরেজি অনুবাদ থেকে বাংলা অনুবাদটি করেছি।)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “সারা দুনিয়ার নারীদের অধিকারের পক্ষে যুদ্ধ করছি – মায়সা আবদো

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

69 + = 72