রোজাভা বিপ্লবঃ যে পথ মুক্তির পথ


আরব বসন্ত নামে মধ্যপ্রাচ্যে স্বৈরাচার বিরোধী জনগণের যে সংগ্রাম শুরু হয়েছিল সেই সংগ্রামে তিউনিশিয়া ছাড়া আর কোথাও জনগণের জয় হয়েছে বলার উপায় নাই। কোথাও জনগণ আরো বড় স্বৈরাচারের খপ্পরে পরেছে, আবার কোথাও তাদের প্রতিদিন বেঁচে থাকার সংগ্রাম করতে হচ্ছে। সিরিয়ায় বাশার আল আসাদের স্বৈরাচারি শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের সংগ্রাম বিভিন্ন সম্প্রদায়, গোত্র ও বাহিনীর ক্ষমতা দখলের সশস্ত্র যুদ্ধে পরিণত হয়েছে প্রায় আড়াই বছর হয়ে গেলো। গত আড়াই বছরের এই যুদ্ধে সিরিয়ার সাধারণ জনগণের ক্ষমতায়ন কিংবা স্বার্থ রক্ষা নয়, বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, ইরান, রাশিয়াসহ বিভিন্ন পরাশক্তির ক্ষমতায়ন ও স্বার্থ রক্ষাই কেন্দ্রিয় বিষয় হয়ে উঠেছে। আসাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে আইসিসসহ অন্যান্য যেসব জঙ্গী গোষ্ঠিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পেলে পুসে বড় করেছে সেই আইসিস ও তার সহযোগীরা এখন সিরিয়া, ইরাক, কুর্দিস্তানের জনগণই নয় পুরো বিশ্বমানবতার জন্যে হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই হুমকি মোকাবেলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের বৈধতা আরো বেড়েছে, তারা ঢাক ঢোল পিটিয়ে আইসিস নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে বোমা হামলাও চালিয়েছে। কিন্তু তাতে আইসিসের গায়ে সামান্য আচড় পরেছে বলার উপায় নাই। আদৌ আইসিসকে দমন করা যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য কি না তাও একটি বিতর্কের বিষয়। কিন্তু সেই বিতর্কে এখন যাবো না। কারন মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি এবং প্রগতির জন্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আমাদের কিছু চাওয়ার নাই। মধ্যপ্রাচ্যের আজকের অশান্তির জন্যে তারাই সবচাইতে বেশি দায়ি। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদ আর আইসিসের সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ নির্বিশেষে জনগণের সংগ্রাম প্রতিষ্ঠা হলেই মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব, এর বাদে যা কিছু হবে সবকিছুই অস্থায়ি ‘সিজ ফায়ার’এর চাইতে বেশি কিছু হবে না। যুক্তরাষ্ট্র সাদ্দামকে দমন করে, আসাদকে দমনের নামে যে যুদ্ধ করেছে তাতে আইসিসের জন্ম হয়েছে। তাদের আইসিস দমনের যুদ্ধে আরো খারাপ কিছুর জন্ম হবে না সেই নিশ্চয়তা নাই। ইরাক, সিরিয়া, কুর্দিস্তানের শোষিত জনগণ ছাড়া আমরা তাই আর কারো উপর ভরশা করতে পারি না। কিন্তু জনগণ কোথায়? আমরা তো খালি শিয়া, সুন্নি, আলাওয়িতদের যুদ্ধের খবর শুনি। জনগণের খবর কই? মানুষের সংগ্রামের খবর কই? আশায় বুক বাধা যায় এমন খবরের অপেক্ষাতেই তো আমরা ছিলাম।
?oh=45e0e9fd9a7f481a4c3899b81eb6d07a&oe=54CC20C0&__gda__=1418190806_eb713d6f619f0aa68ac8dab0721b77db” width=”500″ />
মানুষের সংগ্রামের সেই খবর আমরা পেলাম কোবানির যুদ্ধে। যে আইসিসের সামনে ইরাকী সেনা বাহিনী দাঁড়াতেই পারলো না, যেই আইসিসের গায়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলা সুরসুরির অনুভুতির চাইতে বেশি কিছু জাগাতে পারে নাই, সেই আইসিস কোবানির নারী পুরুষের সম্মিলিত বাহিনীর কাছে মার খেয়ে পিছু হটতে বাধ্য হলো। তাতে সারা বিশ্ব খানিকটা নড়েচড়ে বসেছে, যে মিডিয়াগুলো এতোদিন আইসিসের বর্বরতার ছবি ছাপিয়ে ব্যবসা করছিল, তারা এবার কোবানির নারী যোদ্ধাদের ছবি ছাপিয়ে ব্যবসা করছে। কিন্তু কোবানির এই বিজয় তো আকস্মিক কোন ঘটনা না। আইসিসের বিরুদ্ধে মানুষের এই প্রতিরোধ তো এমনি এমনি হয়ে যায় নাই। এর পেছনে যে বিপ্লব শক্তি যুগিয়েছে সেই বিপ্লবের খবর মিডিয়াগুলাতে তেমন আসে নাই। আইসিসের মধ্যযুগিয়, সাম্প্রদায়িক ও পুরুষতান্ত্রিক খেলাফতি বিপ্লবের খবর ফলাও করে প্রচার করা হয়েছে। কিন্তু বহুমুখি প্রতিকূলতা, সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ডা আর সাম্প্রদায়িক সহিংসতার যুদ্ধের মাঝখানে জন্ম নেয়া ধর্ম, বর্ণ, জাত, লিঙ্গ নিরপেক্ষ জনগণতান্ত্রিক রোজাভা বিপ্লবের খবর আমরা পাই না।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে নিজেদের উপনিবেশ স্থাপন করেছিল পাশ্চাত্যের ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো। ফিরে যাওয়ার সময় তাদের সুবিধা, স্বার্থ এবং অনেকক্ষেত্রে নেহায়েত খেয়াল খুশি মতো দাগ টেনে বিভিন্ন দেশের মানচিত্র ভাগ করে দিয়ে গেছে। এইসব কৃত্তিম মানচিত্রে চাপা পরেছে বহু মুক্তিকামী জনগণের স্বাধীনতার আকাঙ্খা, কুর্দিশরা তাদের মধ্যে প্রধান। পৃথিবীর সবচাইতে বড় পরাধীন এই জাতি চার ভাগ হয়ে ইরাক, সিরিয়া, তুর্কি, ইরানের অধিন হয়েছে। স্বাধীনতার জন্যে তারা লড়াই করেছে বছরের পর বছর। বারবার তাদেরকে নির্মমভাবে দমন করেছে ইরাক, সিরিয়া, তুর্কির স্বৈরাচারি শাসকরা। পশ্চিমের তাতে কিছু আসে যায় নাই। সাদ্দাম, আসাদ, গাদ্দাফির মতো স্বৈরাচারদের একসময় মার্কিন নেতৃত্বাধীন মুক্ত বিশ্বের নেতারাই লালন পালন করেছে। সোভিয়েত জুজু দেখিয়ে এসব দেশের ছাত্র, শ্রমিক, মেহনতি মানুষের অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল ও বামধারার রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে নির্মমভাবে দমন করতে এই স্বৈরাচাররা একসময় যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় বরকন্দাজের ভুমিকাও পালন করেছে। সোভিয়েতের পতনের পর নতুন জুজু হিসাবে এসেছে ইসলামী সন্ত্রাসবাদ। গাদ্দাফি, সাদ্দামরা গত হয়েছেন, এখন আইসিসের যুগ। সাম্প্রদায়িকতা কিভাবে আরো বেশি সাম্প্রদায়িকতা উক্সে দেয় আমরা তা দেখেছি। সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য এবং সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসবাদ এই দুইয়ের মাঝখানে থেকে প্রগতিশীল রাজনীতি হাজির করা সহজ কাজ নয়। সেই কাজটাই রোজাভার বিপ্লবীরা করে দেখিয়েছে। রোজাভা হলো সিরিয়ার ভাগে পরা কুর্দিস্তানের ডাক নাম।
?w=788″ width=”500″ />
রোজাভা বিপ্লবের জন্ম সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের ডামাডোলের মাঝেই। রোজাভার বিপ্লবীরা একদিকে যুদ্ধ করছে আসাদের বাহিনীর সাথে, আরেকদিকে আসাদ বিরোধী আইসিস, নুসরা, আল কায়েদার সাথে। যুদ্ধের ডামাডোলে তারা স্বৈরাচার হয়ে যায় নাই, সাম্প্রদায়িকও হয়ে ওঠে নাই এমনকি কট্টর জাতীয়তাবাদীতেও পরিণত হয় নাই। যুদ্ধ বরং তাদেরকে অসাম্প্রদায়িক এবং গণতান্ত্রিক বানিয়েছে, ধর্ম, জাতীয়তা, লিঙ্গের ঊর্ধে মানুষ হতে শিখিয়েছে। রোজাভার বিপ্লবীরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, ইরান, তুর্কি কিংবা রাশিয়ার সাপোর্ট পায় নাই, বরং এদের অনেকেই তাদের শত্রুদের শক্তি যুগিয়েছে। রোজাভার বিপ্লবীরা সংগঠিত হয়েছে জনগণকে নিয়ে, জনগণতান্ত্রিক সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করে। এইক্ষেত্রে তারা নারী, পুরুষের ভেদ করে নাই। ধর্মের সংখ্যাগরিষ্ঠতায় তারা মুসলমান হইতে পারে, জাতিগত সংখ্যাগরিষ্ঠতায় তারা কুর্দিশ হইতে পারে, কিন্তু মুসলমান অথবা কুর্দিশ এই পরিচয় নিয়ে তারা শত্রুর মোকাবেলা করতে যায় নাই, তারা শত্রুর মোকাবেলা করেছে মুক্তিকামী মানুষের পরিচয়ে। রোজাভায় তো খালি কুর্দিরা থাকে না, মুসলমানরাও থাকে না। হোক না সেখানে কুর্দি আর মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাদের মধ্যে ইয়াজিদিরা আছে, আরবরা আছে, খ্রিষ্টানরা আছে, সংখ্যায় তারা যতোই লঘু হোক না কেনো। আইসিসের হাত থেকে বাঁচতে যে হাজার হাজার ইয়াজিদি, খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন জাতি ও ধর্মের সংখ্যালঘুরা রোজাভায় আশ্রয় নিয়েছে রোজাভা তাদেরকে বুকে আগলে নিয়েছে। রোজাভার কোবানিতে আইসিসের বিরুদ্ধে বিজয় তাই কুর্দিদের বিজয় না, বরং সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস আর সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ডার বিরুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের গণমানুষের বিজয়, বিশ্ব মানবতার বিজয়। যে শক্তি দিয়ে তারা আইসিস কে থামাতে পেরেছে সেই শক্তি নেহাত অস্ত্রের শক্তি না, আদর্শের শক্তি। যে সংবিধানের মাধ্যমে রোজাভার বিপ্লবীরা জনগণের সার্বভৌমত্ব ঘোষনা করেছে তাতে সুস্পষ্ট ভাষায় তাদের লক্ষ্য সম্বন্ধে বলা আছে –

আমরা, গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত অঞ্চলের কুর্দি, আরব, আসিরিয়ান, চালদিয়ান, আরমেনিয়ান, তুর্কমেন, চেচেন, আমাদের স্বাধীন ইচ্ছা অনুযায়ি সুবিচার, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, নারীর অধিকার, শিশুর অধিকার, প্রাকৃতিক ভারসাম্য, ধর্ম ও বিশ্বাসের স্বাধীনতা এবং জাত, পাত, ধর্ম, লিঙ্গ নিরপেক্ষভাবে সমতা প্রতিষ্ঠার জন্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও বহুত্বের মাঝে সম্মান ও সহাবস্থানের মাধ্যমে জনগণের শাসনের এবং জনগণের সুরক্ষার লক্ষ্যে ও গণতান্ত্রিক সমাজের নৈতিকতা অনুযায়ি রাজনীতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে……………


সাম্রাজ্যবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জন্ম নেয়া এবং জাত, পাত, ধর্ম, লিঙ্গ নিরপেক্ষ বাংলাদেশের হৃদয় থেকে রোজাভার বিপ্লবের প্রতি সংহতি জানাই। সাম্রাজ্যবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রোজাভার লড়াকুদের জানাই বিপ্লবী শুভেচ্ছা। দিনশেষে রোজাভা জিতবে কি হাড়বে, তা ভিন্ন বিষয়। কিন্তু মুক্তি রোজাভার পথেই সম্ভব। ভিন্ন কোন পথে নয়।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৯ thoughts on “রোজাভা বিপ্লবঃ যে পথ মুক্তির পথ

  1. “ আমরা, গণতান্ত্রিকভাবে

    “ আমরা, গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত অঞ্চলের কুর্দি, আরব, আসিরিয়ান, চালদিয়ান, আরমেনিয়ান, তুর্কমেন, চেচেন, আমাদের স্বাধীন ইচ্ছা অনুযায়ি সুবিচার, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, নারীর অধিকার, শিশুর অধিকার, প্রাকৃতিক ভারসাম্য, ধর্ম ও বিশ্বাসের স্বাধীনতা এবং জাত, পাত, ধর্ম, লিঙ্গ নিরপেক্ষভাবে সমতা প্রতিষ্ঠার জন্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও বহুত্বের মাঝে সম্মান ও সহাবস্থানের মাধ্যমে জনগণের শাসনের এবং জনগণের সুরক্ষার লক্ষ্যে ও গণতান্ত্রিক সমাজের নৈতিকতা অনুযায়ি রাজনীতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে……………”

    এই ধরনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে যারা লড়বে, জয় তাদের নিশ্চিত। পারভেজ ভাই আবারো স্যালুট পোস্টটির জন্য।

  2. জাত, পাত, ধর্ম, লিঙ্গ

    জাত, পাত, ধর্ম, লিঙ্গ নিরপেক্ষ বাংলাদেশের

    এই দেশটা কোন মহাদেশে? বাংলাদেশ নামের একটা দেশের কথা জানি, কিন্তু নামের আগের তকমাগুলো তো মিলছে না!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 15 = 17