সন্ত্রাসনামা

জামায়াতে ইসলামী নামক দলটা গঠিত হয় ১৯৪১ সালে । গত ৭২ বছরে তাদের রাজনৈতিক ইতিহাস শুধুই ভন্ডামীর ইতিহাস । দলের প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ আবুল আলা মওদূদীর (জন্ম ভারতের আওরঙ্গবাদে, বর্তমান হায়দারাবাদ, মহারাষ্ট্র) ব্যাক্তিগত দর্শনই এই দলটার রাজনৈতিক দর্শন । এই লেখায় মওদূদীর তিনটা ফতোয়া ব্যাবহার করছি । দুইটা লেখার শুরুতে দিচ্ছি, অন্যটা একেবারে শেষে । মাঝখানে ইতিহাস ।

“গণতন্ত্র বিষাক্ত দুধের মাখনের মত” মওদূদী, সিয়াসি কসমকস, তৃতীয় খন্ড, পৃঃ ১৭৭

“গণতন্ত্রএর মাধ্যমে কোনো সংসদ নির্বাচনে পার্থী হওয়া ইসলাম অনুযায়ী হারাম” – রাসায়েল ও মাসায়েল । লেখক মওদূদী । প্রথম সংঙ্করণ, পৃষ্ঠা ৪৫০

১৯৪১- এ বছরের ২৬ আগস্ট লাহোরে “জামায়াতে ইসলামী হিন্দ” নামে দলটা গঠিত হয় । ভারতবর্ষের কম্যুনিস্ট বিরোধী শক্তি হিসেবে ব্রিটিশ সম্রাজ্যবাদীদের আশ্রয়ে এই দলটির জন্ম । এখনো ব্রিটিশদের সাথে দলটির সম্পর্ক গভীর । জন্মের সাথে সাথে এরা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার তীব্র বিরোধীতা করতে থাকে । মওদূদী ফতোয়া দেন পাকিস্তান রাষ্ট প্রতিষ্ঠার দাবী করা সবাই, মুসলীম লীগ, জিন্নাহ এরা কেউই “খাটি মুসলিম” না । মাথায় রাখেন ৭১ সালেও গণ হত্যার সময় “খাটি মুসলিম” তত্ব ব্যাবহার করা হয়েছে ।

১৯৪২- লাহোর থেকে হেডকোয়ার্টার ভারতের পাঠানকোটে স্থানান্তর ।

১৯৪৩- মাসিক “তরজমানুল কোরআন” ম্যাগাজিনের মাধ্যমে নিজেদের মতবাদ প্রচার করতে থাকে। এই ম্যাগাজিনের ফেব্রুয়ারী সংখ্যায় মওদূদী পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরোধিতা করে লিখেন, পাকিস্তান নামক কোনো রাষ্ট্রের জন্ম হলে সেটা “আহাম্মকের বেহেশত” এবং “মুসলমানদের কাফেরানা রাষ্ট্র” হবে। *পাকিস্তানের স্বাধীনতার সরাসরি বিরোধীতা করে দলটি।

১৯৪৪- দল দ্রুত সংঘঠিত হতে থাকে । দ্রুত বাড়তে থাকে সদস্য সংখ্যা ।

১৯৪৫- অবিভক্ত ভারতে সর্বপ্রথম কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয় ।

১৯৪৬- কয়েকজন আলেমকে দলে ভেড়াতে সক্ষম হয়।

১৯৪৭- দেশভাগের সাথে সাথে লাহোরে প্রধাণ কার্যালয় স্থানান্তর । অথচ এর আগে পর্যন্ত পাকিস্তান রাষ্ট গঠনের চরম বিরোধীতা করে। পাকিস্তানে যাওয়ার পর পাকিস্তানের কাশ্মীরের জন্য আন্দোলন করাকে হারাম ঘোষণা দেয়।

১৯৪৮- ইসলামী সংবিধান ও ইসলামী সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচারণা শুরু করে। এর পর পাকিস্তান সরকার জননিরাপত্তা আইনে মওদূদীকে কারাবন্দী করে । *এ বছর পূর্বপাকিস্তানে জামাতের কার্যক্রম শুরু হয়।

১৯৪৯- পাকিস্তান সরকার আগে বিরোধিতা করলেও শেষ পর্যন্ত জামাতের “ইসলামী সংবিধানের রূপরেখা” গ্রহণ করে । পরে পাকিস্তান জামাত প্রভাবিত সংবিধান প্রণয়ন করে ।

১৯৫০- পরের বছর পাঞ্জাবের প্রাদেশিক নির্বাচনে অংশগ্রহনের জন্য ব্যাপক প্রচারণা । মওদূদী জেল থেকে মুক্তি পান ।

১৯৫১- পাঞ্জাবের প্রাদেশিক নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং ভরাডুবি ।

১৯৫২- গোলাম আজম ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহন করেন । পরে ১৯৭০ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের শুক্কুর শহরে এক সংবর্ধণা সভায় তিনি বলেন “উর্দূ পাক-ভারত উপমহাদেশের মানুষের সাধারণ ভাষা। ৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে অংশ নেওয়া তার মারাত্নক ভুল ছিলো। বাংলা ভাষা আন্দোলন মোটেও সঠিক কাজ হয়নি। তিনি এজন্য দুঃখিত” সূত্র : দৈনিক আজাদ ২০ জুন ১৯৭০/ সাপ্তাহিক গণশক্তি ২১ জুন ১৯৭০/ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস- ডঃ মোহাম্মদ হান্নান, পৃঃ ৩৯৯

১৯৫৩- ১৮ জানুয়ারী মওদূদী করাচীতে কাদিয়ানী তথা আহমদিয়া সম্প্রদায়কে অমুসলিম ফতোয়া দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষনা করেন । এবং “রাষ্ট্রের সকল পদ থেকে কাদিয়ানীদেরকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য” সরকারের কাছে দাবী পেশ এবং আন্দোলন করেন । “কাদিয়ানী সমস্যা” নামে একটা বই লিখেও কাদিয়ানী সম্প্রদায়কে অমুসলিম প্রমাণের চেষ্টা করেন । এবং তার মতবাদ নিয়ে ব্যাপক প্রচারনা চালান । এতে সৃষ্ট সাম্পদায়িক দাঙ্গায় কয়েক হাজার মানুষ মারা যায় । মওদুদী দোষী প্রমানিত হওয়ায় আদালত মৃত্যুদন্ডের আদেশ দেয় । পরে মৃত্যুদন্ড প্রত্যাহার করে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয় । এবং কিছুদিনের ভিতর তাও প্রত্যাহার করা হয় ।

১৯৫৪- গোলাম আজম জামাতে যোগ দেন । প্রথম দিকে পূর্বপাকিস্তানে জামতের অবস্থান মজবুত না থাকলেও, গোলাম আজম যোগ দেওয়ার সাথে সাথে পূর্ব পাকিস্তানে দল চাঙ্গা হয়ে উঠে ।

১৯৫৫- ১৯৪৭ সালে গঠিত “জামায়াত ই তালেবর” নাম পরিবর্তন করে “ইসলামী ছাত্রসংঘ” নামে আত্নপ্রকাশ করে। মাওলানা আবদুর রহীম পূর্ব পাকিস্তানের আমির নির্বাচিত হন (পরে তিনি জামাতের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করেন)

১৯৫৬- পূর্ব পাকিস্তানে কার্যক্রম শুরু করে ইসলামী ছাত্রসংঘ।

১৯৫৭- সালে গোলাম আজমকে পূর্ব পাকিস্তান জামাতের সেক্রেটারি জেনারেল নিজুক্ত করা হয় । আমির ছিলেন মাওলানা আবদুর রহিম ।

১৯৫৮- আইয়ুব খান জামায়াতে ইসলামী সহ সকল দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষনা করে । ১৯৬২ সাল পর্যন্ত এই ফরমান বলবৎ ছিল।

১৯৬২- মুসলিম পারিবার আইন বিরোধীতা কারেন। শিক্ষা আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান নেয়।

১৯৬৩- মুসলিম পারিবারিক আইন নিয়ে সাম্প্রদায়িক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি ।

১৯৬৪- ৪ জানুয়ারী জামাতের সকল কর্মকান্ডের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় । *নিষিদ্ধ হয় জামায়াত । মওদুদী সহ ৬০ জন জামাত নেতাকে গ্রেফতার করা হয় । যার ভিতর গোলাম আজম একজন । অক্টোবরেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয় ।

১৯৬৫- নির্বাচনে ফাতেমা জিন্নাহর পরাজয় ঘটলে দল কোনঠাসা হয়ে পড়ে।

১৯৬৬- শেখ মুজিবের ৬ দফার বিরোধীতা করে। এই দফাগুলোকে দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসেবে অখ্যায়িত করে ।

১৯৬৭- শেখ মুজিবের ৬ দফার ভিত্তিতে যখন পূর্ব পাকিস্তানে প্রবল গণ আন্দোলন শুরু হয়, তখন জামাত ৫ দফা নামে আরেকটা আন্দোলন শুরু করে গণ আন্দোলন ব্যাহত করার চেষ্টা করে ।

১৯৬৮- আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাকে কেন্দ্র করে পূর্ব পাকিস্তান উত্তাল হয়ে উঠে । সারা পাকিস্তানে চরম রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিরাজ করে। এর ভিররই জামাত আইয়ুব খানের আস্থা অর্জন করে নেয় ।

১৯৬৯- গণ অভ্যুথানের সময় রহস্যজনক রাজনৈতিক অবস্থান । গোলাম আজম পূর্ব পাকিস্তানের আমির হন ।

১৯৭০- পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম সাধারণ নির্বাচনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৫১ আসনে পার্থী দিয়ে ৪ টি আসন জিতে নেয় । সবচেয়ে বেশি আসনে পার্থী দেয় আওয়ামীলীগ এবং তারা সবচেয়ে বেশি আসনে জয়লাভও করে । তৃতীয় সর্বোচ্চ আসনে (১২০) পার্থী দেয় ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টি।

১৯৭১- একাত্তরের জামাত নিয়ে কয়েক লাইনে শেষ করা অসম্ভব । তারপও দুই এক লাইন লিখলাম । ১০ এপ্রিল পাকিস্তানের অখন্ডতা রক্ষায় ঢাকায় শান্তি কমিটি গঠন করা হয় । কয়েকদিন আগে উদ্ধার হওয়া একটা নথিতে দেখা যায় এই কমিটির ১ নম্বর সদস্য হচ্ছেন গোলাম আজম । নথিটা দীর্ঘদিন যাবত পুরান ঢাকার এক ভদ্রলোক সংরক্ষন করেছিলেন । কিছুদিন আগে নথিটা তিনি আন্তর্জাতিক যুদ্ধপরাধ ট্রাইবুনালে জমা দেন । ৩০ জুন লাহোরে গোলাম আজম বলেন তার দল মুক্তিযোদ্ধাদের (দুস্কৃতকারীদের) দমন করার জন্য সর্বাত্নক চেষ্টা চালাচ্ছে । দলের নেতৃত্বে গঠন করা হয় আলবদর রাজাকার । সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে আবদুল মালেকের নেতৃত্বে প্রাদেশিক সরকার গঠন করা হয় । জামাতের সাবেক আমীর আব্বাস আলী খান এই সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন । ১৯৭১ সালে সংঘঠিত ইতিহাসের বৃহত্তম গণহত্যার জন্য দলটা কোনো ক্ষমা চায়নি । বরং গোলাম আজম দম্ভের সাথে জানিয়ে দেন একাত্তরের জন্য তারা অনুতপ্ত নয় । বরং তারা যা করেছে ঠিক করেছে ।

১৯৭২- গোলাম আজমের উদ্যোগে পাকিস্তানে পালিত হয় “পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার সপ্তাহ” এরপর লন্ডন গিয়ে সেখানে “পূর্ব পাকিস্তান উদ্ধার কমিটি ” নামে একটা কমিটি গঠন করেন। এই কমিটি বাংলাদেশকে উদ্ধার করে আবার পূর্ব পাকিস্তান করার সর্বাত্নক চেষ্টা চালায়। ডিসেম্বরে সৌদি আরবে আন্তর্জাতিক যুব সম্মেলনে অংশ নিয়ে সকল মুসলিম রাষ্ট্রকে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দিতে, এবং যুদ্ধ বিদ্ধস্ত মানুষের সহায়তায় কোনো প্রকার আর্থিক সাহায্য না দিতে আহবান জানান।

১৯৭৩- সরকারী এক আদেশে ৩৮ জনের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয় । এর একজন গোলাম আজম । গোলাম আজম মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো সফর শুরু করেন। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দিতে এবং পূর্ব পাকিস্তান উদ্ধারে সহায়তা চান। ম্যানচেস্টারে অনুষ্ঠিত ফেডারেশন অব স্টুডেন্টস ইসলামিক সোসাইটির সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তান উদ্ধারের বিষয়ে বক্তৃতা দেন।

১৯৭৪- মাহমুদ আলী সহ কয়েকজন পাকিস্তানিকে নিয়ে লন্ডনে পূর্ব পাকিস্তান উদ্ধার কমিটির বৈঠক হয় । মক্কায় অনুষ্ঠিত রাবেতায়ে ইসলামীর সম্মেলনে বাংলাদেশ উদ্ধার নিয়ে বক্তৃতা দেন।

১৯৭৫- একাত্তর সালের পর আত্নগোপনে চলে যাওয়া জামাত নেতারা আস্তে আস্তে দেশে ফিরতে শুরু করে । কুখ্যাত যুদ্ধপরাধী শাহ আজিজুর রহমান দেশে ফিরেন । পরে তিনি বিএনপির প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন।

১৯৭৬- সরকার এক প্রেসনোটে নাগরিক্ত্ব ফেরত পাওয়ার জন্য ইচ্ছুক ব্যাক্তিদের আবেদন জানাতে বলেন। গোলাম আজম সাথে সাথে আবেদন করেন এবং প্রত্যাখাত হয়।

১৯৭৭- গোলাম আজম আবারো নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়ার জন্য আবেদন করেন এবং প্রত্যাখ্যাত হয় ।

১৯৭৮- গোলাম আজম পাকিস্তানি পাসপোর্ট নিয়ে কোনো ভিসা ছাড়াই ১১ জুলাই ঢাকা আসেন । মায়ের অসুস্থতার জন্য মানবিক কারনে তাকে ৩ মাসের অনুমতি দেওয়া হয় । এরপর ৭৮ থেকে ৯৪ সাল পর্যন্ত অবৈধভাবে বাংলাদেশে বসবাস করেন ।

১৯৭৯- ঢাকায় একটা কনভেনশনের মাধ্যমে “জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ” গঠিত হয়। গোপনে গোলাম আজমকে আমীর করে আব্বাস আলী খানকে ভারপ্রাপ্ত আমীরের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

১৯৮০- প্রথমবারের মত বায়তুল মোকারমের সামনে জামাতের সভা হয়। প্রকাশ্যে এটাই তাদের প্রথম সম্মেলন।

১৯৮১- জামাতের ভারপ্রাপ্ত আমীর আব্বাস আলী খান এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন “একাত্ততে আমরা যা করেছি ঠিকই করেছি। একাত্তরে বাংলাদেশ কনসেপ্ট ঠিক ছিলোনা”

১৯৮২- রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ যায়গা গুলোতে জামাত দ্রুত প্রবেশ করতে থাকে। কাদের মোল্লা ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়।

১৯৮৩- দলের রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে ব্যাস্ত থাকে দলটি।

১৯৮৪- জামাতের সাবেক আমির মাওলানা আবদুর রহিম জামাত ছেড়ে ইসলামী ঐক্য (জোট) নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন।

১৯৮৫- এরশাদ সরকারের সাথে দলটার সখ্যতা গড়ে উঠে। কাদের মোল্লা ঢাকা মহানগর আমির নির্বাচিত হয়।

১৯৮৬- এরশাদ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অংশগ্রহন করে ১০ টা আসন পায়।

১৯৮৭- সাংঘঠনিক কার্যক্রম বাড়ানোর দিকে মনযোগ দেয়।

১৯৮৮- অনেকদিন নিষ্ক্রিয় থাকার পর জামাতের ছাত্র সংঘঠন শিবির নিজেদের শক্তি প্রদর্শনে মরিয়া হয়ে উঠে। চট্টগ্রাম রাজশাহী সহ বিভিন্ন জেলায় তাদের ট্রেডমার্ক রগ কাটার রাজনীতি শুরু করে।

১৯৮৯- তৎপর হয়ে উঠে জামাত। সাংঘঠনিক কার্যক্রম বাড়াতে থাকে।

১৯৯০- এরশাদ সরকারের পতন ঘটে। টিভিতে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা নেতৃরা বক্তৃতা বিবৃতি দেন । জামাতের নেতারাও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতা হিসেবে টিভিতে আসেন! সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় উঠে।

১৯৯১- নির্বাচনে রেকর্ড ১৮ টি আসনে জিতে নেয় ! কুলুষিত হয় মহান জাতীয় সংসদ । বিএনপি সরকারের সাথে আপোষে এত আসন পায়। নাগরিকত্বহীন গোলাম আজমকে আনুষ্ঠানিক ভাবে জামাত আমির ঘোষনা করে।

১৯৯২- বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনা জামাতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করে। বিজেপি বিরোধী আন্দোলন করে গণহারে রাস্তায় নেমে আসে। সাধারণ মানুষের কাছে পৌচাতে চেষ্টা করে। একই বছর জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটি গঠিত হয়। গোলাম আজমকে মৃত্যুদন্ডযোগ্য ঘোষনা করা হয়।

১৯৯৩- গণাদালতের কারনে কিছুটা কোনঠাসা হয়ে পড়ে দলটি। নিজামী কাদেরমোল্লা সাইদী কামরুজ্জামান আব্দুল আলীম সহ আট জনকে মৃত্যুদন্ডযোগ্য ঘোষনা করে।

১৯৯৪- সালে উচ্চ আদালতের এক রায়ে গোলাম আজম জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব ফিরে পান ।

১৯৯৫- ঢিলেঢালা ভাবে পালিত হলেও এবছর জামাত প্রথমবারের মত একদিন হরতাল দেয়।

১৯৯৬- সালে জামাত এবং আওয়ামীলীগ তত্ববধাক সরকারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। একসাথে আন্দোলন করেছেন, তবে রাজনৈতিক জোট হিসেবে নয়। নির্বাচনে জামাত একাই লড়েছিল।

১৯৯৭- রাজনীতিতে জামাত শিকড় গেড়ে ফেলেছে। শিবির বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দখল, সাইদী ব্যাপক ভাবে ওয়াজ নসিহত শুরু করেন।

১৯৯৮- বিএনপির সাথে মতৈক্যে আসে দলটি।

১৯৯৯- বিএনপির সাথে ৪ দলীয় জোট গঠন করে । পায়ের নিচে শক্ত মাটি পায়। দেশের মানুষ চুড়ান্ত হতাশ হয়।

২০০০- জামায়াত রাজনৈতিক হাইওয়েতে উঠে যাওয়ায় নিশ্চিন্তে রাজনীতি থেকে অবসর নেন গোলাম আজম। দলের নতুন আমীর হন মতিউর রহমান নিজামী।

২০০১- নির্বাচনে ১৮ টি আসন লাভ করে। এরপর ঘটে জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কজনক ঘটনা। দলের শীর্ষ দুই নেতা নিজামী এবং মুজাহীদ মন্ত্রিত্ব লাভ করে! গাড়িতে উড়ায় জাতীয় পতাকা !!

২০০২- শিকড় বাকড় ছড়াতে থাকে একেবারে ক্ষমতায় থেকে। নেতারা মুক্তিযুদ্ধ নিয়েও বক্তৃতা বিবৃতি দেন !!

২০০৩- সাইদী ওয়াজ নসিহত চলতে থাকে ।
২০০৪- শুরু করে জঙ্গী তৎপরতা। জঙ্গী দলগুলোর সাথে গড়ে তোলে সুসম্পর্ক । জামাতের আমন্ত্রনে পাকিস্তান জামাতে ইসলামীর শীর্যস্থানীয় নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশে আসেন। তারা শিরিরের দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে অংশ নেন।

২০০৫- নির্বাচনের জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি নিতে থাকে। শুধুমাত্র ভারতীয় কোম্পানী বলে টাটার ২.৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী নিজামী (উইকিলিকস)

২০০৬- জামাতের তান্ডবময় একটা বছর।

২০০৭- নতুন প্রজন্ম জমাতের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে থাকে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জামাতকে নির্বাচন করতে দেওয়ার বিপক্ষে ছিলেন। ২৫ অক্টোবর মিডিয়ায় কাদের মোল্লা বলেন মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধে গিয়েছেন নারী এবং সম্পত্তির লোভে ! দেশ ক্ষোবে ফেটে পড়ে।

২০০৮- নির্বাচনে জামতের লেজেগোবরে অবস্থা। শুধুমাত্র যুদ্ধপরাধীদের বিচার হবে এজন্য তরুন প্রজন্মের ভোটে আওয়ামীলীগের বিপুল ব্যাবধানে জয়লাভ।

২০০৯- মহান জাতীয় সংসদে একজন সংসদ সদস্য যুদ্ধপরাধীদের বিচারের প্রস্তাব পেশ করলে তা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।
২০১০- আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল গঠিত হয়। গ্রেপ্তার হতে থাকে অভিযুক্ত ব্যাক্তিরা। জনগন আশাবাদী হয়।

২০১১- দেশ বিদেশে ট্রাইবুনালের নামে অপপ্রচার চালাতে থাকে। একই সাথে প্রচুর টাকা পয়সা খরচ করে চলতে থাকে আন্তর্জাতিক লবিং ।

২০১২- দেশপ্রেমকে পুঁজি করে সীমিত সামর্থ নিয়ে চলতে থাকে বিচার কার্যক্রম। চলতে থাকে দুই পক্ষের সাক্ষ্য গ্রহণ।

২০১৩- অবশেষে বাচ্চু রাজাকারের রায় দেওয়ার মাধ্যমে ৪২ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটে।

লেখার শুরুতেই বলছিলাম এই লেখায় মওদূদীর ৩ টা ফতোয়া ব্যাবহার করবো। দুইটা শুরুতেই দিয়েছিলাম। অন্যটা শেষে দিচ্ছি-

“সময়ে সময়ে মিথ্যা বলা শুধু জায়েজই নয় বরং অবশ্য কর্তব্য” – আবুল আলা মওদূদী, তরজমানুল কোরআন, মে ১৯৫৮

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫১ thoughts on “সন্ত্রাসনামা

  1. তথ্যবহুল সুলিখিত এবং সুন্দর
    তথ্যবহুল সুলিখিত এবং সুন্দর যুক্তিপূর্নভাবে উপস্থাপিত লেখাটার জন্য অনেক ধন্যবাদ। গালাগালি, সস্তা শ্লোগান আর অবান্তর বিষয় টেনে আনার চেয়ে তথ্য উপাত্ত সহ এই লেখা লাখো গুন বেশি শক্তিশালি বাংলাদেশের এই কঠিন সময়ে। বেশির ভাগ সাধারন নাগরিক, এমন কি প্রজন্ম আন্দোলোনের বেশিরভাগ নেতারাও হয়তো এই তথ্যগুলি এমন গোছানো ভাবে কখোনোই পায়নি বা জানে না। আপনি লেখাটা মেইনশট্রিম মিডিয়া সহ যত বেশি ব্লগে পোষ্ট করার চেষ্টা করুন। আবারো ধন্যবাদ।

  2. ধন্যবাদ ভাই । আসলে এতবড় লেখায়
    ধন্যবাদ ভাই । আসলে এতবড় লেখায় ছোটখাটো এক দুইটা ভুল থাকতে পারে । ভুল টুল চোখে পড়লে ধরাইয়া দিয়েন । এডিট করে নেব ।

    1. কয়েকটা বছর আছে যেগুলো
      কয়েকটা বছর আছে যেগুলো সম্পর্কে অনেক ঘাটাঘাটি করেও তেমন কোনো তথ্য পাইনি । পেলে আপডেট করে নেবো । ভালো থাইকেন :ফুল:

  3. বহুল তথ্য সমৃদ্ধ লেখার জন্য
    বহুল তথ্য সমৃদ্ধ লেখার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি। এরূপ তথ্য আমার ইতিপূর্বে কখনও দেখার সৌভাগ্য হয়নি। এসব তত্যবহুল লেখার জন্য আপনাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে উৎসাহ দিয়ে যাব।

  4. ভাই ফিডব্যাক পাওয়ার জন্য
    ভাই ফিডব্যাক পাওয়ার জন্য লেখিনা । তবে ফিডব্যাক পেলে ভালো লাগে । পাশে থাকার জন্য অনেক ধন্যবাদ ।

  5. খুব ভালো লাগল। বেশ তথ্যবহুল
    খুব ভালো লাগল। বেশ তথ্যবহুল পোষ্ট প্রিয়তে নিলাম ও শেয়ার দিলাম।
    :গোলাপ: :গোলাপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

    1. সবকিছুর রেফারেন্স দিতে গেলে
      সবকিছুর রেফারেন্স দিতে গেলে এইটা মোটামুটি ছোটখাটো একটা বই হয়ে যাবে । আপনি ঠিক কোন কোন পয়েন্টের রেফারেন্স চান সেটা জানালে সুবিধা হবে।

  6. চমৎকার পোস্ট। ছোট ফ্রেমে
    চমৎকার পোস্ট। ছোট ফ্রেমে মোটামোটি জামাতের ইতিহাস তুলে ধরেছেন। তবে হাইলাইটটা শুধু গোলাম আজমকে না করে তার সাথে আরো কিছু নেতাদের ইতিহাস তুলে ধরলে আরো ভালো হতো তারপরও আপনার এই প্রচেষ্টাতে :তালিয়া:

    আপনি কি ফেসবুকের বহেমিয়ান?

  7. অসাধারন পোস্ট । এই তথ্য গুলোর
    অসাধারন পোস্ট । এই তথ্য গুলোর উপর ভিত্তি করে মওদুদীবাদ ও জামাতকে নিয়ে ছোট আকারে একটা বই প্রকাশ করে বিনামূল্যে আমজনতার হাতে পৌছে দেয়ার মতো ব্যবস্থা করা যায় কি ? একটু ভেবে দেখবেন । জামাত ও মওদুদীর মুখোস উন্মোচন খুবই প্রয়োজনীয় একটা কাজ । জন সাধারনকে সচেতন করে তুলতে না পারলে কিছুই হবে না । অতীত ইতিহাস জন সাধারনের জানা অনেক জরুরী । প্লিজ কেউ যদি একমত হন আমি এই ব্যাপারে সাহায্য করতে চাই ।

    1. চমৎকার আইডিয়া। ইস্টিশন যদি
      চমৎকার আইডিয়া। ইস্টিশন যদি চায় তাইলে প্রাথমিক ভাবে সবাই মিলে একটা ইবুক তৈরি করা যায়। সবাই মিলে হাত দিলে মনে হয়না কাজটা কঠিন কিছু হবে। সবাই ভেবে দেখলে ভালো হয়।

      1. প্রস্তাবে আমি সমর্থন
        প্রস্তাবে আমি সমর্থন জানাইলাম। ই-বুকের পাশাপাশি যদি কেউ সহযোগীতা করেন তবে ইস্টিশন থেকে বিনামুল্যে বিতরণের জন্য ছোট্ট গ্রকাশনাও করা যেতে পারে। ইস্টিশন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষন করলাম ও অন্যান্য যাত্রীদেরও মতামত আশা করছি।

  8. বোহেমিয়ান টিউন ভাইকে ধন্যবাদ
    বোহেমিয়ান টিউন ভাইকে ধন্যবাদ না জানালে চরম অন্যায় হবে । অনেক অনেক ধন্যবাদ ভাই ।
    :তালিয়া:

  9. ‘প্রত্যেক অসত্যই অস্থায়ী’-আল
    ‘প্রত্যেক অসত্যই অস্থায়ী’-আল কোরআন,১৭:৮৩।
    এভাবেই ভন্ডদের মুখোশ উন্মোচন করে দিতে হবে।
    অনেক অনেক শুভ কামনা রইল।

  10. ই-বুক তৈরির ব্যাপারটায় তীব্র
    ই-বুক তৈরির ব্যাপারটায় তীব্র সমর্থন জানাইলাম।পোষ্টদাতাকে অনুরোধ করব আরেকটু ইলাবোরেট করে দিতে কিছু কিছু সালের ঘটনা যেগুলো একেবারে এক বা দুই লাইনে হয়ে গিয়েছে।তাহলে ইস্টিশন প্রকাশনা করলে একটি চমতকার কালেকশন হয়ে থাকবে।আর মাস্টারেরও দৃষ্টি আকর্ষন করছি ই-বুক করা যায় কিনা এটা ভেবে দেখার জন্যে।

    1. পোস্ট হয়তো নিখুত না… যাস্ট
      পোস্ট হয়তো নিখুত না… যাস্ট একটা কনসেপ্ট । ইবুক করতে গেলে সবাই মিলে করা লাগবে। অল্প বেশি সবার হেল্প থাকবে।

  11. ই বুক দারুন আইডিয়া । তবে
    ই বুক দারুন আইডিয়া । তবে আরেকটু বিষদ লিখে ইস্টিশন থেকে ছোট ১০ থেকে ১২ পৃষ্ঠা ( যাই হোক ) এর একটা চটি ( এ চটি আবার সে চটি নয় 😛 ) প্রকাশ করে বিনামূল্যে বিতরন করার ব্যবস্থা করতে হবে । ঢাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন জেলায় যত বন্ধুরা আছে সবার কাছে ৪০০-৫০০ কপি ও ইমেইলে সফট কপি ( নিজ নিজ এলাকা থেকে ইচ্ছুক ব্যক্তি ছাপিয়ে নিতে পারবে ) পাঠিয়ে দিলে সবাই নিজ উদ্যোগে বিতরন করবে । টাকা – পয়সার ব্যাপার সবাই মিলে এক হয়ে করলে ঠেকবে না । বন্ধু ও বড় ভাই আপুরা ভেবে দেখেন একটু । দরকার হলে আলোচনা করা যায় । যুদ্ধ শুধু মারনাস্ত্র আর স্লোগান দিয়ে হয় না , কলম দিয়েও যুদ্ধ চলে । জামায়াত কে প্রতিহত করতে সাধারন মানুষের কাছে আমাদের পৌছাতে হবে । কি বলেন আপনারা সবাই ??

  12. (No subject)
    :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

49 − = 47