মিশু আপা এখন ব্রাসেলসে সাম্রাজ্যবাদের অতিথি!

মোশরেফা মিশু আপার সংগঠনের নাম গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরাম। এই সংগঠনটি সাম্প্রতিক তোবা গ্রুপের শ্রমিকদের আন্দোলনে নেতৃত্বের ভূমিকায় ছিল। ইতোপূর্বেও শ্রমিকশ্রেণীর অধিকার আদায়ের নানামুখী আন্দোলনে তারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। আমাদের সংগঠন ”সর্বস্তরের ছাত্র-শিক্ষক-শ্রমিক-কৃষক-পেশাজীবী জনতা’ও মিশু আপাদের সঙ্গে মিলে অনেক কর্মসুচী পালন করেছে। সংগঠনটির অধিকাংশ নেতাকর্মীর সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে আমার সম্পর্ক ভীষণ ভালো। কিন্তু এই লেখাটি প্রকাশের পর সেই সম্পর্ক অনেকটাই নাজুক হয়ে পড়তে পারে! সেই ঝুঁকি নিয়েই এ লেখাটি লিখেছি। আশা করি মতামতকে তারা মতামত হিসেবে নিবেন।

মূল বিষয়ে আসি। সম্প্রতি আমরা জানতে পারলাম, মিশু আপা এখন ব্রাসেলসে আছেন। ব্রাসেলসে থাকাটা কোনো অপরাধ না। যে কেউ যেতে পারেন। তার ব্যক্তিগত প্রয়োজন থাকতে পারে। মিশু আপা ব্যক্তিগত কোনো কাজে যাননি। তিনি একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার আমন্ত্রণে ব্রাসেলস গেছেন। কি সেই আন্তর্জাতিক সংস্থা? তার নাম হচ্ছে, ইউরোপিয়ান কমিশন। আমরা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের নাম কম বেশি সবাই জানি। কিন্তু এই ইউরোপিয়ান কমিশন জিনিসটা আমাদের তেমন একটা পরিচিত নয়। আসুন এ সম্পর্কে একটু জেনে নেই।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন হলো ইউরোপের বেশিরভাগ দেশগুলোর মধ্যে ‘অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক’ একটি জোট। এই জোটে বর্তমান সদস্য ইউরোপের ২৮টি দেশ। অন্যদিকে ইউরোপিয়ান কমিশন হলো, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের executive body। এই কমিশন পরিচালিত হয় ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ২৮টি দেশ থেকে একজন করে member নিয়ে। ২৮ জন সদস্যের একটা cabinet government গঠন করা হয়। এই ক্যাবিনেট ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রস্তাবিত আইন, আইনের প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন, সদস্য দেশগুলোর মধ্যকার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং ইউনিয়নের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে।

ছোট্ট এই পরিচিতি থেকে এটা আমাদের কাছে খুব সহজেই স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, এই ইউরোপিয়ান কমিশন বিষয়টা আদতে বিশ্বব্যাপী কর্তৃত্বকারী সাম্রাজ্যবাদের প্রধান একটি কেন্দ্র। কেন তারা মিশুকে ব্রাসেলসে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন? মিশু আপার সংগঠনের সূত্রে জানা গেছে, ”Civil Society & Sustainable Development in Bangladesh” শীর্ষক সেমিনারে যোগ দিতেই তিনি বিমানযোগে বেলজিয়ামের রাজধানীতে পৌঁছেছেন। দেশ ছাড়ার সময় বিমানবন্দরে তাকে আটকে রাখাও হয়েছিল প্রায় সোয়া একঘণ্টা। কিন্তু ইউরোপিয়ান কমিশনের আমন্ত্রণ আটকাতে পারেনি আওয়ামী সরকার। ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত ওই সেমিনারে মিশু আপা বক্তব্য রাখবেন। তার বিষয় হচ্ছে, ”The Role of Non-State Actors in promoting Decent Working Condition”।

তার মানে কি দাঁড়াল? মিশু আপাকে সাম্রাজ্যবাদী মোড়লরা ডেকে নিয়ে গেছেন শ্রমিকের অধিকার রক্ষার জন্য! বেশ ভাবনার বিষয়। কারণ দুনিয়াজুড়ে সাম্রাজ্যবাদের মোড়লরাই শোষণব্যবস্থাকে আরও তীব্র করার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশের যে গার্মেন্ট শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি শোষিত, মিশু আপা যাদের নেতা, তাদের মূল মালিকপক্ষও কিন্তু ইউরোপিয় মালিকরা। এ বছরের মার্চের একটি প্রতিবেদন বলছে, ‘বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৫৬ শতাংশ ইউরোপীয় ইউনিয়নে রপ্তানি হয়। প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের এই রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশই তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আসে।’ আমাদের দেশে যে স্বল্প মজুরির শ্রমিক আছে, এবং এখানে পোশাক বানালে উৎপাদন ব্যয় কম পড়ে, এটা না জেনেই কি ইইউ বাংলাদেশ থেকে পোশাক কেনে? নাকি জেনেশুনে বুঝেই তারা বাংলাদেশে এসেছে? তাহলে শ্রমিকরা যে কম মজুরি পায় এর সঙ্গে কি ইইউ’র সম্পর্ক নেই?

সেই ইইউ কেন গার্মেন্ট শ্রমিক আন্দোলনের নেতা মিশু আপাকে আতিথেয়তা দিবে? মিশু আপা কি তাদের মিত্র? মিশু আপা এই আহবানে সাড়া দিয়েছেন এবং এখন তিনি ব্রাসেলসে সাম্রাজ্যবাদের মোড়লদের আতিথেয়তা ভোগ করছেন, এটাই বাস্তবতা। মিশু আপা সাম্রাজ্যবাদীদের সঙ্গে এই যে ওঠবস করছেন, এজন্য যে তিনি খুব খারাপ হয়ে গেলেন, বা দুর্নীতিবাজ হয়ে গেলেন, বা অনেক সুযোগ সুবিধা নিয়ে নিয়েছেন, ব্যাপারটা তা না হওয়াই স্বাভাবিক। বরং বিষয়টিকে মিশু আপা ভালো না খারাপ এই দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে তাদের রাজনীতির দিকে গেলে সহজে এর উত্তর মিলবে।

মিশু আপা কোনো কমিউনিস্ট পার্টি করেন না। শ্রমিকদের দাবী দাওয়া ও এর সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু রাজনৈতিক কর্মসূচীর মধ্যে আপাত তাদের গতিবিধি সীমাবদ্ধ। এটা যে পার্টি বা ক্ষমতা দখলের দিকে যাবে না, তা বলা যায় না। বরং রাজনৈতিক সংগ্রামের গতিটা ওইমুখী হওয়াই স্বাভাবিক। মিশু আপা ইতোমধ্যে শ্রমিক অধিকার রক্ষার প্রশ্নে তার অনমনীয়তার প্রমাণ দিয়েছেন। কিন্তু কী সেই অধিকার? তাদের কর্মসূচীর দিকে তাকালে দেখা যাবে, এটা অর্থনীতিবাদ। শ্রমিকদের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনের নানা সংগ্রাম। যারা দুনিয়াব্যাপী মার্কসীয় রাজনীতির খোঁজ খবর রাখেন, তারা সবাই বেশ ভাল করেই এটা জানেন যে, সাম্রাজ্যবাদের চাওয়াই এটা। তারা চায় যে, শ্রমিকরা যেন তাদের রাজনৈতিক অধিকার প্রশ্নে কথা না বলে। মিশু আপা এক্ষেত্রে তাদের সহযোগী হিসেবে আবির্ভূত হন।

আমি বলছি না যে, মিশু আপা শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা করতে চান না। তাই তিনি সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এসব করছেন। বরং আমি বলতে চাই, মিশু আপার রাজনীতি ও চিন্তার পদ্ধতি তথা মতাদর্শ, তিনি চান বা না চান ইচ্ছানিরপেক্ষভাবে সাম্রাজ্যবাদের সেবা করছে। আর তার পুরষ্কার হিসেবে সাম্রাজ্যবাদ আজ তাকে তাদের কেন্দ্রে ডেকে নিয়ে সংবর্ধনা ও আতিথেয়তা দিচ্ছে। মিশু আপা তোবা গ্রুপের আন্দোলনে শ্রমিকদের দিয়ে গান্ধীবাদী আন্দোলন করালেন- রাষ্ট্রের বেঁধে দেয়া কর্মসূচীর ভেতর মাথা গুঁজলেন। অনশন করলেন। শ্রমিকশ্রেণীকে তার গন্তব্য থেকে বের করে এনে এহেন মধ্যবিত্ত কর্মসূচীতে তাকে যুক্ত করতে পারাটা নিঃসন্দেহে সাম্রাজ্যবাদীদের চোখে বিরাট অর্জন। সব ক্ষেত্রে অসৎ হলেও শ্রেণীস্বার্থের প্রশ্নে সৎ বুর্জোয়া সাম্রাজ্যবাদীদের তাই কর্তব্যে পরিণত হয়েছে মিশু আপাকে সংবর্ধনা দেয়া।

অনেকেই এসব মানতে চাইবেন না। ভাববেন, আমরা জোর করে খুঁজে খুঁজে অভিযোগ দাঁড় করাচ্ছি। যারা গভীরে যেতে চান না, এভাবে ভাবতে চান তাদের জন্য বাড়তি কিছু কথা আছে। প্রথমেই বলেছিলাম, মিশু আপা, তার মতো মতাদর্শের লোকেরা ইচ্ছা নিরপেক্ষভাবেই সাম্রাজ্যবাদের সেবা করেন। এর কারণ হচ্ছে রাষ্ট্রকে ধারণ করা। জন্মের পর থেকে বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যে থাকার ফলে একজন মানুষ রাষ্ট্রকে ধারণ করে অভ্যাসবসে বা প্রথাগতভাবেই। সে মনে করে, এই রাষ্ট্রটা আমাদের। এটাকে ঠিকঠাক করতে হবে। এই দৃষ্টিভঙ্গীর কারণে তারা রাষ্ট্র ভাঙার কর্মসূচী থেকে পিছু হঠেন। রাষ্ট্রকে রক্ষার চেষ্টা করেন। মিশু আপা যখন রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে গার্মেন্ট নেয়ার কথা বলেন, তখন রাষ্ট্র সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গী পরিষ্কার হয়ে যায়। তিনি এই রাষ্ট্রব্যস্থার বিপক্ষে নন। সেই পথ ধরেই এই রাষ্ট্র টিকে আছে যে বিশ্বব্যবস্থার ওপর ভর করে, তিনি সেই বিশ্বব্যবস্থারও পক্ষে থাকেন। এভাবেই সাম্রাজ্যবাদ তার আপন হয়েছে।

যদি তিনি মার্কসবাদী হতেন, তাহলে তিনি এই রাষ্ট্রকে ভেঙে দেয়ার কর্মসূচীতে ঐক্যবদ্ধ হতেন। লেনিন তার রাষ্ট্র ও বিপ্লব গ্রন্থে পরিষ্কারভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন যে, বিদ্যমান বুর্জোয়া রাষ্ট্রটি এমনভাবে তৈরীকৃত যে, এটা শ্রমিকদের কাজে লাগে না। তাই শ্রমিকদের এই রাষ্ট্রব্যবস্থাকে চূর্ণ বিচূর্ণ করে ফেলতে হবে। বিপরীতে নিজেদের রাষ্ট্র গড়তে হবে। এই কর্মসূচী ও রাজনীতি থাকলে মিশু আপা দেখতে পেতেন, এই বুর্জোয়া রাষ্ট্রের লুটপাটকারী শাসকদের শক্তিকেন্দ্রগুলোর একটি হচ্ছে ইউরোপিয়ান কমিশন। আমাদের শাসকরা এদের হয়ে জনগণের স্বার্থ হানী করে, এদের শক্তিতেই তারা অন্যায় করে ও অন্যায় ব্যবস্থা চালু রাখে।

সাম্রাজ্যবাদীরা যে আমাদের দেশের শোষণ ব্যবস্থা টিকে থাকার মূল একটি ভিত্তি, এটা মিশু আপা বুঝলে তাকে ইইরোপিয়ান কমিশন আতিথেয়তা দিতো না। তিনি যদি শ্রমিকের অধিকার রক্ষার সঠিক পথে হাঁটতেন, নিঃসন্দেহে সাম্রাজ্যবাদী লুটেরাদের গুলি তাকে খুঁজে ফিরতো। এখন তার বিপরীতে উল্টোটা ঘটছে। বাংলাদেশের শ্রমিক নেতা মিশুকে সাম্প্রতিক জোরদার শ্রমিক আন্দোলনের পর পুরষ্কৃত করছে সাম্রাজ্যবাদীরা। এখান থেকে মার্কসবাদীদের শিক্ষা নিতে হবে। আশা করি, মিশু আপা ও তার সংগঠনের নেতাকর্মীরা বিষয়টি বুঝতে পারবেন।

কমরেড মাও সেতুঙের একটি আলোচনা এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। মাও বলেছিলেন, শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হওয়া ভালো, খারাপ নয়। শত্রু আক্রমণ করলে বোঝা যায় যে, আমরা তাদের কিছু ক্ষতি করেছি। আর শত্রু আক্রমণ না করলে বুঝতে হবে আমরা তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারছি না। প্রসঙ্গক্রমে বলা যায়, শত্রু দ্বারা পুরষ্কৃত হওয়াটা চরম ন্যাক্কারজনক। আশা করি, কমরেডরা মার্কসবাদকে আরও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণে নিবেন। মিশু আপা ব্রাসেলস গিয়ে কী পেলেন, না পেলেন সেই অনুসন্ধানে না গিয়ে বরং আমাদের তার রাজনীতির গলদটা কোথায় সেটা বোঝা উচিত। তাহলে আমরা একই ভুল থেকে বাঁচতে পারব। নইলে না চাইলেও আপনার বাহন হয়ে যাবে ইনু-মেনন পরিবহন।

প্রাসঙ্গিক লিঙ্ক।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “মিশু আপা এখন ব্রাসেলসে সাম্রাজ্যবাদের অতিথি!

    1. এই সীমাবদ্ধতাই সংগ্রামকে
      এই সীমাবদ্ধতাই সংগ্রামকে চোরাগলিতে ঠেলে দিচ্ছে। শোষণের বিরুদ্ধে বলা কথাগুলো পরিণত হচ্ছে বুলিতে! বুলেটে নয়!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 77 = 83