জামাত ছাড়লে বিএনপি ‘গ্রহণযোগ্য’ মধ্যবর্তী নির্বাচন পাবে

২০০৬ সালের ১১ জানুয়ারি বিএনপি জামাত জোট সরকারের শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি সেনা সমর্থিত আমলা সিভিল মিলিটারি ক্যু হয়। এই ক্যু’র পর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ন হয়ে উঠে তাহলো বিদেশী প্রভাবশালী দেশের উপর নির্ভরশীলতা আগের চেয়ে বিপজ্জনকমাত্রায় বেড়ে যাওয়া।

বিশেষত ভারত নির্ভরতা। এই ক্যু’র মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে বিএনপির রাজনীতির দুদাণ্ড প্রতাপ একদম মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়। এর পেছনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বহু কারণ রয়েছে। সেইসব কারণগুলোকে যদি ব্যাখ্যা করা যায় তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতির বর্তমান অবস্থা থেকে কাটিয়ে উঠার ইঙ্গিত বা আভাস আন্দাজ করা যাবে।

কারণ বহুল আলোচিত ওয়ান ইলেভানের বর্ধিত (এক্সটেনশন) শাসন ব্যবস্থাই গত সাড়ে পাঁচ বছরের শাসন আমল। আমরা এখনো রাজনৈতিকভাবে ওয়ান ইলেভানের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসেনি। অর্থ্যাৎ ওয়ান ইলেভানের রাজনীতির যে মর্মকথা ছিলো গত সাড়ে পাঁচ বছরে আমাদের অর্থনীতিসহ নানাক্ষেত্রে তা জারি রয়েছে।
যদি বিএনপিকে আবারো ক্ষমতায় ফিরে আসতে হয় তাহলে তার সামনে দুটি কর্তব্য রয়েছে। একটা সোজা পথ হলো ওয়ান ইলেভানের ক্রিড়ানকদের কাছে আÍসমার্পন। অন্যটি জননন্দিত হয়ে সাধারণ মানুষকে সাথে নিয়ে রাষ্টক্ষমতায় ফেরা। তবে বিএনপি প্রথম পছন্দটাই বেছে নিবে। হয়তো আমাদের মত নয়াউপনিবেশিত (নিউ কলোনিয়াল) দেশগুলোর শাসক বুর্জোয়া দলগুলোর এর ভিন্ন অন্য কিছু করার ক্ষমতাই নেই।

সর্ববেশ ঢাকায় আসছেন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল। চলতি মাসের ২৫ থেকে ৩০ তারিখের মধ্যে তাঁর ঢাকায় আসার কথা রয়েছে। গুজবের ডালপালাগুলো ছেটেও এটুকু বলা যায় নিশা দেশাই বিসওয়াল ঢাকার এবারের সফরে একটি গ্রহণযোগ্য মধ্যবর্তী নির্বাচনের ব্যাপারে কথা বলবেন।

কিভাবে সম্ভব ?
আওয়ামী লীগ ওয়ান ইলেভানের বর্ধিত রোল প্লে করতেছে। যেহেতু বিএনপি ওয়ান ইলেভানে প্রচণ্ডভাবে আক্রান্ত একটি দল সে কারণে আওয়ামী লীগের এই রিজিমকে সে চ্যালেঞ্জ করতে পারেনি। তবে পরিস্থিতি বদলায়। কারণ আওয়ামী লীগ ক্রমাগতভাবে মার্কিন বলয়কে যেভাবে ক্ষেপিয়ে তুলছে তাতে মার্কিন স্বার্থগুলো যেভাবে অবদমিত হয়ে আছে বা তাদের স্বার্থের কাঙ্খিতভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না সেটাই হতে পারে বিএনপির জন্য আদর্শ নীতি। অর্থ্যাৎ আওয়ামী লীগ যতখানি এন্টি মার্কিন রোল প্লে করবে বিএনপি ততখানি প্রো মার্কিন রোল প্লে করবে। তবে এখানে মূল বিষয় ভারতকে আস্থার জায়গায় আনা। সেই কাজটি বিএনপির পক্ষে করা সম্ভব হলেই কেবল আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো একটি ভারসাম্য স্থানে গিয়ে পৌছাবে।

এখন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রচণ্ড প্রতাপশালী মন্ত্রী ও নেতারা যে বাস্তবতায় আছেন ২০০৫ সালে বিএনপির নেতারাও একই বাস্তবতায় ছিলেন। এ কারণে তৎকলানি মার্কিন সরকারের ধারণাটাও আমাদের বোঝা দরকার। তাহলে ভবিষ্যাৎ সম্পর্কে আমরা একটা ফয়সালা করতে পারবো।

মার্কিনী যে প্রভাব আমাদের রাজনীতিতে যা বিশ্বব্যাপী মার্কিনীদের যে রাজনীতি তারই অংশ। এই প্রভাবের ফল ১১ জানুয়ারি ২০০৬ সালে ভালো করে প্রত্যক্ষ করেছে দেশের মানুষ। রিজিম পরিবর্তনের সেই ক্যু’র পেছনে যে নিউ ফেনোমেনান দাড়িয়েছে তাতে দেশের রাজনীতি আরো বেশি বিদেশ নির্ভর হয়েছে। ভেঙ্গে পড়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। সেই হিসেবে আওয়ামী লীগের বর্তমানের প্রভাবের সঙ্গে মিলিয়ে ২০০৫ সালের বিএনপি সরকারের মন্ত্রী ও নেতাদের প্রভাব ব্যাখ্যা করাই হবে অধিকগ্রহণযোগ্য। একইসঙ্গে প্রভাবের পরবর্তী ফল সম্পর্কেও তাহলে খানিকট আন্দাজ পাওয়া যাবে।

২০০৫ সালের ১১ মে ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত হ্যারি কে টমাস বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদদের সম্পর্কে একটা মূল্যায়ন পাঠিয়েছিলেন। পরে ওই গোপন নথিটি ওয়েবসাইট উইকিলিকস ২০১১ সালের ৩০ আগস্ট ফাঁস করে। মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়, দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত বেগম জিয়া সরকারের ঘনিষ্ঠ এমন প্রভাবশালী ১৭ জনের মধ্যে ১২ জনের সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। অর্থ্যাৎ খালেদা জিয়ার তৎকালিন সরকার মূলত এই ১৭ জন ছিলেন প্লে মেকার। জোট সরকারের ওই ১৭ জনের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালীদের ‘ইনার সার্কেল’ (সবচেয়ে কাছের মানুষ), অপেক্ষাকৃত কম প্রভাবশালীদের ‘মিডল সার্কেল’ (অপেক্ষাকৃত কাছের মানুষ) এবং সর্বশেষ ‘আউটার সার্কেল’-এ (কাছের মানুষ) তিন ক্যাটাগরিতে ভাগ করে তাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ‘মিডল সার্কেল’ শিরোনামে সরকারের প্রভাবশালীদের মধ্যে আছেন রিয়াজ রহমান, মোসাদ্দেক আলী ফালু, ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ হায়দার, মীর নাসির উদ্দিন, মতিউর রহমান নিজামী।
উইকিলিকসে ফাঁস হওয়া এ কেবলটি পড়ুন।

বেগম জিয়া ‘কান কথা’ শোনেন!
সমালোচকেরা তাকে ‘বিচ্ছিন্ন’, ‘অলস’, ‘শিক্ষিত নয়’ বললেও তিনিই ক্ষমতার মূল ব্যক্তি। তিনি কান কথা বেশি শোনেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বিধবা স্ত্রী, ব্যাপক জনসমর্থনের কারণে তিনি এ পদে অধিষ্ঠিত। তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা রয়েছে এবং ঘনিষ্ঠজনদের তিনি বিশ্বস্ত। প্রধানমন্ত্রী পদে দায়িত্ব পালনকে তিনি যথেষ্টই উপভোগ করছেন।

জিয়ারউর রহমান ‘কুখ্যাত’ বড় সন্তান তারেক!!
খালেদার ঘনিষ্ঠ প্রভাবশালীদের মধ্যে সবার আগে আছে তার ‘কুখ্যাত’ বড় ছেলে তারেক রহমানের নাম। নিন্দুকেরা বলেন, তারেক নির্দয়, অতিমাত্রায় দুর্নীতিগ্রস্ত, রাজনীতি ও ব্যবসায় অনভিজ্ঞ, স্বল্প শিক্ষিত। তবে তারেকের ঘনিষ্ঠজনরা বলেন, তিনি বেশ ডায়নামিক, স্মার্ট, নতুন প্রজšে§র প্রতিনিধি, অতীতঘেঁষা নন। ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদে অধিষ্ঠিত হয়ে তিনি কার্যত হাওয়া ভবনের ‘ছায়া সরকারের’ মাধ্যমে সরকারি নিয়োগ ও চুক্তিগুলো নিয়ন্ত্রণ করেন। তবে মাঝেমধ্যে প্রতিপক্ষের সঙ্গে তিনি বেশ নির্মম। ২০০৪ সালে তিনি সারা দেশের তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে সম্মেলন করে বেশ সাফল্য অর্জন করেছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ‘তারেক কি পরবর্তী নির্বাচনে অংশ নেবেন? (সম্ভবত)।’

ভাবের নেতা হারিছ চৌধুরী
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব ও তারেকের ঘনিষ্ঠজন। তিনি অনেক দিন ধরেই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তার অতীত কর্মকাণ্ডের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, তিনি বিরোধী দলের ওপর সহিংস কর্মকাণ্ড চালাতে পারদর্শী।

সাকা চৌধুরী যুদ্ধাপরাধী, হত্যান্তরক ও ধর্ষক : প্রধানমন্ত্রীর সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা হলেও তিনি মূলত ‘সকল কাজের কাজি’ (অল পারপাস প্লেয়ার)। পাকিস্তানপন্থি রাজনৈতিক পরিবারে জš§ তার। ১৯৭১ সালে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সমালোচকদের চোখে তিনি ‘ধর্ষক’, ‘অস্ত্র ব্যবসায়ী’ ও ‘খুনি’। তবে তিনি স্পষ্টভাষী, সৌজন্যবোধসম্পন্ন ও দ্বিধাহীন। ওআইসির মহাসচিব পদে পরাজয়, শেখ হাসিনাকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য এবং চট্টগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্র আটকের ঘটনায় তার সংশ্লিষ্টতার গুঞ্জনের পরও তিনি যেভাবে বর্তে গেছেন, তাতেই বোঝা যায় তিনি কতটা প্রভাবশালী।

সাঈদ ইস্কান্দার মির্জা
প্রধানমন্ত্রীর ভাই ও সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর। সাঈদ এস্কান্দার সামরিক বাহিনীর ক্রয়সংক্রান্ত চুক্তি এবং ঊর্ধ্বতন পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে থাকেন। তিনি একজন নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং তারেক রহমানের সঙ্গে তার যৌথ ব্যবসা রয়েছে।

লুৎফুজ্জামান বাবর
চোরাচালানকারী হিসেবে পরিচিত স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ এবং জামায়াতপন্থি। তার স্বাস্থ্য নিয়ে মার্কিন দূতাবাস প্রশ্ন তুলে তারবার্তায় বলে, তিনি চিকিৎসার জন্য নিয়মিত থাইল্যান্ডে যান। আগামী গ্রীষ্মে তিনি চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যেতে আগ্রহী। তবে তার রোগটি যে কী, তা পরিষ্কার নয়।

কামালউদ্দিন সিদ্দিকী
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব কামালউদ্দিন সিদ্দিকী খালেদার প্রতি বিশ্বস্ত হলেও তারেকের প্রতি একেবারেই নন। তার দৃষ্টিতে, ‘তারেক গোঁয়ার ও বিপজ্জনক প্রকৃতির। তিনি বিএনপির রাজনীতি ও সরকারের দুর্নীতি নিয়ে অকপটে আমাদের সঙ্গে কথা বলেন। আমলাতান্ত্রিক দক্ষতাই তার প্রভাব বিস্তারের মূল কারণ। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অতিমাত্রায় প্রতিশ্রুতিশীল। তিনি নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে মার্কিন সরকারের সবচেয়ে কাছের বন্ধু হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন।’

খন্দকার মোশাররফ হোসেন
দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির সঙ্গে যুক্ত থাকায় তিনি খালেদা জিয়ার অন্যতম আস্থাভাজন। তিনি একজন সুবিধাভোগীও বটে। খালেদা জিয়ার প্রথম দফার শাসনামলে খন্দকার মোশাররফ জ্বালানিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। চীনের সঙ্গে কয়লা উত্তোলন চুক্তি স্বাক্ষরে তার সংশ্লিষ্টতা ছিল। তবে তিনি অতিমাত্রায় দুর্নীতিগ্রস্ত।

রিয়াজ রহমান
পররাষ্ট্র উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করলেও কার্যত তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকা পালন করেন। বিএনপির দীর্ঘদিনের সহচর রিয়াজ রহমানের সঙ্গে তারেক রহমান ও বাবরের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। তিনি দক্ষ এবং খোলামেলা কথা বলতে অভ্যস্ত।

মোসাদ্দেক আলী ফালু
তিনি খালেদা জিয়ার সাবেক ব্যক্তিগত সচিব। ২০০৪ সালের ঢাকা-১০ আসনের বিতর্কিত উপনির্বাচনের নামে ‘কারচুপির উৎসবে’ জয়ী হন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ছেড়ে দেওয়ায় তিনি ক্ষমতার মূল বলয় থেকে কিছুটা সরে যান।

ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ হায়দার
জানুয়ারিতে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে নিয়োগ পাওয়া ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ হায়দার ‘তারেক বলয়ের’। নিয়োগের পর পরই তিনি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে ওঠেন। তিনি মূলত রাজনৈতিক বিষয়ে দেখাশোনার দায়িত্ব পান। এর মধ্যে ছিল গুরুত্বপূর্ণ কূটনীতিদের একটি পক্ষের (‘টুইসডে গ্রুপ নামে পরিচিত) সঙ্গে যোগাযোগ রাখা।

মার্কিনী যে প্রভাব আমাদের রাজনীতিতে যা বিশ্বব্যাপী মার্কিনীদের যে রাজনীতি তারই অংশ। এই প্রভাবের ফল ১১ জানুয়ারি ২০০৬ সালে ভালো করে প্রত্যক্ষ করেছে দেশের মানুষ। রিজিম পরিবর্তনের সেই ক্যু’র পেছনে যে নিউ ফেনোমেনান দাড়িয়েছে তাতে দেশের রাজনীতি আরো বেশি বিদেশ নির্ভর হয়েছে। ভেঙ্গে পড়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। সেই হিসেবে আওয়ামী লীগের বর্তমানের প্রভাবের সঙ্গে মিলিয়ে ২০০৫ সালের বিএনপি সরকারের মন্ত্রী ও নেতাদের প্রভাব ব্যাখ্যা করাই হবে অধিকগ্রহণযোগ্য। একইসঙ্গে প্রভাবের পরবর্তী ফল সম্পর্কেও তাহলে খানিকট আন্দাজ পাওয়া যাবে।

সমস্যার নাম জামায়াত
বিএনপির সঙ্গে জামাতের জোটই রাজনীতির নতুন মেরুকরণ হয়েছে। খেয়াল করুন মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুডের (মিশরের জামাত ইসলাম) কথা। বৈশ্বিক রাজনীতির সফল বেকুবিপনা মুসলিম ব্রাদারহুডের দ্বারা সেখানে ঘটেছে আর বিদায়ও হয়েছে খুন-রক্তের নির্মমতার মধ্য দিয়ে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দশট্রাক অস্ত্র দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির বহু আগাম বাস্তবতাকে সামনে এনে দিয়েছে। ভারত যে রোল প্লে করার কথা ছিলো আরো ২০ বছর পর তা এক ধাক্কায় দশট্রাক অস্ত্র তা আরো সামনে নিয়ে এসেছে আজকের রাজনীতি। একইসঙ্গে জামাত ইসলাম বাংলাদেশের রাজনীতিতে আন্তর্জাতিকভাবে এতিম হওয়ার প্রথম পাঠটি সেখান থেকে নেওয়া শুরু হয়েছে।


দশ ট্রাক অস্ত্র পাল্টে দিয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতি

বিএনপির নেতৃত্ব এই সত্য যত দেরিতে বুঝবে ততই দলটির জন্য একেকটা সমস্যা বাড়াবে। তবে জামাতকে পরিত্যাগের ক্ষেত্রে বিএনপির ঘরের ভেতর বাধাই বড় বাধা। জামাত বহু বছর ধরেই বিএনপির বহু নেতাকে পেলে পুশে তাদের মত করে তৈরী করেছে। হোক তা অর্থ বা তাদের আর্দশ দিয়েই। এই জামাতপন্থি বিএনপি নেতারাই জামাত ত্যাগে বড় বাধা হয়ে দাড়াবে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব সর্বাধিক। কংগ্রেস উত্তর প্রো কংগ্রেস সাউথ ব্লকের আমলাতন্ত্র আওয়ামী লীগ সরকারকে বাঁচানোর দায় একমদম শূন্যের কোটায় না গেলেও অন্তত এটা নিশ্চিত করে বলা যায় মনমোহন রিজিমের ন্যায় আর নেই। কিন্তু সেক্ষেত্রে প্রথম এবং প্রধান বাঁধা জামাত ইসলাম। প্রো সৌদি ও আইএসআই সমর্থিত জামাত বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতার যে কোন ধরনের অংশিদারিত্ব দিল্লীর পক্ষে হজম করার চেয়ে বরং ভূ-কৌশলগতভাবেই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। এ কারণেই জামাত ও বিএনপি মিলে যে রাজনৈতিক সম্পর্ক তৈরী করেছে তাতে কোনভাবেই সমর্থন নেই দিল্লীর। বিএনপির ক্ষমতায় যাবার বড় বাধা আওয়ামী লীগ বা তত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির নির্বাচন নয়, মূল বাধা জামাত ইসলাম। বিএনপি ভারতের প্রশ্নে যত বড় ‘দানের’ তালিকাই বানিয়ে রাখুক না কেন তাতে মোদি জি’র ইচ্ছের পাল্লা এতোটুকুও হেলবে না যত সময় বিএনপির সাথে জামাত আছে। যেদিন বিএনপি জামাতকে আনুষ্ঠানিকভাবে ছেড়ে দিবে ঠিক সেইদিন থেকেই বাংলাদেশে বর্তমান রিজিম পরিবর্তনের দিনক্ষণ শুরু হবে। অর্থ্যাৎ বিএনপির ক্ষমতায় যাওয়ার প্রধান বাধা জামাত ইসলাম।

বিএনপি একটি উদার মধ্যবর্তী গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা কায়েমের আগে বরং দেশের ব্যাপক মধ্যপন্থি (ধর্ম ও রাজনীতির মিশেলে ক্ষেত্রে যারা বাড়াবাড়ি পছন্দ করেন না। আবার ধর্মকে ছেড়েও দেন না) সাধারণ মানুষের কাছে এই বার্তায় পৌছে দিতে হবে, তারা একটি বহুত্ববাদি বিকশিত গণতান্ত্রিক শাসনের জন্য লড়ছে। যদি দেশের উদার মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিএনপিকে জামাতের রিপ্লেসমেন্ট ভাবেন তাহলে এই প্রভাবশালী শ্রেণির যে মতাদর্শিক হেজিমনি সারা দেশে রয়েছে তাতেই কঠিন হয়ে পড়বে বিএনপির ফিরে আসা।

সরকারের নড়াচড়া, যুদ্ধপরাধীদের ফাঁসি ও বিভিন্ন আলামত এ বিষয়টি ক্রমশ পরিস্কার করছে ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাস থেকে শুরু হবে ক্ষণ গননার। সেই গননা কি সরকার ও রাষ্ট্র চিন্তার পরিবর্তন নাকি বিএনপি বাধে আরেকটি মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে কর্তৃত্বশীল শাসন কায়েম সেই সিদ্ধান্ত বিএনপিকেই নিতে হবে। কারণ জামাতের সঙ্গে বিএনপি থাকলে আওয়ামী লীগ শক্তিশালী হবে। আর বিএনপি এক সময় বিলিন হয়ে যাবে, মুখোমুখি দাঁড়াবে ইসলাম বনাম ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা, ধর্ম বনাম সেক্যুলারিজম যা সাংস্কৃতিকভাবে আমরা দেখতে পাবো শহিদ মিনার না বায়তুল মোকাররম? অথচ আমাদের দেশের রাজনীতিকে বিকশিত করতে হলে এসব জাতীয় ঐক্যর জায়গাগুলোকে সাথে নিয়েই এগুতে হবে। সেই দায়িত্ব বিএনপি যদি তার বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির রাজনীতি থেকে নিতে ব্যর্থ তবে সে জায়গাটি পূর্ন করবে পলিটিক্যাল ইসলাম বা রাজনৈতিক ইসলাম। আইসিসের মত কোন শক্তির আর্বিভাব হলেও তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। ফলে বিএনপিকে এই বাস্তবতা থেকে নেতৃত্ব দিতে গেলে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও তাঁর পুত্র দলের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট তারেক রহমান তথা জিয়া পরিবারকেই প্রধানভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

এখন এই পুনরুত্থানের সময় পুরানো পথগুলোরও ফয়সালা করতে হবে, মাথায় রাখতে হবে ‘হাওয়া ভবন’ সহ বহু পেছনের অসফল কির্তীর কথা। আর এ কথা অবশ্যই স্মরণে রাখা আখেরে লাভ তা হলো জনগণ হলো রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য অলিখিত আমলানামা সংরক্ষণাগার। যে কোনমূহুর্তে কোটি কোটি ডিজিটাল স্মৃতিসরংক্ষণাগার থেকে দল ও দলের নেতাদের কির্তী যে কোন সময় বেরিয়ে আসতে পারে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “জামাত ছাড়লে বিএনপি ‘গ্রহণযোগ্য’ মধ্যবর্তী নির্বাচন পাবে

  1. বিএনপি কখনোই জামায়াত ছাড়তে
    বিএনপি কখনোই জামায়াত ছাড়তে পারবেনা। জামায়াতকে বিএনপি এমনভাবে আকড়ে ধরেছে, ছাড়ার কোন উপায় নাই। এখন বরং বিএনপি জামায়াতকে আকড়ে ধরতে চাইছে জোরালোভাবে!

    1. বিএনপি জামাতকে আকড়ে ধরতে
      বিএনপি জামাতকে আকড়ে ধরতে চাচ্ছে এটা ঠিক না। অন্তত বিএনপি বলতে যা বোঝায় মানে তারকে জিয়া ও বেগম জিয়া তারা জামাতের ব্যাপারে কিছু বলতেছে না। এইসব গয়শ্বর টাইপ নেতারা কি বলিলেন তাতে কিছু যায় আসে না। তবে সব থেকে সমস্যা হলো বিএনপির জামতপন্থি নেতারা। তারাই খালেদাকে বেধে ফেলেছেন। সেটাই সমস্যা।

  2. বিএনপি জামাতকে ছাড়বে, এটা
    বিএনপি জামাতকে ছাড়বে, এটা মনেহয়না বরং বিএনপি জামায়াতকে আরো আকড়ে ধরতে চাইবে। জামায়াতকে যতই তারা ছাড়ার চেষ্টা করুক কিন্তু জামায়াত বিহীন বিএনপি তৈরি হবে বলে বুঝতে পারতেছিনা।

  3. তারেক রহমানের সাম্প্রতিক
    তারেক রহমানের সাম্প্রতিক ইসলামি রাজনীতি নিয়ে বক্তব্য,
    গোলাম আজমের ছেলের বিএনপি সম্পকে মন্তব্য মিলিয়ে ভাবা যেতে পারে।
    এটা ছাড়া বিএনপির ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনা নেই।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 56 = 66