ফিনফিশারঃ সরকার যখন হ্যাকার!

আরব বসন্তের প্রভাবে ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মিশরের এক নায়ক হোসনি মোবারকের তিরিশ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। মার্চ মাসে বিদ্রোহীরা মিশরের ‘স্টেট সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশন সার্ভিসে’ হানা দিয়ে মোবারক সরকারের সাথে ‘গামা ইন্টারন্যাশনাল’ নামে একটি কোম্পানির ব্যবসায়িক সম্পর্ক আবিস্কার করে। জানা গেলো যে গামা ইন্টারন্যাশনাল ‘ফিন ফিশার’ নামক সার্ভেইলেন্স সফটওয়ার মোবারক সরকারের কাছে বিক্রি করেছিল, যা জনগণের কম্পিউটারসহ বিভিন্ন ডিভাইস থেকে ইমেইল, চ্যাট, অডিও, ভিডিও ইত্যাদিতে গোপন নজরদারির পাশাপাশি তথ্য চুরির কাজে ব্যবহার করা হয়। ফিনফিশার মানুষের নজরে আসলো সেবার প্রথমবারের মতো। এরপর ২০১২ সালে বাহরাইনের একটিভিস্টরা ফিনফিশারের মাধ্যমে তাদের উপর নজরদারী করা হচ্ছে বলে অভিযোগ আনলেন। মাস দুই আগেও ‘বাহরাইন ওয়াচ’ নামক একটি সংগঠন দেশটির সরকার তাদের বিরোধী রাজনৈতিক একটিভিস্টদের উপর ফিনফিশারের মাধ্যমে নজরদারী করছে বলে অভিযোগ করেছে। ভিয়েতনামে পাওয়া গেছে এন্ড্রোয়েড মোবাইলে ফিনস্পাই নজরদারির প্রমান। বেশকিছুদিন হলো উইকিলিক্স ফিনফিশার ও তার কাস্টোমার দেশগুলোর তথ্য উন্মোচন করছে। কানাডার টরেন্টো নির্ভর সংগঠন ‘সিটিজেন ল্যাব’এর মতে, সারা দুনিয়ার প্রায় পচিশটি দেশের সরকার জনগণের ব্যক্তিস্বাধীনতার তোয়াক্কা না করে ফিনফিশার ব্যবহার করছে। এরমধ্যে দুর্বল গণতন্ত্রের ও স্বৈরাচারশাসিত দেশগুলার সরকার যে ফিনফিশারের বিভিন্ন প্রোডাক্ট প্রতিপক্ষ রাজনীতিক, সাংবাদিক, ব্লগার ও একটিভিস্টদের উপর অনৈতিক নজরদারীতে ব্যবহার করে তা নিশ্চিত হওয়া গেছে, সবল রাষ্ট্রগুলো কতোটা নৈতিকভাবে ব্যবহার করছে তাও বলা কঠিন। আমাদের জন্যে খবর হলো, উইকিলিক্সে প্রকাশিত ফিনফিশারের কাস্টোমারদের তালিকায় বাংলাদেশের নামও পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার গণতান্ত্রিকভাবে দুর্বল ও স্বৈরতান্ত্রিকভাবে সবল। এই অবসথায়, সরকার ফিনফিশার কি কাজে ব্যবহার করছে আমরা তা জানতে চাই।

গামা ইন্টারন্যাশনাল ইউকে ও জার্মানি ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান। তাদের ফিনফিশার প্রোডাক্ট লাইনে আছে গোপনে নজরদারির উপযোগী ট্রোজান, মলওয়ার, স্পাইওয়ার এবং মনিটরিং ও তথ্যচুরির জন্যে ‘রিমোট কমান্ড এন্ড কন্ট্রোল সার্ভার’। এসব প্রোডাক্ট বিক্রির পাশাপাশি তারা ফিনফিশার প্রোডাক্ট ব্যবহারের ট্রেইনিং এবং সাপোর্ট দিয়ে থাকে। ট্রোজান, মলওয়ার, স্পাইওয়ার এইসবকিছুই হ্যাকিং টুল। অনলাইনে যেসব অপরাধ সংগঠিত হয় তার বড় অংশই হয় এই জাতীয় হ্যাকিং টুলএর মাধ্যমে। মানুষের ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, পাসওয়ার্ড ইত্যাদি চুরির কাজে এসব টুলের ব্যবহার করা হয়। যেসব হ্যাকাররা এসব টুল ব্যবহার করে তারা আইনের চোখে অপরাধী, কিন্তু খোদ সরকারই যখন হ্যাকারের ভুমিকায় আবির্ভুত হয় এবং ক্ষমতা পোক্ত করতে জনগণের মানবাধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণ করে তখন সেই সরকারকে কি বলা যায়? উইকিলিক্সে প্রকাশতি তথ্য মতে বাংলাদেশ সরকার ২০১২ সাল থেকে গামা ইন্টারন্যাশনালের কাস্টোমার। আপনার অজান্তেই হয়তো বাংলাদেশ সরকারের কোন একটি প্রতিষ্ঠান ফিনফিশারের মাধ্যমে আপনার ফেসবুক চ্যাট, ই-মেইল, স্কাইপি ভিডিও চ্যাট থেকে শুরু করে আরো অনেক ব্যক্তিগত বিষয়ে গোপনে নজর রাখছে, আপনার ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করছে। আপনার এন্টি স্পাইওয়ার সফটওয়ার ফিনফিশারের কোন প্রডাক্টকে শনাক্ত করতে পারবে না, ডিলেট করা আরো কঠিন। উইকিলিক্সে প্রকাশিত তথ্য মতে, বাংলাদেশ সরকার ফিনফিশার প্রোডাক্ট লাইনের ‘ফিনস্পাই’ স্পাইওয়ার এবং ‘ফিনফ্লাই ইউএসবি’র খরিদ্দার।


ছবিঃ উইকিলিক্স থেকে

ফিনস্পাই ইনফেক্টেড পিসি থেকে স্কাইপ কনভার্সেশন, ইমেইল, চ্যাট ইত্যাদি রিমোট কন্ট্রোল এবং কমান্ড সার্ভারের মাধ্যমে নজরদারির পাশাপাশি রেকর্ড করে রাখা যায়। উইকিলিক্সে প্রকাশিত তথ্য মতে, ২০১২ সালের ১১ নভেম্বর থেকে ২০১৩ সালের ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার ফিনস্পাইএর তিনটি লাইসেন্স খরিদ করেছে। এই তিনটি লাইসেন্সের মাধ্যমে সরকারের ৬জন এজেন্ট একবারে ৬০টি পিসিতে নজরদারি করতে সক্ষম। এই তিনটি লাইসেন্স কিনতে সরকারের খরচ হয়েছে প্রায় ৮ কোটি ২০ লাখ টাকা।


ছবিঃ উইকিলিক্স থেকে

বাংলাদেশের কোন কোন সরকারী প্রতিষ্ঠান এই সফটওয়ার ব্যবহার করছে তা উইকিলিক্সে প্রকাশিত হয় নাই। তবে উইকিলিক্সে প্রকাশিত তথ্য থেকে দেখা গেছে, ‘আরেফিন’ নামে একজন এজেন্ট ‘আমরা গতকাল একজনকে ইনফেক্ট করেছি, সে অনলাইনে আছে, কিন্তু আমরা তার কাছ থেকে কোন তথ্য পাচ্ছি না। দয়া করে আমাদেরকে সাজেশন দিন’ লিখে গামা ইন্টারন্যাশনালের কাছে সাপোর্ট রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছেন।

সরকার নিজেই যদি হ্যাকার হয়, জনগণের বিরুদ্ধে ট্রোজান, স্পাইওয়ার ইত্যাদি ব্যবহার করে তাহলে আমাদের বিচার চাওয়ার কোন জায়গা বাকি থাকে না। সাগর, রুনির হত্যাকান্ডের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, জনগণের বেডরুমের নিরাপত্তা দেয়া তার কাজ নয়। আজ পর্যন্ত সাগর, রুনির খুনিরা ধরা পরে নাই। অপরাধীর হাত থেকে সরকার বেডরুমের নিরাপত্তা দিতে পারছে না। অথচ জনগণের ব্যক্তিগত কম্পিউটার, ইমেইল ইত্যাদি খোদ সরকারের হাত থেকেই নিরাপদ নয়।

ফিনফিশার দিয়ে হোসনি মোবারক ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পারেন নাই। শেখ হাসিনা কি পারবেন? জনগণের ব্যক্তিগত তথ্য চুরি না করে তাদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেই কি ভালো হয় না?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৭ thoughts on “ফিনফিশারঃ সরকার যখন হ্যাকার!

  1. নিরাপদ নয়।
    ফিনফিশার দিয়ে

    নিরাপদ নয়।
    ফিনফিশার দিয়ে হোসনি মোবারক
    ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পারেন নাই।
    শেখ হাসিনা কি পারবেন? জনগণের
    ব্যক্তিগত তথ্য চুরি না করে তাদের
    জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত
    করলেই কি ভালো হয় না?
    বিভাগঃ রাজনীতি
    সমসাময়িক

  2. ফিনফিশার দিয়ে হোসনি মোবারক

    ফিনফিশার দিয়ে হোসনি মোবারক ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পারেন নাই। শেখ হাসিনা কি পারবেন?

    তা না পারলেও হোচনি মুবারকের মত ৩০ বচর ক্ষমতায় থাকতে পারলেই তো অনেক। হাম্বালীগের এর চেয়ে বেশি কিছু লাগেনা। 😀

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

64 − = 62